চট্টগ্রাম থেকে নারী শ্রমিকের বিদেশ যাত্রা বেড়েছে

এএইচএম কাউছার | ১৮:২৪, জানুয়ারি ১০, ২০১৭

বিদেশ যাওয়ার জন্য চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের নারী কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন জেসমিন। পরিবার ও আত্মীয় স্বজন রেখেই তিনি নিজ ইচ্ছায় বিদেশ যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতেই নাকি বিদেশ যেতে চাচ্ছেন জেসমিন।

তিনি বলেন ওমানে তাঁর ভাই যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের ছোট বোনের একজন গৃহকর্মী প্রয়োজন। ২০ হাজার টাকা বেতন দেবে। এত টাকা তো দেশে পাব না। সে কারণে সাহস করে সন্তানদের মায়ের কাছে রেখে বিদেশে যাচ্ছি। জেসমিনের মত বিদেশ যাওয়ার জন্য অনেক নারী সংসারী হওয়ার চেয়ে আর্থিকভাবে আত্মনিভরশীল হওয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছে।

চট্টগ্রাম জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর থেকে চট্টগ্রাম থেকে নারী জনশক্তি রপ্তানি দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা থেকে ২ হাজার ৩০১ জন নারী কাজের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওমান, কাতার, ও সৌদি আরবসহ বিদেশে গেছেন। ২০১৫ সালে গেছেন ১ হাজার ৪১১ জন নারী। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮৭৬ জন, ২০১৩ সালে গেছেন ৪২০ জন, ২০১২ সালে ২৮৯ জন এবং ২০১১ সালে ১২২ জন।

ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারী জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা জেলা। শীর্ষ পাঁচ জেলার মধ্যে আরও রয়েছে মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী। গত এক দশকে (২০০৫-২০১৫) ঢাকা জেলা থেকে বিদেশ যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি।

একই সময়ে চট্টগ্রাম থেকে গেছেন প্রায় চার হাজার নারী শ্রমিক। ২০১৫ সালে সারাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার ৭১৮। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে গেছেন ১ হাজার ৪১১ জন নারী শ্রমিক। গত বছর রপ্তানি হওয়া নারী জনশক্তির মাত্র ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ গেছে চট্টগ্রাম থেকে।

এর আগের বছর এই হার ছিল ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, ২০১৩ সালে ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ। বাংলাদেশ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বিদেশে নারী জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে ৬৪ জেলার মধ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান ২৭তম। বিপরীতে পুরুষ জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম জেলার অবস্থান দ্বিতীয়। ২০১৫ সালে রপ্তানি হওয়া মোট জনশক্তির প্রায় ৬ শতাংশ গেছে চট্টগ্রাম জেলা থেকে। গত বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮১।

এর মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৭১৮। গত বছর রপ্তানি হওয়া মোট শ্রমিকের মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১৮ শতাংশের বেশি। চট্টগ্রাম থেকে নারী শ্রমিকের বিদেশ যাওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধিকে ইতিবাচক উল্লেখ করে চট্টগ্রাম জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, বিদেশে নারীদের কাজ করার বিষয়ে যেসব নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, সেগুলো কাটানোর জন্য সরকার ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। নারীদের বিভিন্ন কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সঙ্গে অনেক উন্নয়ন সংস্থাও সহযোগিতা করছে। এর ফলে চট্টগ্রাম থেকে নারী জনশক্তি রপ্তানি ধীরে ধীরে বাড়ছে।

গত বছর সৌদি আরবে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার পর ৫৮ হাজারের বেশি শ্রমিক সে দেশে গেছেন। এর মধ্যে নারী শ্রমিক প্রায় ২১ হাজার। তবে গত বছর চট্টগ্রাম থেকে সবচেয়ে বেশি নারী শ্রমিক গেছেন মধ্যাচ্যের দেশ ওমানে। সংখ্যাটি ৭৪৪ জন। দুবাইয়ে গেছেন ৩৮৫ জন। সৌদি আরবে গেছেন ৬৭২ জন।

এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে নারীরা লেবানন, জর্ডান, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও গেছেন। মূলত গৃহকর্মী ও শিশু দেখভালের কাজ করার জন্যই তাঁরা বিদেশে গেছেন। এসব নারীর সংখ্যা খুব বেশি না হলেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে নারীদের বিদেশ যাওয়ার হার ক্রমেই বাড়ছে। আর এই মানসিকতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জনশক্তি রপ্তানিকারক ও অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রামের আনোয়ারা, চন্দনাইশ ও রাংগুনিয়া উপজেলা নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কাজ করছে উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস।

কারিতাসের সেফ মাইগ্রেশন প্রকল্পের দায়িত্ব কর্মকর্তা শ্যামল মজুমদার বলেন, এই অঞ্চল থেকে পুরুষেরা বিদেশে যেতে যতটা আগ্রহী, নারীরা তার বিপরীত। এর মূল কারণ, রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বেশির ভাগও নারীদের বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। এটি কাটাতে পারলে এই অঞ্চলের নারীদের বিদেশযাত্রা অনেক বাড়বে। সম্প্রতি সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন ফটিকছড়ি জেলার খালেদা আকতার।

তিনি বলেন, অনেকেই সৌদি আরব যেতে নিষেধ করছেন। কিন্তু শুনেছি, অনেক মেয়ে এখন কাজ করতে সেখানে যাচ্ছে। নিজে গিয়ে কয়েক মাস পর ছোট ভাইকেও নিয়ে যাব। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে নারী কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বর্তমানে ৪০ জন নারী এক মাসের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। গৃহকাজে ব্যবহৃত নানা ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়াও ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। এই কেন্দ্রের অধ্যক্ষ বি এম শরিফুল ইসলাম বলেন, এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছুটা দক্ষতা অর্জন করার সুযোগ পাচ্ছেন বিদেশ যেতে ইচ্ছুক নারীরা।

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon