শিরোনাম

আজ পবিত্র আশুরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েতউল্লাহ  |  ০০:১৮, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৮

ইসলামি পঞ্জিকা অনুযায়ী আজ পবিত্র আশুরা। ১৪৪০ হিজরি সনের মহররম মাস চলছে। এ মাসের একটি দিন রয়েছে যা আশুরা হিসেবে পরিচিত। বছরের চাকা ঘুরে প্রতি বছরই আমাদের মাঝে ফিরে আসে মহররম। আসে আশুরা। মুসলিম উম্মার জন্য এক তাৎপর্যময় ও শোকাবহ দিন। নফল রোজা, নামাজ, জিকির-দোয়া মাহফিলের ভেতর দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি পালন করেন। অন্যদিকে এটি শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এই দিনটি পালনে তারা বিভিন্ন আয়োজন করে। এ উপলক্ষে তারা তাজিয়া শোক মিছিল করে। এ মিছিলে বিভিন্ন ধরনের ব্লেট, ছুরি-তলোয়ার ব্যবহার করে। তবে ইসলামিক বিশেষজ্ঞরা এবিষয়ে দ্বিমত পোষন করেন। তারা মনে করেন আশুরা বা কারবালার ইতিহাসের সাথে এসমস্ত কার্যকলাপের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো শিয়াদের মনগড়া কর্যক্রম। গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর লালবাগের হোসনি দালান ইমামবাড়া পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া এবছর তাজিয়া মিছিলে এসব ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন। আশুরা ?উপলক্ষে আজ হোসনি দালানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাজিয়া মিছিল বের হওয়ার কথা রয়েছে। মিছিলটি ধানমন্ডি লেকে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তাজিয়া মিছিলে ঢোল বাজিয়ে দা, ছুরি, তলোয়ার ও লাঠিখেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে এসব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১২ ফুটের বেশি বড় নিশান মিছিলে ব্যবহার করা যাবে না। আগুনের ব্যবহার করা যাবে না। মিছিলে ব্যাগ, পোঁটলা, টিফিন ক্যারিয়ার বহন করা যাবে না। অংশগ্রহণকারীদের মিছিলে ঢোকার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশির মুখোমুখি হতে হবে। মাঝপথে কেউ মিছিলে অংশ নিতে পারবেন না। বিবিকা রওজাসহ রাজধানীতে মিছিল যাওয়ার প্রতিটি পথে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। মিছিলের ও হোসনি দালানের স্বেচ্ছাসেবীদের শনাক্ত করতে আলাদা আর্ম ব্যাজ ব্যবহার করার নির্দেশনা রয়েছে। আজকের এ দিনটি মুসলমানদের কাছে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন। শুধু মুসলমান নয়, সকল মানুষের কাছে দিনটি স্মরণীয়। ইতিহাসে বিশাল জায়গা দখল করে আছে পবিত্র আশুরা দিবস। এছাড়া ইবাদত-বন্দেগির জন্যও এ দিবস অতুলনীয়। ইসলামিক গবেষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আরবি ‘শাহরুন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে মাস, আর ‘মুহাররম’ শব্দের অর্থ সম্মানিত। সুতরাং ‘শাহরুল মুহাররম’-এর যৌগিক অর্থ হলো ‘সম্মানিত মাস।’ আরবি ‘মুহাররম’ থেকেই ‘মহররম’ শব্দটি বাংলা সাহিত্যে ও বাংলাভাষী মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়।যাইহোক, মহররম হলো হিজরি সনের প্রথম মাস। যা আল্লাহ তায়ালার নিকট সম্মানিত চার মাসের এক মাস। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা ১২, যেদিন থেকে তিনি সব আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোর সম্মান বিনষ্ট করে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’ (সুরা তাওবা : ৩৬) চার মাসের একটি হলো মহররম। এ মাসের দশ তারিখকে বলা হয় ‘আশুরা।’ কারণ, আরবি ‘আশারা’ থেকে এর উৎকলণ। যার অর্থ হচ্ছে দশ। তাই এ মাসের দশ তারিখকে পবিত্র আশুরা বলে অবহিত করা হয়। আদিকাল থেকেই আশুরার এই দিবসে বহু স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরিফ থেকে জানতে পাই। হাদিসে এসেছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেদিন আকাশ, বাতাস, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, জান্নাত-জাহান্নাম, লাওহে মাহফুজ ও যাবতীয় জীবের আত্মা সৃজন করেছেন, সে দিনটি ছিলো ১০ মুহাররম তথা পবিত্র আশুরার দিবস। আবার এ দিনেরই কোনো এক জুমাবারে হযরত ইস্রাফিল আ.-এর ফুঁৎকারে নেমে আসবে মহাপ্রলয়। পবিত্র কুরআনের ভাষায় যাকে বলা হয়Ñ ক্কিয়ামত। এছাড়াও ইসলামের আরও অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে এ আশুরাতেই। আদি পিতা হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করা হয় এই দিনে। এই দিনেই হযরত আদম আ. ও মা হাওয়াকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। আবার ভুলের কারণে তাদের পৃথিবীতে প্রেরণের পর এই দিনই তার তওবা কবুল করা হয়। এমনিভাবে এ দিনে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম আ. জন্মগ্রহণ করেন। এদিনেই নমরুদের বিশাল অগ্নিকু- হতে মুক্তিলাভ করেন। এই আশুরাতেই তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে হযরত মুসা আ. কথোপকথন ও আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’ লাভ করেন। এই ১০ মহররমেই জালেম ফেরাউনের দলবলসহ নীল দরিয়ায় সলিল সমাধি হয়। হযরত নুহ আ. ও তাঁর সাথীদের মহাপ্লাবন হতে মুক্তি লাভ, মাছের পেট হতে হযরত ইউনুস আ.-এর পরিত্রাণ, আসমান হতে বৃষ্টি বর্ষণের সূচনাÑ এ সবকিছুই সংঘটিত হয়েছে ১০ মহররম অর্থাৎ আশুরার দিনে। সেকারণে এই ১০ মহররম যেন ইতিহাসের এক জ্বলন্ত সাক্ষী। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে এ দিনটির রয়েছে অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য। মুসলমানরা আশুরার রোজা রাখেন। মাসের ৯ ও ১০ তারিখে রোজা রাখা উত্তম বলে মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোজার কারণে আল্লাহ অতিতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ আশুরার দিনের অনেক তাৎপর্যময় ঘটনার একটি হচ্ছে, হিজরি ৬১ সনের এই দিনে মহানবি হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে কারবালার ময়দানে শহিদ হন। এছাড়া, এই দিনটিতে অনেক ফজিলতময় ঘটনা ঘটেছে। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক ধরা হয় পবিত্র আশুরাকে। মুসলমান ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মের লোক আশুরাকে সম্মান করে, শ্রদ্ধার চোখে দেখে। ইয়াহুদিরা এই দিনে রোজা রেখে মুসা (আ.)-এর অনুসরণ করে। খ্রিস্টানরাও এই দিনকে মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করে। আশুরা উপলক্ষে দেশে সরকারি ছুটি থাকে। যদিও এবারের আশুরা হচ্ছে শুক্রবার। এদিন এমনিতেই সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আশুরা উপলক্ষে দেশব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পুরান ঢাকার হোসেনি দালানসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্যোগে তাজিয়া মিছিল বের হবে। অন্যদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম মসজিদে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বিভিন্ন বেসরকারি রেডিও-টিভি চ্যানেলের এই দিনের তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার কথা রয়েছে। এই দিনটি মানুষের কাছে বেশি স্মরণীয় কারবালার প্রান্তরের কাহিনীর জন্য। এই দিন হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর দৈহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাৎবরণ করেন।ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিজরী ৬০ সনে এজিদ বিন মুয়াবিয়া পিতার মৃত্যুর পর নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসাবে ঘোষণা করে। সে এমনই পথভ্রষ্ট ছিলো যে, সে মদ্যপানকে বৈধ ঘোষণা করেছিলো। অধিকন্তু সে একই সঙ্গে দুই সহোদরাকে বিয়ে করাকেও বৈধ ঘোষণা করেছিলো। শাসক হিসাবে সে ছিলো স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী। ইমাম হুসাইন (রা.) এজিদের আনুগত্য করতে অস্বীকৃত হন এবং ইসলামের সংস্কারের লক্ষ্যে মদীনা ছেড়ে মক্কা চলে আসেন। মক্কা থেকে তিনি কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কারবালার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তার পর এজিদ বাহিনীর সাথে নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই অসম যুদ্ধে ইমাম হুসাইন (রা:) এবং তাঁর ৭২ জন সঙ্গী শাহাদৎবরণ করেন। শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদি নিজে কণ্ঠদেশে ছুরি চালিয়ে ইমাম হুসাইন (রা.)কে হত্যা করে। দিনটি ছিলো ১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রিস্টাব্দ, ১০ মুহাররম, ৬১ হিজরি। এই যুদ্ধে সকলেই পানি বঞ্চনার শিকার হন। অর্থাৎ সকল পুরুষ সদস্যই নিহত হন। কেবলমাত্র রোগা ও দুর্বল জয়নুল আবেদিন ছাড়া। এটি এক অসম যুদ্ধ ছিলো। যেখানে হুসাইন ও তাঁর পরিবার বিশাল এক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আবু রায়হান আল বিন্নীর মতে, ‘তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং মৃতদেহগুলোকে ঘোড়ার খুর দ্বারা ক্ষতবিক্ষত ও পদদলিত করা হয়; মানব ইতিহাসে কেউ এমন নৃশংসতা দেখেনি। হত্যার আগমুহূর্তে হুসাইন রা. বলেন, ‘আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যদি মুহাম্মাদের দ্বীন জীবন্ত হয়, তবে আমাকে তরবারি দ্বারা টুকরো টুকরো করে ফেলো।’ উমাইয়া সৈন্যরা হুসাইন ও তাঁর পুরুষ সঙ্গীদের হত্যা করার পর সম্পদ লুট করে, মহিলাদে গয়না কেড়ে নেয়। শিমার জয়নাল আবেদীনকে হত্যা করতে চাইলে জয়নব বিনতে আলীর প্রচেষ্টায় কমান্ডার উমার ইবনে সাদ তাঁকে জীবিত রাখেন। তাঁকেও (জয়নাল আবেদীন) বন্দি নারীদের সাথে দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত