শিরোনাম

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর বিস্ময়কর সাফল্য

শেকৃবি প্রতিনিধি, মো. মমিন সরকার  |  ১০:৪৪, জুন ২৮, ২০১৯

আমরা বিভিন্নভাবে খাবার অপচয় করি। অনেক সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার ফেলে দেই। বিদেশে অনেক বেশি পরিমাণে খাবার অপচয় হয়ে থাকে। এই ফেলে দেয়া খাবার, খাবারের উচ্ছিষ্টকে কাজে লাগিয়ে পোষা প্রাণীদের পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এক বিশেষ খাবার (পেট ফুড) তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশী তরুণ বিজ্ঞানী ড. মো. শফিকুজ্জামান সিদ্দিকী। অপচয়কৃত খাদ্যকে কাজে লাগাতে তার গবেষণা পরিচালনা করেছেন মালয়েশিয়ার কোটা কিনাবালু জেলখানায়।

ফেলে দেয়া খাদ্যকে পুণ:ব্যবহারের কৌশল উদ্ভাবনের জন্য মালয়েশিয়াতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইনোভেশন, ইনভেশন এবং প্রযুক্তি প্রদর্শনী (ইনটেক্স) -২০১৯ অনুষ্ঠানে স্বর্ণপদক লাভ করেন ড. মো. শফিকুজ্জামান সিদ্দিকী। খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ থেকে ট্রাইকো-বায়োফাঞ্জিসাইড (ছত্রাকনাশক) উদ্ভাবনের জন্য পেয়েছেন ব্রোঞ্জ পদক।

বর্তমানে ড. মো. শফিকুজ্জামান সিদ্দিকী মালয়েশিয়ার সাবাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। মাত্র ৫ সেকেন্ডে দুধ, দুগ্ধজাত ও খাদ্যে ফরমালিন এবং ৩০ সেকেন্ডে মেলামিন শণাক্ত করার ডিভাইস আবিষ্কার করে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তৈরি করেছিলেন এই তরুণ বিজ্ঞানী। বর্তমানে তিনি বায়ো ও কেমো সেন্সরস, সেকেন্ডারি মেটাবোলাইটস, বায়োফার্টিলাইজার এবং ছত্রাকের জীব বৈচিত্র নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

ড. শফিকুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, মালয়েশিয়াতে একজন ব্যাক্তি প্রতিদিন ১.৬৫ কেজি খাবার নষ্ট করে থাকে। সে হিসাবে এখানে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে খাবার নষ্ট হয়। সাধারণত খাবারের উচ্ছিষ্ট জৈব সার তৈরি করা হয়, পুনরায় খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয় না।

আমি পুনরায় খাবার তৈরি করতে মালয়েশিয়ার জেলখানা থেকে ৭০০-৮০০ কেজি ফেলে দেয়া নষ্ট খাবার সংগ্রহ করি এবং প্রসেসিং করে ৫০০-৬০০ কেজি পেট ফুড তৈরি কতে সক্ষম হই। জৈব সারের তুলনায় পেট ফুডের চাহিদা বেশি এবং তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করা যাবে।

এছাড়া ড. মো. শফিকুজ্জামান সিদ্দিকী উদ্ভাবন করেছেন বিশেষ গুণ সমাপন্ন হারবাল টি (চা) এবং হারবাল সোপ (সাবান)। ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান বহনকারী ভেষজ উদ্ভিদ সোরশোপের পাতা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে হারবাল টি।

এই হারবাল চা-ক্যান্সার প্রতিরোধী, হজম, মাথা ব্যথা, আলসার হ্রাস করে , রক্তচাপ কমানো, রাতে ভালো ঘুমসহ ১৪ টি ভেষজ গুণ রয়েছে এই হারবাল টিতে। হারবাল সাবান ব্যবহারে কালো দাগ , চর্মরোগ দূর হবে, নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করবে, ত্বকের রুক্ষতা দূর করবে এবং বাড়াবে উজ্জ্বলতা।

মো. শফিকুজ্জামান সিদ্দিকী পাবনার সাঁথিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে নাড়িয়া গদাই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৯৩ সালে এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০০১ সালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাত্তক শেষে মালয়েশিয়া যান মাস্টার্স করতে। মালয়েশিয়ার পুত্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে মলিকিউলার বায়োলজিতে মাস্টার্স এবং ২০১০ সালে বায়োইলেকট্রোকেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই অসম্ভব মেধাবী শফিকুজ্জামান। এর স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে বর্ষসেরা স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী হিসেবে বেস্ট পোস্ট গ্রাজুয়েট অ্যাওয়ার্ড পান। ঐ বছর সিনিয়র প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০১২ ও ২০১৩ সালে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সেবা পুররস্কার পান তিনি।

টেকসই কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখায় ২০১৪ সালে জাপানের টোকিও থেকে প্রোসপার-ডট নেট স্কোপাস ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড পুরস্কারে ভূষিত হন ড. সিদ্দিকী। ফরমালিন শনাক্তকরণের উদ্ভাবক হিসেবে ২০১৫ সালে পান বেস্ট ইন্টাপ্রিনিউরিয়াল প্রজেক্ট অ্যাওয়ার্ড এবং ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অ্যান্ড এক্সপোজিশন অন ইনভেনশন অনুষ্ঠানে স্বর্ণপদক লাভ করেন।

এ পর্যন্ত তার ৭০টি গবেষণাপত্র প্রকাশ হয়েছে। বের হয়েছে ৬টি বই, ১৭ টি বই এ তার গবেষণা অধ্যায় হিসেবে সংযুক্ত হয়েছে। শিক্ষকতার মাত্র ৯ বছরে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পেয়েছেন ৫৪ টি গবেষণা পুরস্কার (স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ )। উদ্ভাবন করেছেন ১০টি পণ্য।

এছাড়া ৪ টি আবিস্কার স্বত্ব (প্যাটেন্ট), ৪ টি ট্রেড মার্ক এবং এখনো ১০ টি গবেষণা ও বেশ কিছু প্রকাশনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো-হালাল প্রজেক্ট, যেখানে জানা যাবে খাবার এবং হালাল মাংসে শুকর বা শুকর জাতীয় মাংস মিশ্রিত আছে কিনা।

এছাড়া বরনিও ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বায়োটেকনোলজি’র প্রধান ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, জার্নাল সিলেকশন লাইফ সায়েন্স সাইটেশন ইনডেক্স এর উপদেষ্টা, বায়োসেন্সর গ্রুপের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন ড. সিদ্দিকী ।

সফলতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. মো. শফিকুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, আমি সময়কে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমানেকে বেশি প্রাধান্য দেই। আজকের দিনটাকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করি। পরিশ্রম ও সময় আমার সফলতার চাবিকাঠি। গবেষণার ক্ষেত্রে মানবতার সেবাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ড. সিদ্দিকী বলেন, দিনের কাজ দিনে করতে হবে। আজকের কাজ কাল করব -এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিকভাবে সময়কে কাজে লাগাতে পারলে সফলতা আসবেই।

এমএআই

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত