শিরোনাম

মালয়েশিয়ায় অবৈধ পথে ঝুকছে বাংলাদেশিরা, ৪ বছরেও মেলেনি ১৯জনের খোঁজ

শেখ সেকেন্দার আলী, মালয়েশিয়া থেকে  |  ১২:৫২, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

বৈধ ভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথ বন্ধের কারণে অবৈধ পথে ঝুকছে বাংলাদেশিরা। আর সেই সাথে যুক্ত হচ্ছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। বিগত দিনে শুধুমাত্র নৌকার উপর নির্ভরশীল ছিল মানবপাচার চক্র। এখন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ভ্রমণ ভিসা নিয়ে ইন্দোনেশিয়া হয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করছে। তাই আবারো নৌকায় ফিরছে দালালরা। আর ওই দালালদের বড় ধরনের নেটওয়ার্ক রয়েছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতে। শুধু বাংলাদেশ থেকে এসে নয়। আবার মালয়েশিয়ায় যারা দীর্ঘদিন কর্মরত আছেন তারাও অবৈধ পথে অস্ট্রেলিয়াতে পাড়ি জমিয়েছেন অনেকেই। শক্তিশালী নেটওয়ার্কে আছেন বাংলাদেশি ও ইন্দোনেশিয়ান।

দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় থাকার সুবাদে স্থানীয় নাগরিককে বিয়ে করে ব্যবসা বাণিজ্য খুলে মানবপাচারে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছেন কিছু বাংলাদেশি, শুধু মানবপাচার ই তাদের কাজ নয়, সাথে আছে অবৈধ হুন্ডির ব্যবসা এবং নাম না জানা অনেক ফ্যাক্টরিতে বাংলাদেশিদের ভিসা করিয়ে দেয়ার কথা বলে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

সংসারের স্বচ্ছতা আনতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বের হয়ে আজও বাড়ি ফিরে আসেনি ঝিনাইদহের ১৯ জন। চার বছর যাবৎ নিখোঁজ রয়েছেন তারা। বেঁচে আছে না মরে গেছে আজও জানতে পারিনি তাদের সন্তানরা। মা, স্ত্রী ও সন্তানরা আজও চেয়ে আছে কখন বাবা ফিরবেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুকে জয় করে মালয়েশিয়ায় এসেও শান্তিতে নেই অবৈধ অভিবাসীরা। দীর্ঘদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও মেলে না ঠিকমত বেতন। আবার তাড়া করে ফেরে কখন যেন গ্রেপ্তার হয় ইমিগ্রেশন এর হাতে।

মালয়েশিয়া প্রবাসী ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী এই প্রতিবেদককে জানান, যদি বৈধ পথে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলা থাকতো তাহলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ অবৈধ ভাবে পাড়ি জমাতে না। শুধু মালিসিয়া নয় অন্যান্য জায়গাতেও বৈধ ভাবে যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য। ওই বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আরো যোগ করেন, তবে অবৈধভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে আশা আমি সমর্থন করি না।

একাধিক সূত্র বলছে, অন রাইভ্যাল ভিসার সুবিধা ও নৌপথে মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি সময়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠার চেষ্টা করছে সাগর পথে মানব পাচারকারীরা। বিগত ৩ বছর বন্ধ থাকার পর বিভিন্ন কৌশলে সীমান্ত দিয়ে সমুদ্রপথে আবারো মানবপাচার শুরু করেছে দালাল চক্ররের সদস্যরা। শীতকালে সাগর শান্ত থাকায় ছোট নৌকায় মানবপাচার সুবিধাজনক। তাই টেকনাফ এলাকায় এই সময় কে বলা হয় ‘মানব পাচারের মৌসুম’। এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট।

তাদের র্টাগেট হচ্ছে এখন রোহিঙ্গারা পাশাপাশি বাংলাদেশিরাও। স্থানীয়দের অভিযোগ প্রশাসনের নমনীয়তায় স্থানীয় কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতারা দালাল চক্রের সদস্যদের সহায়তা করছেন। এছাড়া মানব পাচার মামলায় আসামি গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়ায় এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন তারা।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ থেকে ১৬ সালে টেকনাফ কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকা দিয়ে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মানব পাচারকালে দুই হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই সময় একাধিক নৌকা ডুবিতে মারা গেছে প্রায় কয়েক শত মানুষ। তার মধ্যে বেশি পাচারের ঘটনা ঘটছিল টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও সাবরাং খুরের মুখ এলাকা দিয়ে। তখন পুলিশের সঙ্গে একাধিক মামলার আসামি “বন্দুকযুদ্ধে” দালাল চক্রের অন্যতম দল নেতা ধলো হোছেনসহ সাতজন নিহত হন এরপর থেকে মানব পাচার তিন বছর বন্ধ ছিল।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া থেকে সমুদ্রপথে পাচারকালে ৫০ জনকে উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ নিয়ে চলতি বছরে প্রায় ৭০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন দালালকেও আটক করা হয়। এদিকে ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধার করা হয়েছে ২৫০ বাংলাদেশিকে। যারা সমুদ্রপথে পাচারের শিকার হয়েছেন। মালয়েশিয়ায় কাজ দেয়ার কথা বলে পাচারকারীরা তাদের সেখানে আটকে রেখেছে বলে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বর্ষা মৌসুমের শেষেই সমুদ্রপথে মানব পাচার শুরু হয়। ২০১৫ সালে সমুদ্র পথে মানব পাচারের ভয়াবহতা প্রথম প্রকাশ পায়। ওই বছরের মাঝামাঝি মালয়েশিয়ার সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে মানব পাচারকারীদের কিছু ক্যাম্প ও অভিবাসীদের গণকবর আবিষ্কারের পর পাচারের শিকার মানুষের চরম মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। ফলে কিছুটা হলেও নিস্ক্রিয় ছিল আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রগুলো। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয়ার পর আবারো তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জোর দেবে এবার বাংলাদেশিদের অবৈধ প্রবেশ এর কারণে মালয়েশিয়া সরকারও কঠোর নজরদারিতে রাখছে। যদি এই অবৈধ প্রবেশ না ঠেকানো যায় তাহলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে মনে করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত