শিরোনাম

পুরুষ দেখলেই মারমুখি সৌদি ফেরত মমতাজ

কাওসার আজম  |  ২০:৩৮, মে ২৫, ২০১৮

মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে শুক্রবার (২৫মে) সকালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন মমতাজ খাতুন। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই অস্বাভাবিক আচারণ করতে থাকেন তিনি। অভিভাবকহীন এই নারীকে প্রথমে বিমানবন্দরে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ডাক্তারের পরামর্শে নেওয়া হয় আগারগাঁও মানসিক হাসপাতালে। অভিভাবক না থাকায় সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে নিয়ে যাওয়া হয় যাত্রাবাড়ির শনির আখড়ায় প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ওকাপের শেল্টার হোমে।

এসব তথ্য নিশ্চিত করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন। তিনি আমার সংবাদকে জানান, খুব সকালে বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল কাদের আমাকে ফোনে সৌদি আরব ফেরত এই রকম অস্বাভাবিক আচারণের এক নারীর বর্ণনা দেন। তার ফোন পেয়েই বিমানবন্দরে ছুটে যাই। গিয়ে দেখতে পাই মমতাজ বেগম মানসিকভাবে খুবই অসুস্থ। জানতে পারি, বিমান থেকে তিনি খালি পায়েই নেমেছেন, সাথে পাসপোর্ট ছাড়া কোনো কিছু নেই। কথা বলতে পারেন না। হেলে দুলে হাটেন। অস্বাভাবিক আচারণ করছেন, দেখে বিমানবন্দরের মহিলা পুলিশ তাকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে যান। মমতাজ তাদেরও মারধর করতে উদ্যত হয়। এরপর বিমানবন্দরে দায়িত্বরত পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়।

নির্যাতনের শিকার বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের সহযোগিতায় কাজ করা ব্র্যাকের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে বসানোর পর মমতাজ অনেকটা নিরব হয়ে যান। তখনো পরিচয় জানা যায়নি তার। ওর পাসপোর্ট দেখে জানা গেল তার বাড়ি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার রুদ্রপুর গ্রামে। বাবার নাম আব্দুল রাজ্জাক দালাল। পাসপোর্টের নম্বর বিএমইটিতে সার্চ দিয়ে একটা মোবাইল নম্বর পাওয়া গেল। ফোন দিয়ে জানলাম ওই নম্বরটি মমতাজের ভাইয়ের। তার ভাই মমতাজের দেশে ফিরে আসার কিছুই জানেন না। দুই মাস আগে সর্বশেষ তাদের সাথে সৌদি থেকে কথা বলেছেন মমতাজ।

এরপর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। খবর পেয়ে ঢাকার পথে রওনা দেন মমতাজের ভাই। এরই মধ্যে জ্ঞান হারান তিনি। বিমানবন্দর ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার তাকে দেখে বললেন দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া উচিত। প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্স করে নেওয়া হলো পাশের কুর্মিটোলা হাসপাতালে। ওখান থেকে বলা হলো রোগী মানসিক রোগে আক্রান্ত। দ্রুত কোনো মানসিক হাসপাতালে নেওয়া উচিত। এরপর নেওয়া হয় আগারগাঁওস্থ জাতীয় মানসিক হাসপাতালে। ডাক্তার নিশ্চিত করলেন মমতাজ মানসিক ভারসাম্যহীন। হাসপাতালে ভর্তি করালে রোগীর সাথে কোনো আত্মীয় থাকা জরুরি, তখন পর্যন্ত সাতক্ষীরা থেকে মমতাজের ভাই রওনা দিলেও ঢাকায় এসে না পৌঁছানোয় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নেওয়া হয় রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগাম (ওকাপ)-এর শেল্টার হোমে।

ঠিক কী কারণে মমতাজের এই অবস্থা তা প্রত্যক্ষদর্শীরা সেভাবে বলতে না পারলেও দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতিত অভিবাসীদের সহায়তায় কাজ করা আল আমিন নয়ন প্রত্যক্ষদর্শী ও নিজের পর্যবেক্ষনের কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি বিমানবন্দরে নেমেই অস্বাভাবিক আচারণ করতে থাকেন। বিশেষ করে পুরুষ লোক দেখলেই মারমুখি হয়ে পড়ছেন। সিন্ট্রম দেখে মনে হচ্ছে তিনি শারীরিক-মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েই এই অবস্থা হয়েছে। হয়তো, নিয়োগকর্তারা তাকে ওই অবস্থায় বিমানের টিকেট কেটে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।

মমতাজ বেগমের পাসপোর্ট অনুযায়ী তার বয়স ৩২ বছর। বি.এস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি সৌদি আরবে যান। মমতাজের ছোট ভাই আফজাল হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার বোন একজন স্বামী পরিত্যাক্তা। তার ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছেলে রয়েছে। সংসারের অভাব-অনটন দূর করতেই সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ২ মাস আগে তাদের সাথে সর্বশেষ কথা হয়। ওইদিন সে ব্যাংকে টাকা পাঠিয়ে ফোন দিয়েছিল। কোনো সমস্যা আছে বলে তখন কাউকে কিছু জানায়নি। তবে ওইদিনের পর আর মমতাজ ফোন দেয়নি। বাড়ি থেকে ফোন দিয়েও তার নাম্বারে ঢোকেনি (সম্ভবত ইন্টারনেট নম্বর)। স্থানীয় সোহাগ নামের একজনের মাধ্যমে মতিঝিলের বি.এস ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মমতাজ সৌদিতে গৃহকর্মী হিসেবে যায়।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগাম (ওকাপ)-এর চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, বিমানবন্দর থেকেই সে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করছিল। মানসিক হাসপাতাল থেকে ডাক্তার ঘুমের ইনজেকশন দিয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে তার (মমতাজ) ফ্যামিলির লোকজন রওনা দিয়েছে, এখনো আসেনি (রাত ৮টা)। তারা না আসা পর্যন্ত মমতাজ আমাদের এখানেই (শেল্টার হোম) থাকবে। হাসপাতালে রোগীর সাথে তার পরিবারের কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। মমতাজের পরিবার সিদ্ধান্ত দিলে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হবে।

অভিবাসী কর্মীদের নিয়ে কাজ করা ওকাপের চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিনিয়ত আমরা এই ধরনের ঘটনা দেখছি। এই ধরনের সমস্যা নিয়ে প্রতিনিয়ত নারীকর্মীরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে আসছে। এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর রিপোর্টও করছি, কিন্তু তারা আমলে নিচ্ছেন না। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো সরকারিভাবে তাদের নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসার ঘটনাকে স্বীকারও করা হয় না। অথচ এসব অসহায় প্রবাসীদের জন্য সরকারের চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ অনেক কিছুই করার আছে। তাদের পাশে দাড়ানো উচিত।

মমতাজ খাতুনের ভারসাম্যহীন হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যারা যাচ্ছে তাদের সেভাবে ট্রেনিং দিয়ে পাঠানো হয় না। তাদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত-অসহায়। গিয়েই তারা সেখানকার পরিবেশ ও খাবারের সাথে অ্যাডজাস্ট হতে পারে না। নিয়োগকর্তাদের চাহিদামত কাজ করতে পারে না। তারা তো রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট টাকা খরচ করে নিয়ে যায়। যখন কাজ করতে পারে না, ভাষা জানে না আবার সেখানকার পরিবেশের সাথেও খাপ খাওয়াতে পারে না তখন শারীরিক, মানসিক যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। মমতাজের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত