শিরোনাম

ইফতার: খুশির মুহূর্তে তৃপ্তির আহার

মাওলানা ইমদাদুল হক  |  ১৫:২৮, মে ২২, ২০১৯

১. রোযাদারের দুটি খুশি

ইফতার খুশির মুহূর্তে তৃপ্তির খাবার। রোযাদারের এ খুশির বহুবিধ কারণ রয়েছে। মহান আল্লাহর পরিচয় জানা মুমিন, তাঁর নিষেধ ও নির্দেশের কাছে সমর্পিত কোনো মুসলিম যখন আল্লাহর কোনো হুকুমের মুখোমুখি হয় তখন তার অন্তরে ভাবনা জাগ্রত হয়, বিশ্বজগতের মালিক মহান রাজাধিরাজ আল্লাহ তাঁর আদেশ-নিষেধের সম্বোধনে আমার মতো তুচ্ছ সৃষ্টিকে শরিক করেছেন! আমাকে দিয়েছেন হেদায়াত ও নির্দেশনা!

তারপর সে যখন কোনো আমলের তাওফীক পায় তখন কৃতজ্ঞতায়-ভালোলাগায় তার অন্তর বিগলিত হয়ে যায়। হৃদয়ে বিরাজ করে অত্যাশ্চর্য আনন্দ ও খুশি। তবে হৃদয়ভরা এ অপার্থিব আনন্দ নিয়ে সিয়াম পালন করলেও সারাদিনের অনাহারে তার মাটির দেহ ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে পড়ে। তখন দিনশেষে ইফতার গ্রহণের কালে তার বুকের জমিনে আশা বাসা বাধে, প্রতিশ্রুত আজর-সাওয়াব, প্রতিদান ও প্রতিফল সাব্যস্ত হল, ইনশাআল্লাহ। তখনকার তার হৃদয়ের অনুভূতি শুধু আর অপার্থিবতায়ই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পার্থিব-অপার্থিব একাকার হয়ে আনন্দ-খুশির এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয় যার সাথে কোনো প্রাপ্তিরই আর তুলনা চলে না।

তখন তার মুখ দিয়ে স্বতস্ফূর্তই বের হয়ে আসে, পিপাসা নিবারিত হল, শিরা-উপশিরা সিক্ত হল আর আল্লাহ চায় তো প্রতিদান সাব্যস্ত হল। একথাই নবুওয়াতের পাক জবানে উচ্চারিত হয়েছে, রোযাদারের দুটি খুশি। একটি ইফতারের সময়, অন্যটি তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময় (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি, ইবন মাজাহ)।

২. ইফতারের সময়

সূর্য ডোবার মাধ্যমে যখন রাতের সূচনা হয় তখনই রোযাদারের জন্য ইফতার করা বৈধ হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, অতপর তোমরা রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭)।

উমার ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন এদিক থেকে রাত আগমন করে, এদিক থেকে দিন বিদায় নেয় আর সূর্য অস্ত যায় তখন রোযাদার ইফতারের সময়ে উপনীত হয় (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি)।

৩. সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার পর অনতিবিলম্বে ইফতার করতেন এবং এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। উম্মাতকেও সেভাবেই নির্দেশনা দিয়েছেন।

আবু আতিয়্যা রাহ. বলেন, একদিন আমি ও মাসরুক আয়িশা রা. এর নিকট গিয়ে বলি, হে উম্মুল মুমিনীন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম দুইজন সাহাবির একজন সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করেন এবং খুব তাড়াতাড়ি (মাগরিবের) সালাত আদায় করে নেন। আর দ্বিতীয়জন বিলম্বে ইফতার করেন এবং সালাতও বিলম্বে আদায় করেন।

তিনি বললেন, তাদের মধ্যে কে ইফতার অনতিবিলম্বে করেন এবং সালাত তাড়াতাড়ি আদায় করেন? আমরা বললাম, তিনি হচ্ছেন আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রা.। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরূপই করতেন (মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ি, তিরমিযি)।

আব্দুল্লাহ ইবন আবু আওফা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সফরে ছিলাম এবং তিনি সওমরত ছিলেন। সূর্য অস্ত যেতেই তিনি বললেন, হে অমুক, তুমি সওয়ারী হতে নেমে আমাদের জন্য ছাতু তৈরি করে আনো।

তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আর একটু সন্ধ্যা হতে দিন। তিনি বললেন, তুমি নেমে যাও এবং আমাদের জন্য ছাতু তৈরি করে আনো। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এখনো তো আপনার সামনে দিন রয়েছে।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি নেমে যাও এবং আমাদের জন্য ছাতু তৈরি করে আনো অতঃপর তিনি সওয়ারী হতে নামলেন এবং ছাতু তৈরি করে আনলেন। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আঙ্গুল দ্বারা পূর্বদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, যখন তোমরা দেখবে যে, রাত এদিক থেকে আসছে, আর ওদিকে সূর্য ডুবে গেছে তখনই রোযাদারের ইফতারের সময় হয়ে গেল (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ)।

অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন রোযা থাকতেন একজন ব্যক্তিকে উঁচুস্থানে উঠে দাঁড়াতে আদেশ করতেন। সে যখন বলত, সূর্য অস্ত গেছে তিনি তখন ইফতার করতেন (তাবারানি; হাইসামি বলেন, হাদীসটির সনদে ওয়াকিদি রয়েছেন, তিনি দুর্বল। তবে তাকে নির্ভরযোগ্যও বলা হয়েছে)।

সাহাবিরাও সূর্যাস্তের সাথে সাথে দ্রুততার সাথে ইফতার করতেন এবং সে জন্য কোনো কোনো সাহাবি এধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন বলেও বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

৪. দ্রুততার সাথে ইফতার করার মাঝে রয়েছে উম্মাহর কল্যাণ

সাহল ইবন সা‘দ রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লোকেরা (অন্য বর্ণনায় রয়েছে: আমার উম্মাত) যতদিন শিগগির ইফতার করবে ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে। (বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি, আহমাদ)।

আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দাদের মাঝে যারা তাড়াতাড়ি ইফতার করে তারাই আমার বেশি প্রিয় (তিরমিযি; ইবনুল আসীর বলেন, হাদীসটির সনদ দুর্বল, তবে একাধিক শাহিদ একে শক্তিশালী করে)।

৫. স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করো, বিজয়ী থাকবে

ইসলাম সকল ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্যের শিক্ষা দেয়। কেননা স্বাতন্ত্র্য ছাড়া পৃথিবীর বুকে সগৌরবে টিকে থাকা যায় না। নির্বিচার পরাণুকরণকারী পরাজিত হয়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু ইসলাম বিজয়ী থাকতে চায়, বিজিত হতে চায় না। তাই জীবনের সকল অঙ্গনে, এমনকি ইফতারের মতো ইবাদাতেও তার রয়েছে স্বাতন্ত্র্যের শিক্ষা।

আবু হুরাইরা রা. বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দীন বিজয়ী থাকবে যতদিন লোকেরা অবিলম্বে ইফতার করবে। কেননা ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানরা বিলম্বে ইফতার করে (আবু দাউদ, ইবন মাজাহ)।

৬. মাগরিবের সালাতের আগে ইফতার করা

আনাস রা. বলেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে কখনো ইফতারের আগে মাগরিবের সালাত আদায় করতে দেখি নি; যদি এক ঢোক পানি দ্বারা হয় তবুও (আবু ইয়া'লা, বাযযার, তাবারানি)।

৭. সূর্যাস্ত হয়েছে মনে করে ইফতার করা

আসমা বিনতে আবু বাকর রা. বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের যুগে এক মেঘাচ্ছন্ন দিনে আমরা ইফতার করলাম, এরপর সূর্য দেখা যায়। বর্ণনাকারী হিশামকে জিজ্ঞেস করা হল, তাদের কি কাযা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল? হিশাম রাহ. বললেন, কাযা ব্যতীত উপায় কী? (বুখারি, আবু দাউদ)।

শরীআতের বিধানে যদিও এ রোযার কাযা আদায় করতে হবে তবে আল্লাহর জন্য করা মুমিনের কোনো আমলই বিনষ্ট হয় না। আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের/ঈমানদারদের প্রতিদান নষ্ট করেন না (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৭১; সূরা তাওবাহ, আয়াত: ১২০; সূরা হুদ, আয়াত: ১১৫; ইউসুফ, আয়াত: ৯০)।

৭. কী দ্বারা ইফতার করব

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সাধারণত খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন এবং উম্মাতকে খেজুর দ্বারা ইফতার করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কোনো কোনো হাদীসে পানি ও ছাতু দ্বারা ইফতার করার কথাও বর্ণিত হয়েছে।

আনাস ইবন মালিক রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম (মাগরিবের) সালাতের পূর্বে কয়েকটি পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন, পাকা খেজুর না পেলে খোরমা দিয়ে, তাও না পেলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে ইফতার করতেন (আবু দাউদ, তিরমিযি)।

সালমান ইবন আমির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন ইফতার করে তখন সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। কেননা তা বরকতময় খাবার। কেউ যদি তা না পায় তবে সে যেন পানি দিয়ে ইফতার করে। কেননা পানি পবিত্র বা পবিত্রকারী (আবু দাউদ, তিরমিযি)।

৮. দুআ কবুলের সময়

বান্দার জন্য মহান আল্লাহ দরজা সব সময়ই উন্মুক্ত। বান্দা যখনই প্রার্থনা করে তিনি সাড়া দেন। তবে কিছু সময়ে রয়েছে দুআ কবুলের বিশেষ প্রতিশ্রুতি। ইফতারের সময় তার একটি।

আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন ব্যক্তির দুআ রদ হয় না: ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোযাদার যতক্ষণ না ইফতার করে এবং মযলুমের দুআ (তিরমিযি, ইবন মাজাহ)।

আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইফতারের সময় রোযাদারের একটি দুআ অবশ্যই, কবুল করা হয়, ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। হাদীসটির বর্ণনাকারী সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবন আমর রা. ইফতারের সময় নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে ডাকতেন এবং দুআ করতেন, হে আল্লাহ, আমি আপনার দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা প্রার্থনা করছি, যা সব কিছুর উপর পরিব্যপ্ত, যেন আপনি আমাকে ক্ষমা করেন (ইবন মাজাহ, তাবারানি, বাইহাকি, হাকিম, ইবনুস সুন্নি, তায়ালিসি; শুআইব আরনাউত হাদীস দুটির সনদ গ্রহণযোগ্য বলেছেন)।

৯. ইফতারের সময়ের দুআ

হাদীস শরীফে ইফতারের বিভিন্ন দুআ বর্ণিত হয়েছে। আমরা দুটি দুআ উল্লেখ করছি।
ক. 'যাহাবায যমায়ু ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ'। অর্থ: পিপাসা দূরীভূত হয়েছে, শিরা-উপশিরাগুলো সিক্ত হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ প্রতিদানও নির্ধারিত হয়েছে।

খ. 'আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু'। অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার উদ্দেশ্যেই সওম পালন করেছি এবং আপনার দেয়া রিযিক দ্বারাই ইফতার করেছি। (আবু দাউদ)।

ইমদাদুল হক, মাদরাসাতুত তাকওয়া, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত