রামপাল রূপপুর বনাম হরিদাসপাল উন্নয়ন যজ্ঞ

প্রিন্ট সংস্করণ॥এস এম হানিফ | ১৩:১৯, অক্টোবর ১৭, ২০১৬

পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রের সংবিধানকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, বলো তোমার বিধানাবলি কার স্বার্থে, বলবে জনগণের ও সার্বভৌমত্বের। প্রতিটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচারিক আদালতকে যদি জিজ্ঞাস করা হয়, রাষ্ট্র কার? বলবে জনগণের। দেশের সকল রাষ্ট্রীয় অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আইন, উপ আইন, বিধি, অনুচ্ছেদ দিয়ে যে শৃংখলার পুথি রচিত হয়েছে। সেগুলোও একই কথা বলবে, আমি জনতার, জনগণের সুরক্ষায় আমার মূলনীতি। তেমনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রশ্ন করা হয়। তাঁরা একজন বলবেন, আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তি ও আর একজন বলবেন, আমি জাতীয়তাবাদের মুখপাত্র। যে দুটি নীতি তাঁরা আওড়ান সেখানে জনগণ মূল রসদ উপাদান। কিন্তু পক্ষান্তরে জনগণের দোয়ায় তাঁদের ক্ষমতায়ন। সব ক্ষেত্রেই জনগণকে চিপে রস বের করে ক্ষমতার অমৃত সাধ গ্রহণ করেন। নিতান্তই জনগণ বড় দুটি রাজনৈতিক দলের নিকট হরিদাসপাল দু’পেয়ে জন্তু ছাড়া কিছু না। হরিদাসপাল জনগণের থাকেনা রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকার ও সুবিধা। ডাণ্ডা তাদের একমাত্র থেরাপি, ক্ষমতায় যেতে কিংবা ক্ষমতা থেকে নামাতে হরিদাসপালের রক্তে নির্মিত হয়ে থাকে। তেমনি রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বাগেরহাটে ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে বহু অবাঞ্চিত হরিদাসপালকে উচ্ছেদ করেছে সরকার, তারপর বালু ভরাটের মাধ্যমে দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড; পিডিবি ও ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন এনটিপিসির মধ্যে। মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে ভারতীয় এনটিপিসি ৫০ শতাংশ মালিকানা পাবে ও ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের লোন সুদের হারে ৭০% মালিকানা ভারত পাবে এবং পিডিবিকে এনটিপিসি থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করে দেশের ভিতরে সরবরাহ করতে হবে।

অর্থাৎ আমাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমাদের পরিবেশ ও জনপদ নষ্ট করে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্যের কাছ থেকে কিনে ব্যবহার করতে হবে এটাই হচ্ছে উন্নয়ন ! রামপাল প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম হবে স্বাভাবিক বাজার মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি, অর্থাৎ পিডিবিকে লোকসানজনক ভর্তুকি দিতে হবে বিদ্যুত উৎপাদনে অথবা বিদ্যুতের দাম নতুন করে বাড়াতে হবে। তাছাড়া এই প্রকল্পের জন্য গৃহীত ঋণ ও এর সুদের হারের লোকসান গুণতে হবে বাংলাদেশকে। বহুমুখি লোকসানি প্রজেক্টে রামপাল বিদ্যুত প্রকল্প যা পরিবেশ, জনপদ নষ্ট করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখাতে নরকে যাত্রা স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। নেই কোন পরিবেশ আইন নীতিমালা আছে শুধু ভারতীয়দের মুনাফা অর্জনের চুক্তির পায়তারা। এ ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প পতিতাদের দেহ ব্যবসার সাথে তুলনা চলে। দেহের ভোগের মূল্য নির্ধারণ ১০০ শতাংশ। দালাল, মিডিয়া, বাড়িওয়ালা, আইন শৃংখলাবাহিনী ভাগবাটোয়ারা ৭০ % শতাংশ এবং পতিতার পারিশ্রমিক ৩০% মালিকানা। যা সারারাত অমানবিক নির্যাতন সহ্য করে, ভোরে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারি হাতে সব উপার্যিত অর্থ খোয়া।

এখানে ছিনতাইকারি আর উন্নয়নে শাসক শ্রেণি একই। হরিদাসপালদের উন্নয়ন সুবিধা খুসবুতেই শেষ। কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে ভারতীয় আইন মতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫-২৫ কিলোমিটারের মধ্যে অনুমোদন দেওয়া যাবেনা আইন রয়েছে। তাছাড়া বিশ্বে বেশ কিছু রাষ্ট্রে, এই সকল পরিবেশ বিষয়ে কঠোর আইন বিদ্যমান যেমন, কানাডা ও ফ্রান্সে। ওই সকল উন্নত বিশ্বকেও প্রমাণ করতে হয় যে, প্রকল্পটি পরিবেশের ও জনপদের জন্য ক্ষতিকর নয়, যদি যথেষ্ট ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে তাহলেও অনুমোদিত হবেনা প্রকল্পটি। সেখানে বাংলাদেশের মত অব্যবস্থাপনামূলক রাষ্ট্রে অবশ্যই আইন পাস এবং স্থান বাছাই ও জনমত গঠন আবশ্যক ছিলো। যার কোনটিই সরকার করেনি, আরো ভাড়াটে বিশেষজ্ঞ এনে রামপালের পক্ষে গাওয়ানো হচ্ছে, সোনার বাংলার উন্নয়নের গান।

এগুলো আবার চাটুকার মিডিয়া টিভি টকশোতে জনগণকে ভুলটা বুঝানো হচ্ছে এবং বিজ্ঞাপনে কোট টাই পরা ভদ্রলোক সাজিয়ে সন্তানকে ভ্রান্ত জ্ঞান দিতে দেখা যাচ্ছে যে চিমনির উচ্চতা ৯০০ ফুট যা সুন্দরবনের গাছগাছালির অনেক উচুতে ধোঁয়া নির্গমন হবে অতএব সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। জ্ঞানপাপীদের বুদ্ধিবৃত্তি জ্ঞানচর্চা কত দূরভিসন্ধি লক্ষ্য করা যায়! ৯০০ ফুট উচু চিমনি ধোঁয়া কি শোধিত? বাতাসে ধোঁয়ার মিশ্রন হবে না? ধোঁয়ার সাথে নির্গত ছাই ভূমিতে ছড়াবেনা? এগুলো অজ্ঞ আমজনতা হরিদাসপালদের বোঝানো হচ্ছে যে এই উন্নয়ন তোদের বাবার শ্রাদ্ধের জন্য একান্ত প্রয়োজন ছিলো। রামপাল বিষয়ে ইউনেস্ক আপত্তি জানিয়েছে, আপত্তি বলে বাস্তবিক নই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

কিন্তু সুন্দরবনের চারটি মারাত্বক ঝুঁকি রয়েছে এই প্রকল্পের ফলে (১) বায়ু দূষণ : চিমনির উচ্চতা ৯০০ ফুট হওয়াতে বায়ু দূষণ হবে এবং ধোঁয়ার সাথে নির্গত ছাই আশপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। (২) পানি দূষণ : প্রতিঘন্টায় ৫ হাজার কিউবিক মিটার পানি পশুর নদ থেকে নেওয়া হবে এবং দূষিত পানি সুন্দরবনের নদে ছাড়া হবে। (৩) পুঞ্জিভূত দূষণ: প্রকল্পের ফলে রামপাল শহর ও অবকাঠামো প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ প্রয়োজন হবে। এই শহরের পানির সরবরাহ করবে পশুর নদ থেকে।
(৪) জাহাজ চলাচল : কয়লাবাহী জাহাজ চলাচল সুগম করতে ৩৫ কি: মি : নদি খনন প্রাক্কালে ৩ হাজার ঘনফুট মাটি তুলে ফেলতে হবে। (সূত্র: প্রথমআলো)।

দ্বিতীয় :
যেহেতু বিভিন্ন দেশ হতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি হবে। সেজন্য খননকৃত পথে ছোট ছোট নৌকা ও লঞ্চের মাধ্যমে বহন করে নিয়ে যেতে হবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। এই মালামাল ওঠানামা ও চলাচলে কয়লা-ভর্তি নৌকা ডুবি শঙ্কা রয়েছে, রয়েছে কয়লা পানি ও পরিবেশে নিঃসৃত হওয়ার ঝুঁকি। ফলে আবর্জনা, তেল, জাহাজ-লঞ্চ-নৌকা চলাচলে জলদূষণ ইত্যাদিতে সুন্দরবন ও সংলগ্ন পরিবেশের জল ও বায়ু দূষণ করবে। শুধু তাই নয়, এই চলাচলে সৃষ্ট ঢেউয়ে প্লাবিত হবে আশপাশের জমি এবং ক্ষয় হবে সুন্দরবনের ভূমি। এছাড়া রয়েছে নির্মাণকাজ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর ফলে সৃষ্ট শব্দ দূষণ ও আলো-দূষণ, যা সুন্দরবন ও আশপাশের জনপদের মানুষ ও প্রাণিদের জীবনচক্রে হুমকিতে পড়বে। ভাড়াটে বিশেষজ্ঞ যতই বলুক রামপালে ব্যবহৃত চোং সুন্দরবনের বহুলাংশে উঁচুতে তাই ধোঁয়া নির্গতের ফলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবেনা, সেখানে এই যুক্তিও খোড়া যুক্তি। কারণ এই সৃষ্ট ধোঁয়ার সাথে ছাই নির্গত হবে যা এক সময় এই জনপদের ওপরেই নেমে আসবে।

নতুবা মেঘের সাথে মিশ্রিত ধোঁয়া বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লেও কয়লার ক্ষতিকর দিকগুলো অক্ষুণ্ন থেকে যাবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রের পাশে বসবাসকারী মানুষজন দীর্ঘমেয়াদে ৩-৬ গুণ বেশি আক্রান্ত হন ক্যান্সার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও নিউরোডিজেনারিটিভ স্নায়ুরোগে, যেহেতু কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে সৃষ্ট বায়ু ও জল দূষণ মানুষকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তাহলে উন্নয়নটা মরণ ফাঁদ হয়ে উঠা অস্বাভাবিক কিনা সেজন্য সমালোচনায় হতে পারে একমাত্র সুষ্ঠু সঠিক উন্নয়নের টেকসই গ্যারান্টি ও কাংখিত সমাধান। বর্তমানে সরকারের উন্নয়নের বায়োস্কপ এক চোখে শুধু সরকারের চাটুকার শ্রেণিই দেখতে পারে। বিবেকবান মানুষ সমালোচনা আন্দোলন করবেই। সমালোচক সেই উন্নয়নের সুবিধা আতশগ্লাস লাগিয়ে দেখতে হয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত প্রকল্প পরিত্যক্ত পদ্ধতি। যেগুলো উন্নত বিশ্ব ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। এসব প্রকল্পে ক্ষতিকর দিক একশতে একশ থাকবে।

বর্তমানে বিজ্ঞান নিত্যনতুন পদ্ধতিতে বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব করে তুলেছে। দেখা যাচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রথম গুরুত্ব দিচ্ছে সেগুলো সোলার বিদ্যুত, বায়ু বিদ্যুত এবং জলবিদ্যুত ও সাগরের স্রোতকে কাজে লাগিয়ে। আরও মজার ব্যাপার হলো, প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্টেডিয়ামের দর্শক উম্মাদনা থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। তা সত্ত্বেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত প্রকল্প গ্রহণ করা সরকারের বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত। এই ধরনের প্রকল্পে বিশ্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে ভয়াবহতা দেখা যাবে। তাই নিশ্চিত করে বলা যায় সুন্দরবন অঞ্চল বিপর্যয়ের অশনি সংকেত এ প্রকল্প। কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে কিছুদিন আগেই বিপর্যয়ে পড়েছিল ভিয়েতনাম। দেশটির উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হা লং বে ও ওই অঞ্চলের জনপদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ার কারণে। শুধু ভিয়েতনাম নয় আরো দেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা।

প্রবল বর্ষণের কারণে হা লং উপসাগর বেষ্টিত ভিয়েতনামের কোয়াং নিন নামের একটি বহুমুখী কয়লা খনি ও বিদ্যুৎ্ কেন্দ্র বন্যার কবলে পড়ে। পানিতে কয়লার বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। কাম ফা শহর ওই বন্যায় পুরোটা তলিয়ে যায়। শহরের বাসিন্দাদের কয়লার বর্জ্য মেশানো বিষাক্ত কাদার মধ্যে হাঁটাচলা করতে দেখা যায়। অল্প দিনের মধ্যেই ওই দুর্যোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এর ফলে ল্যাং কান পোতাশ্রয় এলাকা ও ডিন ভং নদীতে কোয়াং নিন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষাক্ত পানি ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ে আরও কিছু অঞ্চলে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এমন একটি স্থানে অবস্থিত যে তার লাগোয়া সরোবরটির সঙ্গে বিশ্ব ঐতিহ্য হা লং বে অবস্থিত। হা লং বে ঘিরে রয়েছে ৫ হাজার ৭৩৬ হেক্টরের খোলা পিট কয়লা খনি ও তিনটি কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। বন্যায় সেগুলো সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়। নিরাপদ পানি সংরক্ষণ (ওয়াটার কিপার এলায়েন্স) জোট ওই ঘটনায় সরকারের বিষোদগার করে। ওখানকার ‘স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর এর আশু ও সম্ভাব্য বিপদ প্রতি ঘণ্টায় স্পষ্টত বাড়তে থাকে, যার মাত্রা পরিমাপ করা দুস্কর ছিলো। ভয়াবহতা দেখে সরকার, ইউনেস্কো এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটির কাছে উদ্ভুত দুর্যোগ, ভবিষ্যত দূষণ, কয়লাখনি ও কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন থেকে হা লং বে-কে উদ্ধার করতে দাতা সংস্থার সাহায্য প্রয়োজন হয়ে ছিলো।

তৃতীয় :
সম্ভাব্য ভয়াবহতা থেকে ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলকে রক্ষায় স্থানীয় মানুষের হস্তক্ষেপ কমানো খুব জরুরি। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলকে রক্ষা করতে সব পক্ষই মীমাংসিত বিষয়ে কাজ করছে এমন একটি পরিবেশ এখন অপরিহার্য। সেখানে সুন্দরবন বিনষ্ঠ করে, জনপদ বিপর্যস্ত করে কি উন্নয়ন সংগঠিত হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সুমদ্র থেকে উৎপন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকাতে সুন্দরবন প্রকৃতিক ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য জীব উদ্ভিদের অরণ্য আবাসন, রাশি রাশি সবুজায়ন পৃথিবীর বৃহত ম্যানগ্রোভবন যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে যাচ্ছে সুন্দরবন। সুন্দরবন কি মানুষের তৈরি করা সম্ভব? সুন্দরবনের বিকল্প শুধুই সুন্দরবন। যখন রামপাল প্রকল্পটি নিয়ে এতো প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলন করে যাচ্ছে সচেতন সমাজ। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বিবেচ্য বিষয় আমলে নেওয়া প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু দেখা গেলো তার উল্টোটি, আন্দোলনকারি হরিদাসপালদের চরম অবমাননাকর খিস্তি খেওর, অর্থমন্ত্রীর কথায় বাস্টার্ডবয় লেলিয়ে দিচ্ছে সরকার। রামপাল প্রকল্প বন্ধ হলে কি সরকারের পতন হয়ে যাবে? অবশ্যই না। তাহলে জনমতের সব অধিকার, সুবিধা, উপেক্ষা করা অগণতান্ত্রিক হলো না? হরিদাসপাল জনগণ সংকিত এ কারণেই যে প্রধানমন্ত্রীর বিকল্প পাওয়া যাবে কিন্তু সুন্দরবনের বিকল্প আর নাই। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা চুক্তির আগে পরে মুক্ত আলোচনার ব্যবস্থা করা বা দেশি বিষেশজ্ঞদের নিয়ে পরামর্শ করা আবশ্যক ছিলো। কারণ কয়লাভিত্তিক প্রকল্প বিশ্বজুড়ে একটি ‘ভয়ানক বর্জ্য উৎপাদক’ কারখানার নাম। এটা ওয়াটার কিপার এলায়েন্স বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে প্রমান করেছে। কয়লাখনির বর্জ্য ‘টাইম বোমা’র মতোই ভয়ানক যদি প্রবল বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সঠিকভাবে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকে। এ জাতিও কারখানা ব্যাপক আকারে বিষাক্ত বর্জ্য নির্গমন করে। এর মধ্যে আর্সেনিক, বোরন, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, লেড, ম্যাঙ্গানিজ, সেলিয়াম এবং থেলিয়াম মানুষ ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে বলে জানান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুলের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যারন বার্নস্টেইন। বন্যার পানিতে খোলা পিট কয়লার খনি বা কয়লাভিত্তিক কারখানা থেকে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম এবং সীমার মতো ভারী ধাতব বিষ পাতলা স্তরের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অন্যান্য ধাবত বিষও একইভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের গবেষণা থেকে জানা যায় এমন দূষণের কারণে ভিয়েতনামের ওই অঞ্চলটির মাটিও নষ্ট হয়েছে। কয়লার দূষণ বন্যাকে আরও স্থায়ীত্ব দেবে-যা আমরা দেখেছি নিউ অরলিন্সের হ্যারিকেন ক্যাটরিনার পরিবেশগত দূষণের অভিজ্ঞতা থেকে। সুতরাং কয়লাভিত্তিক কারাখানা অঞ্চলে বন্যার কারণে স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আরো ত্বরান্বিত করে। তাহলে অবশ্যই একবার না, বার বার ভেবে দেখতে হবে সরকারকে এমন প্রকল্প সুন্দরবন অঞ্চলের জন্য নিরাপদ কী না। তাছাড়া এই প্রকল্পের জন্য আমাদের যোগ্যতার বহর কতটুকু! রামপাল প্রকল্পের চুক্তি ত্রিশ চল্লিশ বছরের প্যাকেজ চুক্তি। প্যাকেজ প্রকল্পের জন্য প্যাকেজ স্থান দেশের ভিতরে বহু রয়েছে। সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া হটকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু না। তাহলে কি শুধু সুন্দরবনকে ধ্বংসের টার্গেট করেই এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে! এমন পরিবেশ, জনপদ বিপর্যয়কারি, অলাভজনক প্রকল্প থেকে সরকারের সিদ্ধান্ত হতে সরে আসলে দেশের মঙ্গল হবে। সেখানে সুন্দরবনের অস্তিত্ব নিয়ে কোন রাজনীতির নোংরা খেলা হরিদাসপাল জনতা কাম্য করেনা। আবার অন্যদিকে এটাও কাম্য হবেনা, একরোখা জ্বেদের আগুনে প্রকল্প বাস্তবায়ন হোক। তাহলে সেই হরিদাসপাল জনগণ তা প্রতিহত করবে। কারণ এ ধরনের কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের বিষয়ে ওয়াটার অ্যালায়েন্স ২০০৮ সালের পর থেকে কয়লাজনিত কয়েকটি দুর্যোগের অভিজ্ঞতার বর্ণনা প্রকাশ করেছে। দেখা যাচ্ছে কয়লাভিত্তিক কারখানার নির্গত বর্জ্য থেকে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের কিংস্টোনে টেনিসি ভ্যালি কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে নির্গত বর্জ্যরে কারণে ভারী ধাতব বিষে এমনি নদীর পানি দূষিত হয়। ২০১৩ সালে কানাডায় হ্যালোউইন নাইটে কয়লা থেকে নির্গত বর্জ্য দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিবেশ দূষণ হয়। হিলটনের আলবার্তায় ওবেদ পাহাড়ের কয়লা খনির বাঁধ উপচে ২৬৪ মিলিয়ন গ্যালন দূষিত পানি শহরে ঢুকে যায়। এতে অ্যাথাবাস্কা নদীর ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পানি দূষিত হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে কয়লাজনিত রাসায়নিক বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার এল্ক নদীতে। এতে ওই অঞ্চলের ৩ লাখ মানুষের নিত্য ব্যবহৃত পানি দূষিত হয়ে পড়ে। একই সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক এনার্জির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই ছড়িয়ে পড়ে। কয়লার বর্জ্যে ড্যান নদীর পানিও দূষিত হয়। ওয়াটারকিপার এলায়েন্স এ ঘটনায় ড্যান নদীতে নিরীক্ষা চালিয়ে পানিতে বিষাক্ত পদার্থ প্রমান পাই। একই সঙ্গে ডিউক এনার্জির বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে বায়ু দূষণের অভিযোগ উত্থাপন করে এলায়েন্সটি।

চতুর্থ :
রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুত প্রকল্প চুক্তি অনেকটা গোপনেই সেরে ফেলা হয়েছে। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার দিন সারা দেশের মানুষ যখন আতংকিত সেদিন রূপপুর চুক্তি হচ্ছে। ঝোপ বুঝে কোপ মারা আর কি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প চুক্তি রাশিয়ার সাথে সম্পন্ন করেছে সরকার। এই গোপনীয়তা হাজারও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এটাও কি উন্নয়ন না অধপতন হবে! একারণে সচেতন মহল ও সমাজ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা শংকিত রূপপুর নিয়েও। বিদ্যুত প্রকল্পের উন্নয়ন হলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সূচক বৃদ্ধি পাবে। যার সুফল জনগণের ভোগ করবে আসা করা যায়। তাহলে এ কেমন উন্নয়ন যে সেটা নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রদান করতে হবে? এদেশের মানুষের সাথে আজব আজব প্রতারণা করে যাচ্ছে শাসক সেটা বার বার মনে করিয়ে দেওয়ার আছে। রূপপুর প্রকল্পের বর্জ্য রাশিয়া নিয়ে যাবে আজগায়েবি তথ্য ও মিথ্যাচার। সেটা প্রমানিত করে দিল গণমাধ্যম, যে রাশিয়া এদেশ থেকে বর্জ্য নেবে না। রাশিয়ার সংবিধান থেকে শুরু করে কোথাও এধরনের আইন বা রেকর্ড নাই যে তারা বর্জ্য ফেরত নিচ্ছে। তাহলে এই মিথ্যাচার দিয়ে কি ঢাকতে চাইছেন? শংকা হলো প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ জনবল নিয়ে পারমাণবিক চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। সেখানে বাঙালির মত অদক্ষ বিশৃংখল জনগোষ্ঠি এই প্রকল্প সুখবর বয়ে আনতে পারবে কিনা! এধরনের প্রকল্পের আগে এ দেশের মানুষের মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন হওয়া জরুরি। নইলে পারমাণবিক বিষক্রিয়া সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ অতিতের রাজনৈতিক ধ্বংসলীলা সব রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিকরেই সম্পন্ন হয়েছে। সেজন্য দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে মানবিক উন্নয়নে মনযোগী হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্র্ণ। উন্নত বিশ্বে উন্নয়ন দিয়েই শুধু এগিয়ে যায়নি, তারা তাদের দেশের জনগণকে, আগে মানবিক জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবল গঠন করেছে। তারপর দেশ উন্নয়নের চূড়ায় পা রেখেছে। কাজেই পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে যে রিপোর্ট রয়েছে তা খতিয়ে দেখা আবশ্যক। যেমন আগামি ২০৫০ সাল পর্যন্ত ৮টি উন্নয়নশীল দেশকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনেরও অনুমতি দিয়েছে জাতিসংঘ। এখন ফুকুসিমার দুর্ঘটনার পর অনেক দেশ তার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জার্মানিসহ ইউরোপের অনেক দেশে প্রতিনিয়ত বিক্ষোভ চলছে। জার্মান সাময়িকীর ফটো সাংবাদিক আনদ্রেই ক্রেমেনশুক সম্প্রতি চেরনোবিল সফর করে জার্মান বেতার ’ডয়েচে ভেলেকে’ তিনি জানিয়েছেন, চেরনোবিলের অর্ধেকটা মাটিচাপা দেয়া হয়েছে। ওই গ্রামে কেউ থাকে না। এত বছর পরও সেখানে বাতাসে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা মিলছে (১৮ মার্চ, ২০১১)। পরিসংখ্যান বলে ওই এলাকায় ক্যান্সার শতকরা ৪০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে বেলারুশের কৃষি দপ্তরে। বেলারুশ একটি স্বাধীন দেশ এখন। ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী দেশ হচ্ছে বেলারুশ। ভয়টা হচ্ছে এখানে যে, এত বছর পরও পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যাচ্ছে। আজ ঠিক তেমনটি হতে যাচ্ছে ফুকুসিমায় অঞ্চলে। চেরনোবিলের মত ফুকুসিমাকেও মাটি ও কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দিতে হয়েছে। তাতে করে তেজস্ক্রিয়তা বের হওয়া বন্ধ হবে বলা যায়না। ফুকুসিমার দুর্ঘটনার পর এখনই ক্ষয়-ক্ষতির কিংবা মৃত্যুর খবর পাওয়া যাবে না। কতভাগ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে, তারও হিসাব পাওয়া যাবে অনেক পরে। খোদ টোকিও শহরে (ফুকুসিমা ১১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত) এখন শাক-সবজিতে তেজস্ক্রিয়তা ধরা পড়ছে। তখন তার অর্থ পরিষ্কার-বাতাসে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা জাপানের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এবং সাগরের পানিতেও এই তেজস্ক্রিয়তা ধরা পড়ছে। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বর্ষিত হয়েছিল তা তাবত বিশ্ব অবগত। তার ফল এখনও ভোগ করে চলছে জাপানবাসী। আর ফুকুসিমা পারমাণবিক বিস্ফোরণের রেশ যে আগামিতে জাপানবাসীকে বছরের পর বছর বয়ে বেড়াতে হবে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এই দুর্ঘটনা জাপানের অর্থনীতিতেও আঘাত হেনেছে নিঃসন্দেহে। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে (১৭ মার্চ) ৫টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ফুকুসিমার মত বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এগুলো হচ্ছে বুলগেরিয়া, তুরস্ক, আর্মেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই ৫টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনেক পুরনো। অতীতে এখানে ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফুকুসিমার দুর্ঘটনা এখন বেশ কতগুলো প্রশ্নকে সামনে চলে এসেছে। বিশ্বব্যাপী যে ৭০০টি পারমাণবিক চুল্লী রয়েছে, তা কতটুকু নিরাপদ।

বিশ্বকে নিরাপদ বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ ক্ষেত্র একটি উদার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে বাংলাদেশের বেলাতেও। ফুকুসিমায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা। একটি সতর্কবার্তা বলতে পারেন। আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই মিথ্যাচার করে যাচ্ছি। পারমাণবিক বিপর্যয় মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া সম্ভব মনে করে বদ্ধ পাগলে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের নীতি-নির্ধারকদের বিষয়টি নিয়ে পুনরায় ভাবতে হবে। বাংলাদেশ জাপান নয়, সেই প্রযুক্তি ও জনবল আমাদের নেই। তাই ফুকুসিমার দুর্ঘটনার পর সারাবিশ্ব যখন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আতঙ্কিত তখন বাংলাদেশ কোন অবস্থাতেই এই উৎকণ্ঠা উপেক্ষা করতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় তাই এখনই। উন্নয়ন চাই পাশাপাশি হরিদাসপালদের সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তাও চাই। নইলে হরিদাসপাল জনগণ নিজের জীবন বাঁচাতে মসনদ থেকে টেনে নামিয়ে বিচার করবে। ভুলে গেলে চলবে না রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের বর্জ্য দেশের ভিতরে কোথাও না কোথাও ফেলতে হবে সে স্থানটি ঠিক করুন। কারণ বর্জ্য পদার্থকে চাপা দিতে আরো দুটি বিদ্যুত প্রকল্প সমান ব্যয় আসবে। তারপর না হয় উন্নয়ন নিয়ে মধ্যম আয়ের দেশে এগিয়ে যাওয়া যাবে।

 

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon