বুক না ফেইসবুক !

শরমিন আক্তার পরী | ১৮:১০, নভেম্বর ১৪, ২০১৬

হাতে স্মার্ট ফোন নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে তাহিয়া। নাওয়া খাওয়া বলতে গেলে নেই। একটার পর একটা কার্টুন দেখাই তার প্রধান কাজ। বয়স মাত্র চার বছর। তার চাচ্চু জয়নাল তাহিয়ার ইন্টারনেট আসক্তি দেখে এক সময় ইন্টারনেট কানেশন বন্ধ করে দেন। কিন্তু তাতে ঘটে বিপত্তি। সারাক্ষণ কান্না। জয়নাল ফের নেট কানেকশন অন করেদেন। এভাবে তাহিয়ার দিন পার হচ্ছে ইন্টারনেটে। অনেক সময় মোবাইল ইস্কিনে চলে আসছে অনাকাঙ্কিত সব ভিডিও। তাহিয়ার মতো শিশু থেকে তরুণ তরুণীরা তাদের বয়োসদ্ধিক্ষণ পার হওয়ার আগেই পরিচয় হচ্ছে অনাকাঙ্কিত সব বিষয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের দিত্বীয় বিভাগের শিক্ষার্থী কাফি হাসান। হাটতে হাটতে স্মার্ট ফোনে বন্ধুর সাথে চ্যাটিং করছে।

জানতে চাইলে কাফি জানান, ঘুরতে বের হয়েছে সে। এরই মাঝে অন্যান্য বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং করছে। দেখা যায় কিছুক্ষণ পর কাফি একা বসে পড়ে পাশের এক আঙ্গিনায়। ব্যস্ত সময় পার করছে মোবাইলে। এভাবে তার মতো উঠতি বয়সি তরুণ তরুণীরা অধিকাংশ সময় পার করছে ইন্টারনেটে। খেলাধুলা বা সহপাঠিদের সাথে সময় কাটানোর পরিবর্তে এক কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। পেয়ে বসছে তাদের ইন্টারনেট আসক্তি। কয়েক বছর আগেও যেখানে পাঠ্য বইয়ের বাইরে কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা ছিল বেশি। এখন তারা ব্যস্ত সময় পার করছে ফেসবুকে। ক্লাসের বাইরে জ্ঞানার্জনে বই পড়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ায় হুমায়ূনের উপন্যাসের হিমু, মিছির আলী, শুভ্র, বাকের ভাই, রুপা চরিত্রগুলোর অনুকরণ শুরু হয়েছিল সমাজে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে শিল্পসাহিত্যের সমঝদারদের মধ্যে ও এ প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে মোবাইল, গুগল, ফেইসবুক ইত্যাদি বইয়ের প্রতি তরুণ-তরুণীদের আগ্রহে ধস নামিয়ে দেয়। মোবাইলে আকৃষ্ট হয়ে পড়ায় মেধা বিকাশে যে বই পড়া পরিহার্য সেটা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

ইন্টারনেট আসক্তির বিষয়টি প্রথম মনোবিজ্ঞানীদের নজরে আসে ১৯৯৭ সালে Cincinnati Case-এর মাধ্যমে। Sandra Hacker নামে একজন মহিলা তাঁর তিনটি শিশু সন্তানকে অবহেলা করে ও নির্জন কামরায় আবদ্ধ রেখে দৈনিক ১২ ঘন্টারও বেশি সময় ইন্টারনেটে অতিবাহিত করতেন। ওই মহিলাকে পর্যবেক্ষণ করে মনোবিজ্ঞানীদের অনেকেই সম্মত হলেন যে সিগারেট, মদ ও ড্রাগের মত ইন্টারনেটেরও compulsive ক্ষমতা আছে অর্থাৎ যা একটি পর্যায়ে এসে মানুষ ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। সেই ধারণা থেকেই ‘Internet Addiction ’ কথাটির সৃষ্টি।

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ইন্টারনেটেরও পরিবর্তন হচ্ছে। আসছে নতুন নতুন ফিচার, ফাংশন, কনসেপ্ট। সেই সাথে দিনদিন বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহাকারী। চালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৫-১০% ব্যবহাকারী। বইমেলাগুলোতে দেখা যায়, শিশুরা বেশিরভাগই কার্টুনের বই কিনছে। টিভিতে যেসব কার্টুন দেখে, মেলায় সে বইয়ের খোঁজ করছে। আকাশ সংস্কৃতির কারণে হিন্দি ভাষার কার্টুন টিভিতে দেখায় তাদের পছন্দ বিদেশি কার্টুনের‘দেশি’ ভাষার বই বাজারজাত করছে প্রকাশরা। বছর কয়েক আগেও বই পড়ার হিড়িক দেখা গেছে শহুরে ও পাড়া-মহল্লার ক্লাব-পাঠাগারে। কম বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে কিশোর পত্রিকার পড়তে পড়ে যেত হুড়োহুড়ি। তার টিফিনের টাকা জমিয়ে পত্রিকা কিনে সেটি পড়তে হতো হুড়োহুড়ি। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাইয়িদের নেতৃত্বে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র বই পড়ার প্রতিযোগিতা ফেরি করত। এখন ম্যাগাজিন ও বইয়ের দিতে তাকাতেই যেন তাদের যত অনীহা।

চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর বিবিসি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা সিটি নিবাসী শেন ও পেগি ওয়েস্টফ্যালের ১০ বছর বয়সি পুত্র ব্র্যাডি দিন কয়েক আগে পেটের যন্ত্রণা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়। শেন ও পেগি ছেলেকে নিয়ে যান ডাক্তারের কাছে। উপসর্গ দেখে ডাক্তাররা প্রথমে মনে করে স্টমাক ফ্লু হয়েছে। চিকিৎসাও শুরু হয় তার। কিন্তু শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ডাক্তাররা তার সিটি স্ক্যান ও এন্ডোস্কোপি করার সিদ্ধান্ত নিলে পরে দেখা যায়, ব্র্যাডের ক্ষুদ্রান্তের কাছে দানা বেঁধে রয়েছে কোনও অদ্ভুত জিনিস। ব্র্যাডকে জিজ্ঞাসা করায় সে এক ভয়ঙ্কর তথ্য উদ্ঘাটন করে।

সে জানায়, গত কয়েকদিন ধরে একটি একটি করে মোট ৮টি চুম্বক সে গলাধঃকরণ করেছে। ওকলাহোমা ইউনিভার্সিটি মেডিকাল সেন্টারের ডাক্তাররা এরপর অপারেশনের সাহায্যে ব্র্যাডের পেট থেকে চুম্বকগুলি উদ্ধার করেন। অপারেশনের সময়ে দেখা গিয়েছে, সারিবদ্ধ চুম্বকগুলি ব্র্যাডের ক্ষুদ্রান্তকে ক্ষতবিক্ষত করতে করতে তলপেটের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। ব্র্যাডের দেয়া তথ্য আরো ভয়ানক। সে মনে করতো তার পেটে পাওয়ার জমা আছে। তার কোন ক্ষতি হবে না।

ডাক্তারদের চিন্তার কারণ এটাই যে, এরকম মারাত্মক বদভ্যাসে একা ব্র্যাডিই আক্রান্ত নয়। ডাক্তার গ্রানো জানান, চুম্বক খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া শিশুদের সংখ্যা দেশে ক্রমাগত বাড়ছে। চিকিৎসার সূত্রে সারা দেশেই এই ধরনের শিশুর সন্ধান পেয়েছেন তিনি। মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় জানা যায়, ছেলেটি গেমস খেলায় অত্যধিক আসক্ত হয়ে পড়েছিল। দেখাদেখি গেমসের নায়কের মতো ব্র্যাডি ও পাওয়ার গ্রহণ করতে শুরু করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়াউর রহমান জানান, তথ্য প্রযুক্তির নেগেটিভ ও পজেটিব উভয় দিক রয়েছে। এটি একজন লোককে যেমন অনেক সুবিধা দিতে পারে তেমনি একজন তরুণ বা তরুণীর ক্যারিয়ারে অবক্ষয় ঘটাতে পারে। তিনি বলেন এই অবাধ তথ্য প্রযু্িক্তর সময়ে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে দূরে রাখতে হবে। বিশেষ করে তরুণ তরুণীরা যাতে এর আসক্তিতে জড়িয়ে না পড়ে সেদিকে অভিবাকদের সচেতন হতে হবে। স্কুল কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে অতিমাত্রায় ইন্টারনেট ব্যবহারের ফরে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলেও তার প্রভাব পড়ছে। অভিবাকরা তাদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইন্টানেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধ্যবাদকতা আরোপের জন্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

 

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon