শিরোনাম

সৗেদি থেকে দেশে ফিরলেন নির্যাতিত ৩৫ নারীকর্মী

শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
কাওসার আজম  |  ২০:১১, মে ০৪, ২০১৮

সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে আরো ৩৫ জন নারীকর্মী দেশে ফিরেছেন। এদের কেউ সেফহোমে, আবার কেউবা সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন জেলে ছিলেন। ফেরত আসা হতভাগা নারীদের অনেকেই টাকা দিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, কাউকে কাউকে আবার দেশে ফিরতে দালালকে টাকাও দিতে হয়েছে।

তাদেরই একজন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ার চরের আকলিমা। প্রায় তিন মাস আগে ফকিরাপুলের দালাল হালিমের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান আকলিমা। তিনি ৩ সন্তানের জনক। নেশাখোর স্বামী থেকেও যেন নেই। রিক্সাচালক দরিদ্র বাবা লাল মিয়ার বাড়িতেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে আশ্রিতা ছিলেন। সন্তানদের সুখের কথা ভেবে আকলিমা পাড়ি জমান সৌদি আরবে। যাওয়ার পর থেকেই অনেকটা নিরুদ্দেশ ছিলেন তিনি। মাস খানেক পরে বাড়িতে ফোন দিয়ে আকলিমা জানায় দিনরাত কাজ করতে হয়। কাজ না করলেই মারধর করে। মাস শেষে হলেও বেতন দেওয়ার কথা নেই কফিলের (নিয়োগকর্তা)। বেতন চাইতেই নির্দয়ভাবে মারধরের শিকার হতে থাকেন তিনি।

এ অবস্থায় দেশে ফিরতে চাইলে নির্যাতনের পরিমাণ আরো বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে আকলিমা বাংলাদেশ থেকে যে এজেন্সির মাধ্যমে সৌদিতে গেছেন তাদের রিয়াদস্থ অফিসে নেওয়া হয়। সেখানেও চলে তার উপর নির্যাতন। বাড়ি ফিরতে আকুতি জানালে নিয়োগকর্তা ও বাংলাদেশি অফিসের লোকজন নির্যাতন চালাতে থাকে। বলে তোকে এতো টাকা খরচ করে নিয়ে এসেছি। কাজ করতে হবে। এভাবে চলার পর একদিন নিয়োগকর্তার বাড়ির দেওয়াল টপকিয়ে পালিয়ে যান আকলিমা। কিন্তু কোথায় যাবেন...? পুলিশের হাতে পড়েন। এরপর ঠিকানা হয় সৌদির জেল। আকলিমার মা হাসনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেয়ের নিদারুন কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন এই প্রতিবেদককে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে আকলিমাসহ ৩৫ জন নারীকর্মী সৌদি আরব থেকে ইত্তিহাদ এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নামেন। এরপর আকলিমা বিমানবন্দর থেকে ভুল করে বাসে উঠে কিশোরগঞ্জের পরিবর্তে ময়মনসিংহে চলে যান। ফলে শুক্রবার (০৪মে) সন্ধ্যা নাগাদও কিশোরগঞ্জে ফিরেননি আকলিমা। রাস্তায় আছেন বলে তার মাকে ফোনে (অন্যের ফোন থেকে) জানিয়েছেন।

আকলিমার কষ্ট গাঁথা বলতে গিয়ে তার মা বলেন, প্রায় ১২ বছর আগে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ছেলে নেশাখোর। কাজ কর্ম করে না। এক বছরের মাথায় স্বামীর বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে চলে আসে। সৌদি প্রবাসী এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয় দালাল হালিমের সঙ্গে। তার মাধ্যমেই সৌদিতে পাঠাই আকলিমাকে।

তিনি জানান, মাস দেড়েক পরে ফোন দিয়ে মেয়ে কান্না করতে করতে বলে মা তুমি তোমার মেয়ের জীবন বাঁচাও। আমার জীবন ভিক্ষা দাও। এরপর আকলিমার বাপরে নিয়া আমরা এখানে সেখানে দৌাড়াই। অভাবের সংসার। ফকিরাপুলে দালাল হালিমকে পায়ে পর্যন্ত ধরি। বলি আমার মেয়েকে আইন্যা দাও। সে বলে তাকে আনতে ২ লাখ টাকা লাগব। এতো টাকা কোনে পামু। শেষ মেশ বাড়ির দলিল একজনের কাছে রাইখ্যা তাকে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছি। কালকে রাতে মাইয়্যাডা ঢাকায় নামছে। এরপরতো ভুল পথে ময়মনসিংহের চলে গেছে.....।

নির্যাতনের শিকার হয়ে বৃহস্পতিবার (০৩মে) রাতে দেশে ফিরেছেন যশোরের রোজিনা। স্বামী পরিত্যাক্তা এই নারী তিন সন্তানের জনক। বড় মেয়েকে বিয়েও দিয়েছেন। পাসপোর্টে ২৭ বছর দেওয়া হলেও তার বয়স চল্লিশের কোঠায়। স্থানীয় মোস্তফা ওরফে মস্তোর মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকায় তিন মাস আগে সৌদিতে যান তিনি।

শুক্রবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, যাওয়ার পর থেকেই নিয়োগকর্তার নির্যাতনের শিকার হতে থাকেন। আমি সেখানে গিয়েই অসুস্থ হয়ে পড়ি। অসুস্থ সত্বেও আমাকে দিনরাত কাজ করায়। একটু এদিক সেদিক হলেই লাঠি দিয়ে পেটায়। মাঝে মধ্যে সবাই মিলে পা উপরে ঝুলিয়ে নির্দয়ভাবে পিঠায়। ওদের কোনো দয়ামায়া নাই। হাত ওড়না দিয়ে বেঁধে পেটায়। ঠিকমতো খেতে পর্যন্ত দেয় না। এরপর সেখান থেকে পালিয়ে যাই। পুলিশ ধরে জেলে নেয়। এরপর বাংলাদেশ দূতবাসের মাধ্যমে দেশে আসি। এভাবে কথা হয় কিশোরগঞ্জের সালমা, খুলনার রিনা, নরসিংদীর জোসনার সঙ্গে। তারাও একইভাবে নির্যাতনের কথা জানান।

বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়ে কাজ করে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগ। ব্র্যাক মাইগ্রেশনের প্রধান শরীফুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ফেরত আসাদের মধ্যে ২ জন সৌদির সফর জেলখানায় ছিল। বাকীরা বিভিন্ন জায়গায়। তবে কেউই সেফহোমে ছিল না। তারা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার। শুনেছি, তাদের মধ্যে দুইজন রয়েছেন যারা পেগন্যান্ট। বাকীদের কমন নির্যাতন, মারধর-যৌন নির্যাতন।

তিনি বলেন, সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে আমার জানামতে গত এক দেড় বছরে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার দেশে ফিরেছেন। সৌদিও সেফহোমে আছে প্রায় ২০০ জন। সেখানে প্রতিনিয়ত এ পরিমাণ নির্যাতিত নারী থাকেন।

শরীফুল ইসলাম বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সৌদি সফরে গিয়ে এসব বিষয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু ফলাফল কি..? এখনো সেই আগের মতোই। আমার মনে হয় শুধু সৌদির নিয়োগকর্তাদের এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশটির সরকারের কাছে আরো জোরালো প্রতিবাদ হওয়া উচিত। কারণ জেনে শুনে আমরা তো কোনো মেয়েকে জাহান্নামে পাঠাতে পারি না।

এ ব্যাপারে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর সারোয়ার আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে ৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৩৬জন নারীকর্মী পাঠানো হয়েছে।

এর মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরবেই গেছেন ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৩৯জন। শুধু সৌদি আরব নয়, আরব আমিরাত, জর্ডান থেকেও একইভাবে নারীকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন।

এসব বিষয়ে এরই মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেছেন, কর্মীরা যাতে নিরাপদে থাকেন সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়। সম্প্রতি বিএমইটির ডিজি সেলিম রেজা বিদেশে নারীকর্মী পাঠানোর বিপক্ষে তার মতামত তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেছেন, একমাত্র দক্ষ কর্মী পাঠানো ছাড়া এই ধরনের অভিযোগ আসতেই থাকবে। সেজন্য ভাষাসহ সংশ্লিষ্ট কাজে দক্ষতা অর্জনের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত