আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন

মাহমুদুল বাসার | ১১:৫৬, অক্টোবর ১৫, ২০১৬

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের ২২ তারিখ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সম্মেলন নিয়ে দেশব্যাপী জল্পনা-কল্পনা চলছে। এই ঐতিহ্যবাহী দলটির শুভাকাঙ্খীর সংখ্যা অগণিত। আওয়ামী লীগের দ্বারা এক পয়সা লাভবান হয়নি সারাজীবনে, তারপরেও দলটিকে মন থেকে ভালোবাসে, দেশে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। মূলত এরাই দলটির রিজার্ভ ফান্ড। স্বাধীনতার পক্ষের একমাত্র বড় দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ জীনৃত অবস্থায় আছেন বয়সের ভারে, তাই স্বাধীনতার পক্ষের অন্যতম দল ন্যাপ শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। শ্রদ্ধেয় জননেতা মনি সিংহ ও কমরেড ফরহাদ মৃত্যুবরণ করার পর সিপিবি আশানুরূপ শক্তিশালী হতে পারে নি। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিও সক্রিয়, বলবান নয়। এর তুলনায় স্বাধীনতার মূল্যবোধ বিরোধী দল ও পক্ষ অনেক শক্তিশালী। তারা পরোক্ষ কৌশলে এবং আন্ডার গ্রাউন্ডে ঐক্যবদ্ধ। জঙ্গিরা যে খুন-খারাবী করছে, মন্দিরের পুরোহিতদের, খ্রিস্টান-বৌদ্ধদের হত্যা করছে, হুমকি দিচ্ছে, প্রতিমা ভাংচুর করছে, আবার চিঠি লিখে হুমকি দিয়েছে যে, এ দেশে পূজা-অর্চনা চলবে না (গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জে), এসব ডেসপারেট ভূমিকার প্রতি স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির সমর্থন আছে। তাদের দাপটে এখনো আওয়ামী লীগ ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে আসতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দুটি সামরিক সরকার বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে নানা অপসংস্কৃতি মিশ্রিত করেছে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে। সংবিধানকে ধর্মীয় বিভাজনে বিভক্ত করা হয়েছে। সংবিধান সে ভাবেই গোঁজামিলের মধ্যে পড়ে আছে; তা ঠিক করা সম্ভব হয়নি মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক শক্তির চাপে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেও এসব, বাস্তব কারণে উৎপাটন করতে পারেনি। ড. মুনতাসীর মামুন বলেছেন হিজাবী’দের কথা। শেখ হাসিনা যথেষ্ঠ ক্যারিশমা নিয়ে ক্ষমতায় থেকেও শিরায় শিরায় অনুভব করেছেন হিজাবীদের চাপ! আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনকে সামনে রেখে কথাগুলো বলছি। দল ক্ষমতায় থাকলেই দলকে শক্তিশালী ভাবা ঠিক নয়। বঙ্গবন্ধুসহ, চার নেতাসহ, তার পরিবারের ৩২ জন সদস্য হত্যার পর কেন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করা সম্ভব হলো না, তার মূল্যায়নের জরুরী প্রয়োজন এখনো শেষ হয়ে যায় নি। নিশ্চয়ই দলের ভেতরে অবক্ষয় শুরু হয়েছিলো। দলের ভেতরের অপশক্তিকে প্রতিহত করার জন্য বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেছিলেন। তখন ঘরে বাইরে ফ্রি স্টাইল শুরু হয়েছিলো। স্বেচ্ছাচার বেড়ে গিয়েছিলো। এসব আত্মঘাতী দৃষ্টান্তগুলো স্মরণ রেখে বাঙালি জাতির প্রাণ প্রিয় দলটিকে শক্তিশালী করতে হবে। এ কথা অবিসংবাদিত ভাবে সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকার মর্যাদা কেবল আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরশীল। অন্য ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, তাদের পাত্তা না দেবার ক্ষমতা যথেষ্ট আছে হিজাবীদের। মনে করে দেখুন, ২০১৩ সালের ৫ মে, যেদিন মার মার কাট কাট ভঙ্গিতে মওলানা, আল্লামা শফির হেফাজত ঢাকা অবরোধ করে ফেলেছিলো, সেদিন কী ভয়ঙ্কর অবস্থার অবতারণা হয়েছিলো।তাদের সমর্থন দিয়েছিলো বিএনপি-জামায়াত, জাতীয় পার্টি। তারা সরকারের পতন ঘটাবার ঘোষণা দিয়েছিলো। তাদের ১৩ দফায় কী সাংঘাতিক কথা লেখা আছে, পড়ে দেখুন। হেফাজতের মধ্যযুগীয় ১৩ দফা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। দলীয় ভাবে আওয়ামী লীগ দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই ১৩ দফা বাঙালি জাতির ললাটে সেঁটে দেয়া হবে, বাংলাদেশকে পাক-আফগান বানানো হবে, সিরিয়া-ইরাকের দশায় পরিণত করা হবে। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনকে সামনে রেখে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথাটি মনে পড়ছে, ‘ফুল নিয়ে খেলবার দিন নয় অদ্য।’ আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার, ঐক্য বজায় রাখার সাধনাই করতে হবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব হচ্ছে দলের পরিমাণগত মানের চেয়ে গুণগত মান বৃদ্ধি করা। এর সরল ব্যাখ্যা হচ্ছে, দলের প্রতিটি পদে যোগ্য ব্যক্তিকে অধিষ্ঠিত করা। দলের নেতারা সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভাইটাল ভূমিকা পালন করে থাকেন। দলে যত ত্যাগী ও কর্মঠ, সৎ লোককে দায়িত্ব দেয়া হবে ততই সরকারের স্টাবিলিটি বাড়বে। কক্সবাজারের এমপি আবদুর রহমান বদি কী সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে? খাদিজা আক্তারের ওপর ছাত্রলীগের যে নেতা হামলা করেছে, সে কী দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে? বিশ্বজিৎকে হত্যা করেছে যে সব ছাত্রলীগ নামধারী কুলাঙ্গার তারা কী দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে? এই প্রতিবেদন লেখার সময় পত্রিকায় দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ১০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রি করা হচ্ছে দুস্থদের মাঝে। মহৎ পদক্ষেপ এতে সন্দেহ কী? কিন্তু দুঃখজনক খবর হলো, একদল সুবিধাভোগী এই চাল আত্মসাৎ করে কালোবাজারে বিক্রি করছে। এসব কারা করছে? গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিরোধী দল সুবিধা করতে পারেনি। ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণে নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ দলীয় লোকজন দায়িত্ব পালন করছে। যারা দলের লোক হয়েও এই মহৎ কার্যক্রমের ভেতর কালো হাত, লোভের নখর বাড়িয়েছে তারাতো দলের হিতাকাঙ্খী হতে পারে না। বর্তমান কাউন্সিলের মাধ্যমে যদি তৃণমূলের পদগুলোতেও মোটামুটি সৎলোক দায়িত্বশীল হতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগ বদনামের ভাগী হবে না। বঙ্গবন্ধু বারবার আত্ম সমালোচনার কথা বলেছেন। বর্তমান আওয়ামী লীগের মধ্যেও আত্ম সমালোচনার বাতাবরণ তৈরি করতে হবে। জবাবদিহিতার সিস্টেম বহাল করতে হবে। তাহলে দলে সৃজনশীলতা বাড়বে। দলের লোকজন যেন ঠিকমত জাতীয় দিবসগুলো পালন করে, বঙ্গবন্ধুর জন্ম-মৃত্যুর দিন যথাযথ পালন করে তার একটা তাগিদ দিতে হবে। আমরা লক্ষ্য করেছি, এই দিনগুলোতে শুধু ৭ মার্চের ভাষণ বাজিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়। এটা মোটেও ভালো কথা নয়। কাউন্সিলে এ ব্যাপারে একটা দিক নির্দেশনা থাকা উচিত। আওয়ামী লীগে যার যতটুকু অবদান আছে তা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করার রেওয়াজ চালু করা দরকার। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ওপর দুটো প্রবন্ধ লিখেছেন। একটির নাম ‘আমাদের মানিক ভাই’, অন্যটির নাম ‘আমার মানিক ভাই’। মানিক মিয়া সম্পর্কে বলেছেন বঙ্গবন্ধু, ‘১৯৪৩ সাল থেকে তার সাথে আমার পরিচয়। সে পরিচয়ের পর থেকে সারাটা জীবন আমরা দুই ভাই একসাথে জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম করেছি’। (এই দেশ, এই মাটি, বঙ্গবন্ধু ললিত কলা একাডেমি-২০০৮)। তাহলে বুঝতে হবে মানিক মিয়ার অবদান কতখানি। এমন আরও যাদের অবদান আছে, তাদের স্মরণ করলে দলের উপকার হবে। আওয়ামী লীগের সম্মেলন সফল হোক। জয় বাংলা।



 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon