একটি বাড়ি, একটি খামার : দারিদ্র্য বিমোচনের অঙ্গীকার

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারহানা রহমান | ১২:১৩, অক্টোবর ০৬, ২০১৬

বর্তমান সরকারের ‘দিন বদলের সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচিগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন অন্যতম। নির্বাচনী ইশতেহার এবং রূপকল্প ২০২১ অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনাসহ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার বিষয়ে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ অঙ্গীকারের আলোকে স্থানীয় সম্পদ, সময় ও মানব শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার তথা জীবিকায়নের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সংগঠিতকরণ, সঞ্চয়ে উৎসাহ প্রদান, সদস্য সঞ্চয়ের বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ বোনাস প্রদান, সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের মানবসত্তাকে শাণিতকরণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় পুঁজি গঠনে সহায়তা প্রদান, আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার কার্যক্রমসহ বহুমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। এ কার্যক্রমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সাথে মাঠপ্রশাসন, বিআরডিবি, প্রকল্পে নিয়োগকৃত কর্মকর্তা/ কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিগণ সরাসরি নিয়োজিত রয়েছেন।

দেশের ৬৪টি জেলার ৪৮৩টি উপজেলায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতি উপজেলায় ৪টি করে ইউনিয়ন হিসেবে ১৯৩২টি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মোট ১৭৩০০টি সমিতির সর্বমোট ১০ লক্ষ ৩৮ হাজার পরিবার এ প্রকল্পের আওতায় উপকৃত হয়। জুলাই ২০১৩ থেকে দেশের ৪৫০৩টি ইউনিয়নের অতিরিক্ত ২৩১৩৯টি গ্রামসহ মোট ৪০৫২৭টি গ্রামকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।

পল্লি দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ জীবিকায়নের অভাব। গ্রামীণ জনপদে জীবিকায়নে প্রধান সমস্যা হচ্ছে পুঁজি বা মূলধনের অভাব। এ জন্য পুঁজি গঠন ও তা আয়বর্ধক কাজে ব্যবহার করে জীবিকায়ন একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মূল দর্শন। প্রকল্পের উপকারভোগীগণ সাপ্তাহিক ৫০ টাকা হারে মাসে ২০০ টাকা সমিতিতে সঞ্চয় করেন। এ অর্থ সদস্যদের নিজস্ব অর্থ হিসেবে সমিতির ব্যাংক হিসাবে জমা রেখে একটি পাশবই প্রদান করা হয়। উক্ত পাশবইয়ে সদস্যদের বর্ণিত সঞ্চয় লিপিবদ্ধ করা হয়। সমিতির সদস্যদের নির্বাচিত ম্যানেজার সমিতির পক্ষে সদস্যদের সঞ্চয়ের অর্থ গ্রহণ, পাশবইয়ে উত্তোলন করে স্বাক্ষর প্রদান ও ব্যাংকে জমা প্রদান করার দায়িত্ব পালন করে থাকে। সদস্যদের নিজস্ব সঞ্চয়ের ওপর বার্ষিক লভ্যাংশ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের আয় কম বিধায় সঞ্চয়ে উৎসাহ থাকে না, পুঁজি সৃষ্টি হয় না।

সেজন্য সঞ্চয়ে উৎসাহ প্রদানের জন্য একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের উপকারভোগীদের নিজস্ব সঞ্চয়ের বিপরীতে উৎসাহ বোনাস প্রদানের ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। প্রকল্প হতে তিন মাস অন্তর উৎসাহ বোনাসের টাকা সমিতির ব্যাংক হিসাবে প্রেরণ করা হয়। সমিতির ম্যানেজার সরকার প্রদত্ত উৎসাহ বোনাস সদস্যের পাশবইয়ে লিপিবদ্ধ করেন।

গ্রাম পর্যায়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, ন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ এ প্রকল্পের বাজারজাতকরণ কর্মকাণ্ডে অনুসৃত কর্মকৌশল। এ ছাড়া বাজার সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান ও প্রশিক্ষণ কর্মকাণ্ডের আওতাভুক্ত। এ ছাড়া প্রকল্পে রয়েছে বাজারজাত কেন্দ্র স্থাপন, সিড ক্যাপিটাল প্রদানের ব্যবস্থা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাজারজাতকরণ/ বিপণন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের আওতায় ইতোমধ্যে ২২৯টি সমবায়ভিত্তিক বাজার গড়ে তোলা হয়েছে। অবশিষ্ট জেলা ও উপজেলায় পর্যায়ক্রমে বাজার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

প্রকল্প হতে বাজারগুলোর সাথে যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের উপকারভোগীদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ ও বাজারগুলোর মধ্যে নেটওয়ার্কিং সৃষ্টির লক্ষ্যে ই-মার্কেটিং চালুর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ই-মার্কেটিং চালুর ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতার হয়রানি কম হবে। উৎপাদক নিজেই বিক্রেতা হিসেবে সরাসরি বাজার মূল্য পাবে। মধ্যস্বত্ত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমে যাবে, উপকারভোগীদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। ভোক্তা ঘরে বসেই পছন্দমত পণ্য কেনাবেচা করতে পারবে।

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশের একক সর্ববৃহৎ প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠির ১০ শতাংশেরও অধিক পরিবারের দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সকল দরিদ্র জনগোষ্ঠির দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম গ্রহণের পরিকল্পপনা রয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃতি ও ইকোসিস্টেমকে ব্যবহার করে স্থানীয় সম্পদ, সময় ও মানব শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার তথা জীবিকায়নের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রভাব নিরূপণের জন্য পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডি এর কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততায় সরকার একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে। উক্ত কমিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১৬টি জেলায় ভ্রমণ করে ২৪০ জন উপকারভোগীর নিকট থেকে তাদের প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির পূর্বের ও পরের আর্থ-সামাজিক অবস্থা মূল্যায়ন করে একটি প্রতিবেদন পেশ করে।

উক্ত মূল্যায়নে প্রতিভাত হয় যে, প্রকল্পাধীন পরিবার যারা ইতোমধ্যে সমিতির তহবিল হতে ঋণ গ্রহণ করেছে এবং সে ঋণ আয়বর্ধক কাজে ব্যয় করেছে তাদের আয় গত এক বছরে গড়ে বেড়েছে ১০৯২১ টাকা। নিম্ন পরিসরের আয়ের পরিবারের সংখ্যায় ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এক দিকে নিম্ন আয়ের পরিবারের সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে একটু অধিক আয়ের পরিবার সংখ্যা বাড়ছে। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য গৃহীত প্রকল্পসমূহের মধ্যে একটি বাড়ি একটি খামার অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

এ প্রকল্প দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সঞ্চয়ের মানসিকতা তৈরি করেছে। সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একজন ব্যক্তি এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবেন। দেশের সার্বিক আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বিশেষ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে, রাখবে।



 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon