ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান ভয়াবহ

এম. কে. দোলন বিশ্বাস | ১২:২২, নভেম্বর ০৫, ২০১৬

শিক্ষাখাতকে আমরাই একমাত্র উন্নয়নের শিখড়ে পৌঁছিয়ে দিয়েছি। সংযোগ করেছি ডিজিটাল পাঠ্যসূচি। ঢেলে সাজিয়েছি শিক্ষাব্যবস্থা। আনয়ন করেছি অভিনব প্রশ্নপত্রের। আমাদের শাসনামলেই বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। উপবৃত্তিও বাড়িয়েছি শতকরা হারে। যার ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের শিক্ষাখাত এখন রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। ‘শিক্ষাখাত’ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন মহাজোটবাদীদের এমন রসালো দাবির অপ্রিয় বাস্তবতা এখন অনেকটাই ফিঁকে বসেছে। কারণ আওয়ামীবাদীদের এগিয়ে যাওয়ার এ দেশে ক্রমেই নাতিদীর্ঘ হচ্ছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর মিছিল। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা গত ১ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে। পরীক্ষার প্রথম দিন জেএসসি ৪০ হাজার ৯২২ ও জেডিসিতে ১৮ হাজার ৭৬৫ শিক্ষার্থীসহ মোট ৫৯ হাজার ৬৮৭ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। (তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন-) এ হিসাব ছাড়াই পরীক্ষার্থী কমেছে আরও সাড়ে ৫ লাখ। ২০১৩ সালের প্রাথমিক সমাপনীতে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা চলতি জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এই তিন বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে সাড়ে ৫ লাখ। অর্থাৎ প্রাথমিক সমাপনীর পর থেকে জেএসসিতে আসা পর্যন্ত ওইসব শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপে প্রাথমিক ভর্তির হার বাড়লেও ঝরে পড়ার হার কমানো যাচ্ছে না। ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে- ১. সামাজিক অস্থিরতা। ২. অর্থনৈতিক ভারসাম্যের অভাব। ৩. প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলামের সমন্বয়হীনতা। ৪. বাল্যবিবাহ। ৫. ছেলেদের কাজে যোগদান। ৬. দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগের অভাব। এসব নানাবিধ সমস্যাকে দায়ী করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক ৫টি বই পড়ার একজন শিক্ষার্থী ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই ১৩ থেকে ১৪টি বই পড়তে হচ্ছে। অনেকেই এই বইয়ের চাপ নিতে পারছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ঝরে পড়া বন্ধ করতে সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি, ইংরেজি ও গণিতের অতিরিক্ত ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না ঝরে পড়ার হার। বরং ক্রমেই নাতিদীর্ঘ হচ্ছে ঝরে পড়াদের পরিসংখ্যান। এর জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কারিকুলামের সমন্বয়হীতা দায়ী। তবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমে এসেছে দাবি করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক এলিয়াছ হোসেন গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, ঝরে পড়া রোধ করতে বেশ কিছু প্রোগ্রাম বর্তমান চলমান। এর মধ্যে আছে সবার জন্য উপবৃত্তি। এছাড়াও দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিশেষ ক্লাসের মাধ্যমে উপযুক্ত করে তোলা, বাল্যবিবাহ নিরুৎসাহ করার নানাবিধ উদ্যোগ। এসব উদ্যোগের কারণে আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে আগের চেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া অনেক কমেছে। তবে প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঝরে পড়ার হার এখন স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে বলেও মনে করেন অধ্যাপক এলিয়াছ হোসেন। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের তথ্যনুযায়ী, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পিইসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই চলতি ১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তিন বছর আগে অনুষ্ঠিত পিইসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২৯ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ জন শিক্ষার্থী। গত ২৩ অক্টোবর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, এ বছর জেএসসি ও জেডিসিতে মোট পরীক্ষার্থী ২৪ লাখ ১০ হাজার ১৫ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১১ লাখ ২৩ হাজার ১৬২ ও ছাত্রী ১২ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫৩ জন। ছাত্র থেকে ছাত্রী বেশি এক লাখ ৬৩ হাজার ৬৯১ জন। ৮টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে জেএসসিতে ২০ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪৩ ও মাদরাসা বোর্ডের অধীনে জেডিসিতে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৭২ পরীক্ষার্থী নিবন্ধন করেছে। ২৮ হাজার ৮৪৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা ২ হাজার ৭৩৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরে ঝরে পড়েছে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার ৭৮ শিক্ষার্থী। শতকরা হিসেবে ঝরে পড়ার হার ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। এদিকে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (অর্থ ও প্রশাসন) আহ্বায়ক করে ২০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকার শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে বিনামূল্যে বই, উপবৃত্তি, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৬১টি জেলার পিছিয়ে পড়া ১২৫টি উপজেলার ৫৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের ভীতি দূর করতে অতিরিক্ত ক্লাস পরিচালনা করছে। কিন্তু এর কোনো কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া। বরং দীর্ঘ হচ্ছে ঝরে পড়াদের মিছিল। সূত্র মতে, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার মূল কারণ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক। মাধ্যমিকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মেয়ে। যারা বাল্যবিবাহ এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে শিক্ষা চালিয়ে নিতে পারছে না। আর ছেলেরা যোগ দিচ্ছে কাজে। কারণ পড়ালেখার চেয়ে কাজের মাধ্যমে আয় করাই পরিবারের কাছে লাভজনক বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওর ও পাহাড় এলাকার চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। দুর্গম এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বেশি হওয়ায় অনেকেই লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজে যোগ দিচ্ছেন। এজন্য সরকার তিন পার্বত্য জেলা ও চরাঞ্চলে আবাসিক স্কুল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় শহরে মানসম্মত আবাসিক স্কুল নির্মাণ করবে। এজন্য ডিটেইল প্রজেক্ট পরিকল্পনা (ডিপিপি) তৈরির কাজ করছে মাউশি। শহর ও গ্রামের মধ্য অর্থনৈতিক পার্থক্য এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যসূচির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে মন্তব্য করে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ব্যানবেইসের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. একরামুল কবির গণমাধ্যমে জানান, শিক্ষার্থীরা পিইসিতে যেভাবে পাস করে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হয়ে কারিকুলামের সঙ্গে তাল মিলাতে পারছে না। আমাদের দেশে অনেক শিশু শ্রমিক আছে। গ্রামগঞ্জে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের প্রয়োজনেই সন্তানদের লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজে লাগায়। যাদের পরিবার কৃষিকাজ করছে তারা ওই ধরণের কাজে চলে যায়। যার জন্য ঝরে যায়। তিনি আরো জানান, মেয়ে শিক্ষার্থীর শতকরা হার বাড়লেও ঝরে পড়ার হার তাদের বেশি হবে। প্রাথমিকে উপবৃত্তি ও দুপুরে খাবার দেয়ার কারণে সবাই ওখানে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায় এটা চালু না থাকার কারণে অনেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। যাতে করে তিন বছরে আস্তে আস্তে শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে তিনি পরামর্শ দিয়ে জানান, যেসব এলাকায় দরিদ্র শিক্ষার্থী বেশি সেখানে ‘মিড ডে’ মিল চালু করতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো সুদৃঢ় করতে হবে। যাতে করে দরিদ্র অভিভাবকরা কাজ পায় এবং সন্তানদের তারা কাজে না লাগায়। শিক্ষাবিদ এ্যামিরেটস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঝড়ে পড়াকে অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবেই দেখছেন। তিনি গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, শিক্ষা উপকরণ থেকে শুরু করে প্রাইভেট কোচিং, গাইড বই সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষা এখন বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। অনেকের পক্ষেই এই ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরো জানান, লেখাপড়ার সঙ্গে জীবিকার সম্পর্ক নেই। লেখাপড়া দিয়ে বেকারত্ব দূর হবে এমনটিও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে সমস্যাটাই অর্থনৈতিক। কিন্তু এই সমস্যার মূলে যেতে চাইছে না সরকার। এতগুলো শিক্ষার্থী কোথায় হারিয়ে গেলো? কেন হারিয়ে গেলো তাও বুঝতে চাইছে না। বরং এখন হুল্লোড় হয় জিপিএ-৫ নিয়ে। (তথ্যসূত্র: মানবজমিন-২৭.১০.২০১৬) শুধু প্রাথমিক পর্যায় থেকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়লেও ক্ষমতাসীন আওয়ামীবাদী মহাজোটের স্তবকরা সহসাই ঢেঁকুর তুলতে পারেন যে, তাদের শাসনামলেই শিক্ষার হার চতুরগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শিক্ষাখাতকে তারাই একমাত্র ঢেলে সাজিয়েছে। তাদের শাসনামলেই জিপিএ-এর হার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারাই একমাত্র বাংলার মাটি থেকে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়ল উচ্ছ্বেদ করেছে। কোনো প্রকার যাছাই বাছাই না করেই সেই সঙ্গে এক ঘোষণায় ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যায়লকে জাতীয়করণ করে প্রায় সোয়া লাখ ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ শিক্ষক বানানো হয়েছে। যার অধিকাংশই ছিল বেকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অশেষকৃপায় বাপ-দাদার পরিত্যাক্ত একখন্ড ভূমির বিনিময়ে তাদেরকে ‘জাতির হৃদপিন্ড’ হওয়ার সুর্বণ সুযোগ করে দিয়েছে। শিক্ষাখাতের এমন ‘কৃতিত্ব’ গণতান্ত্রিক কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশের অতিতে কোনো সরকারের আমলনামায় ছিল না। যার দরুণ ডিজিটাল বাংলাদেশের ‘শিক্ষাখাত’ এখন বহির্বিশ্বে রোল মডেল হয়েছে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, আওয়ামীবাদীদের ওইসব ফাঁকা আওয়াজে কান না দিয়ে বাস্তব পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখাই হবে সত্যিকারে শিক্ষাখাতের টেকসই উন্নয়ন ও ঢেলে সাজানোর বাস্তব হিসাব-নিকাশ।

(লেখক : এম. কে. দোলন বিশ্বাস, দৈনিক সংবাদের সাবেক সহ-সম্পাদক)

 

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon