শিরোনাম

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসা: ১৯ ক্যাটাগরিতে নারীর প্রাধান্য

প্রিন্ট সংস্করণ॥কাওসার আজম  |  ১৬:০৯, এপ্রিল ২৪, ২০১৮

১৯ ক্যাটাগরিতে কর্মী পাঠাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে গত ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ যে সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে তার বেশিরভাগই গৃহকর্মী বা বাড়ির কাজ। এসব কাজে বাংলাদেশ থেকে এখনো কর্মী যাচ্ছে, যাদের বেশিরভাগই নারী। এসব ভিসায় অনেক আগে থেকেই আমিরাতে কর্মী যাচ্ছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন খোদ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিও। তিনি বলেন, এটা ঠিক, তবে এতদিন কোনো ধরনের সমঝোতা স্বাক্ষর ছাড়াই কর্মী গেছে। সমঝোতা সইয়ের ফলে এখন লিগ্যালি যাবে। তবে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব ড. নমিতা হালদার বলেছেন, চুক্তিতে কিন্তু নারী-পুরুষ উল্লেখ নেই। উভয় দেশের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি গঠিত হবে। এরপর সেখানে আলাপ-আলোচনা শেষে আশা করি আগামী তিন মাসের মধ্যেই আমিরাতে কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে।

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ও সচিব অবশ্য একটা ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, অভিবাসন ব্যয় কত হবে, কারা কর্মী পাঠাবে এ ব্যাপারে সরকার এখনো কাউকে দায়িত্ব দেয়নি। তাই এখনই যেন কেউ এজেন্সি বা দালালদের সাথে কোনো প্রকার লেনদেন না করে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
আরব আমিরাতের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার আলোচনা শুরুর পর থেকেই মালয়েশিয়ার মতো সেদেশেও সিন্ডিকেট বা সীমিত পরিসরে কোনো কোনো রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হবে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, এটা হবে না।

এ ব্যাপারে বায়রার বর্তমান সভাপতি বেনজির আহমেদ ও মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপনকে কয়েকবার ফোন দিলেও তারা রিসিভ করেননি। তবে সংগঠনটির সাবেক সভাপতি আবুল বাশার দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, আশা করি মালয়েশিয়ার মতো কোনো সিন্ডিকেট আরব আমিরাতে হবে না। লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব রিক্রুটিং এজেন্সি সেখানে কর্মী পাঠাতে পারবে। যদি এ রকম চেষ্টা করা হয়, তাহলে আমরা তা মেনে নেব না, প্রতিহত করবো।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সূত্রে জানা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার। ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী গেছে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯৭ জন। ২০১২ সালের পর থেকে বড় পরিসরে কর্মী নেওয়া বন্ধ রেখেছে দেশটি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৬ সালে আরব আমিরাতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী গেছে ১ লাখ ৩০ হাজার ২০৪ জন। একইভাবে ২০০৭ সালে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৯২ জন, ২০০৮ সালে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ জন, ২০০৯ সালে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৮ জন, ২০১০ সালে ২ লাখ ৩ হাজার ২০৮ জন, ২০১১ সালে ২ লাখ ৮২ হাজার ৭৩৯ জন এবং ২০১২ সালে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৫২ জন। ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তম এই শ্রমবাজারে কর্মী যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। গত ৫ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৩ সালে আমিরাতে কর্মী গেছে মাত্র ১৪ হাজার ২৪১ জন, ২০১৪ সালে ২৪ হাজার ২৩২ জন, ২০১৫ সালে ২৫ হাজার ২৭১ জন, ২০১৬ সালে ৮ হাজার ১৩১ জন এবং বিদায়ী ২০১৭ সালে মাত্র ৪ হাজার ১৩৫ জন।
যাদের অধিকাংশই নারীকর্মী।

গত ১৮ এপ্রিল দুবাইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ১৯ খাতে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. নমিতা হালদার এবং আরব আমিরাতের পক্ষে সেদেশের মানবসম্পদ ও এমিরাটাইজেশন মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি সাইফ আহমেত আল সুআইদি স্ব স্ব দেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা স্বাক্ষরের বিস্তারিত জানাতে গতকাল রাজধানীর ইস্কাটনস্থ প্রবাসীকল্যাণ ভবনে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সেখানে জানানো হয়, হাউজমেড, প্রাইভেট সেইলর, ওয়াচশ্যান অ্যান্ড সিকিউরিটি গার্ড, হাউজ হোল্ড শেফার্ড, ফ্যামিলি চোফার, পার্কি ভ্যালেট ওয়ার্কার্স, হাউজহোল্ড হোর্স গ্রুমার, হাউজ ফ্যালকন কেয়ারটেকার অ্যান্ড ট্রেইনার, ডমেস্টিক লেবার, হাউজ কিপার, প্রাইভেট কোচ, বেবি সিটার, হাউজহোল্ড ফার্মার, গার্ডেনার, প্রাইভেট নার্স, প্রাইভেট পিআরও, প্রাইভেট এগ্রিকালচার ইঞ্জিনিয়ার, কুক এই ১৯ খাতে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আরব আমিরাতের সাথে সমঝোতা সই করেছে বাংলাদেশ।

পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উল্লিখিত ক্যাটাগরির প্রায় বেশিরভাগই গৃহকর্মী বা বাড়ির কাজকেন্দ্রিক। এ ব্যাপারে প্রবাসীকল্যাণ সচিব বলেন, দেখেন কোনো কিছু কিন্তু একেবারে শুরুতেই হয় না। যে জিনিসটি এতদিন দুঃসংবাদ ছিল। এত বছর ধরে একটা বাজার বন্ধ ছিল। হঠাৎ করে বাজারটি খুলে যাবে না। যে জিনিসটি তারা (সংযুক্ত আরব আমিরাত) প্রথম থেকেই আমাদের বুঝিয়েছেন। সচিব বলেন, তখন আমাদের দুর্বলতাগুলো কিন্তু তারা বারবার বলার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে এক হাজার বাংলাদেশি কর্মী হাজতে আছেন। তার মধ্যে ৫৬ জন খুনের আসামি, ১৪ জন ফাঁসির আসামি। ফলে এসব ব্যাপারগুলো আমাদের সামনে চলে আসে। তাদের ইনটেরিওর বা হোম মিনিস্ট্রি বিষয়গুলোকে আমাদের পক্ষে কখনো নেয় না। যে কারণে জেনারেল এমওইউটা সমগ্র দেশের জন্য বাজার খুলে দেওয়া সেটার জন্য কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা যদি প্রথমে ছোটো বিষয়গুলো সমাধান করতে পারি। তাহলে বড়োটার দ্বার আস্তে আস্তে খুলবে। সচিব বলেন, হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড এমিরাটাইজেশন মন্ত্রণালয়ের অধীন কাজগুলে শুরু করলে আস্তে আস্তে লেবার মার্কেট বড়োটা খুলে দেওয়ার আশ্বাস আমাদের দিয়েছেন। তবে যেটা কথা আমাদের শুনতে হয়েছে যে, যেকোনো ক্ষেত্রেই ১৯ ক্যাটাগরিতে গৃহকর্মী পাঠাই না কেন, আমরা শৃঙ্খলায় না থাকলে আমাদের জন্য সমস্যা থেকেই যাবে।

কোন প্রক্রিয়ায়, কীভাবে এবং কত টাকায় কর্মী যাবে আমিরাতে এমন প্রশ্নের জবাবে ড. নমিতা হালদার বলেন, আমিরাতের মন্ত্রী আমাদের বলেছেন অতীতে যেহেতু অনেক বিশৃঙ্খলা হয়েছে এ কারণে তারা ৫শ রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি বাতিল করে একটি মাত্র এক্সিকিউটিভ অর্ডারে তারা বন্ধ করেছে। শুধু তাদবীর সেন্টারের মাধ্যমে তারা লোক নেবে। এ নিয়ে আমরা উভয় দেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করবো। জয়েন্ট কমিটি ঠিক করবে কীভাবে, কত খরচে লোক যাবে। আমরা আশা করছি আগামী তিন মাসের মধ্যে এই ১৯ ক্যাটাগরিতে কর্মী পাঠাতে পারবো। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মানবসম্পদ ও এমিরাটাইজেশন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘তাদবীর সেন্টার’ অর্থাৎ ‘ম্যানেজমেন্ট সেন্টার’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ করা হবে। ‘তাদবির সেন্টার’টি আমিরাত সরকারের মানবসম্পদ ও এমিরাটাইজেশন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে সরাসরি কাজ করবে।

এ কাজে ওই দেশের অন্য কোনো রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির কোনো ভূমিকা থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, যারা বিদেশে যাবেন, তাদের প্রতি আহ্বান হলো আপনারা এখনই কারো সাথে যোগাযোগ করবেন না। কারণ সরকার এখন পর্যন্ত কাউকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেয়নি। যখন ডিমান্ড লেটার পাবো তখন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে লোক নিয়োগ করবো। আমরা দুবাইতে বসেই খবর পেয়েছি অনেকেই ইতোমধ্যে টাকা পয়সা লেনদেন শুরু করে দিয়েছেন। কোনো টাকা পয়সার কারবার চলবে না। যারা নেবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন:- দেশ-বিদেশে নারী শ্রমিকরা যৌন হেনস্তার শিকার<

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত