শিরোনাম

বিএনপিতে খালেদা জিয়া মহাজোটে একাধিক প্রার্থী

প্রিন্ট সংস্করণ॥শেহাব উদ্দিন আহম্মদ লিটন, ফেনী  |  ১৬:১৩, এপ্রিল ১৬, ২০১৮

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ আসনে প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপি, জাসদ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়নে নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। বড়ো দুই দল ছাড়াও অন্যসব দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মাঠে সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এসব মনোনয়ন প্রত্যাশীর পদচারণার ঢেউ নির্বাচনি এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও লেগেছে। ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত ফেনী-১ (ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া) নির্বাচনি আসনে ইতোপূর্বে আ.লীগের কোনো এমপি নির্বাচিত না হলেও স্থানীয়ভাবে সাংগঠনিক ভিত্তি বেশ মজবুত। ইউপি নির্বাচনে মেম্বার থেকে শুরু করে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র এবং সর্বশেষ জেলা পরিষদ সদস্য সবাই আ.লীগ থেকে নির্বাচিত। নির্বাচনি এলাকায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তৎপর রয়েছেন। তারা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে সরব রয়েছেন।

বিএনপি :
এ নির্বাচনি আসনের ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার পৈতৃক বাড়ি। তিনি এ আসন থেকে ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০১ ও সর্বশেষ ২০০৮ সালে মোট চারবার এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে খালেদা জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী আ.লীগ প্রার্থী ফয়েজ চেয়ারম্যানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। খালেদা জিয়ার ১ লাখ বিশ হাজার ভোটের বিপরীতে ফয়েজ চেয়ারম্যান পান ৬৮ হাজার ভোট। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে এ আসনে নিশ্চিতভাবেই এমপি পদে প্রার্থী হবেন খালেদা জিয়া। এদিকে খালেদা জিয়া এমপি হওয়ার পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন ছাড়াও দলের সভানেত্রী হিসেবে থাকার কারণে নির্বাচনি এলাকা অভিভাবকশূন্য হয়ে যায়। এতসব দায়িত্ব পালন করে তিনি নির্বাচনি এলাকায় সময় দিতে পারেন না। এই এলাকার মানুষ গত ১৫ বছর ধরে তাকে দেখতে পায়নি। এতে সাধারণ মানুষের মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। শুধু এমপি নির্বাচিত হতেই খালেদা ফেনীর মেয়ে বলে পরিচয় দেয় এমন অভিযোগ ভোটারদের। এতে তিনি ফেনী-১ আসনে প্রার্থী হলেও আ.লীগের শক্ত প্রার্থী মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হওয়া কষ্টকর হবে। খালেদা জিয়ার এ আসনে বর্তমানে দলের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন কমিটি ঝিমিয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে কোনো সম্মেলন ছাড়া মনগড়া কমিটি দিয়ে চলছে রাজনীতি। ফলে কেন্দ্র ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাকর্মী খুঁজে পাওয়া যায় না। গত উপজেলা, পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনে বিএনপির কোনো প্রার্থী আ.লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন করে না। ফলে এসব এলাকার জনপ্রতিনিধিরা আ.লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা স্থানীয় নেতৃত্বের দুর্বলতার সুযোগে রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন। আবার মামলা-হামলায় কোনো নেতাকে কাছে না পেয়ে তৃণমূল ঝুঁকছে আ.লীগের দিকে। এতে বিএনপির সাংগঠনিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেয়েছে। তৃণমূল সংগঠনে কোন্দল চরম পর্যায়ে রয়েছে। পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া বিএনপি নেতাদের একে অপরকে ঘায়েল করতে ব্যস্ত। এক নেতা এক পদ এমন একটি ঘোষণা দেওয়া হলেও নেতাদের অনেকে একাধিক পদে রয়েছেন।ত্যাগী কর্মীরা জেল খেটে মামলায় জর্জরিত হলেও তাদের খবর কেউ রাখে না। স্থানীয় সংগঠনে চলছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। কয়েক মাস আগে কমিটি পুনর্গঠন কাজ শুরু হলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। সবমিলিয়ে বিশৃঙ্খল বিএনপি খালেদা জিয়াকে প্রার্থী হিসেবে নিয়ে সুশৃঙ্খল আ.লীগের সামনে কতটুকু দাঁড়াতে পারবে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। তৃণমূল বিএনপির এমন করুণ পরিণতিতে রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আ.লীগের শক্ত প্রার্থী দিলে এ আসনে নিশ্চিত পরাজিত হবেন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন ভিপি বলেন, আগামী নির্বাচনে নেত্রী এ আসন থেকে প্রার্থী হবেন। পৈতৃক বাড়ি হওয়ায় এ আসনের প্রতি নেত্রীর বাড়তি দুর্বলতা রয়েছে। এ আসনে খালেদা জিয়া বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আ.লীগ :
ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলা ও পৌরসভা নিয়ে গঠিত ফেনী-১ আসনে ১৯৯০ থেকে ২০১৪, দীর্ঘ চব্বিশ বছরেও আওয়ামী লীগ থেকে কোনো প্রার্থী জয়লাভ করেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এর বত্যয় ঘটে জাসদ নেত্রী শিরিন আক্তারের হাত ধরে। বেগম খালেদা জিয়ার আসনে মহাজোট প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হয়ে আলোচিত হন তিনি।শ্রমিক নেত্রী হিসেবে জাতীয় পরিচিতি এবং সর্বশেষ কাউন্সিলে জাসদ একাংশের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় তাকে স্থানীয়ভাবেও শক্তিশালী করেছে। এমপি হওয়ার পর সংসদীয় আসনে নিয়মিত জনসংযোগ ও যাওয়ার-আসার মাধ্যমে জাসদের সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্গঠনেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। এ সময় তার নেতৃত্বে ৭ জন ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছে জাসদ থেকে।আগামী নির্বাচনে এ আসনে তিনি ‘হেভি ওয়েট’ প্রার্থী হিসেবেই আবির্ভূত হবেন বলে মনে করে তার দল। মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে আগামী নির্বাচনেও এ আসনটি জাসদ পাবার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। বেগম খালেদা জিয়ার ভিটেমাটি বলে খ্যাত এ আসনের আ.লীগের ঘাঁটিতে পরিণত করার অন্যতম দাবিদার সাবেক আমলা ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী নাসিম।স্থানীয় রাজনীতিতে অন্তরালের কারিগর হিসেবে পরিচিত নাসিম প্রার্থী দৌড়ে এগিয়ে থাকার জন্য স্থানীয় উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী পরিবারের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত আলাউদ্দীন নাসিম এ আসনে আ.লীগ থেকে মনোনয়ন চাইলে অন্য কেউ প্রার্থী হবেন না বলেও জানা গেছে। আলাউদ্দীন নাসিমের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, এমপি নির্বাচনে এখনো পর্যন্ত প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই।এছাড়া আ.লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন ফুলগাজী উপজেলার চকবস্তা গ্রামের স্বনামধন্য মুসলিম পরিবারের সন্তান শেখ আবদুল্লাহ। অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেলস এজেন্সিজ বাংলাদেশ আটাব-এর পরপর দুবার মহাসচিবের দায়িত্ব সফলতার সাথে সম্পণ্ন করেন শেখ আবদুল্লাহ। এরই ধারাবাহিকতায় হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ হাব-এর সফল মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন দুবার। একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে শেখ আবদুল্লাহ জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংশিত হন। বর্তমানে তিনি ঢাকাসহ ফেনীবাসীর ঐতিহ্যবাহী সংগঠক ফেনী সমিতি ঢাকার সাধারণ সম্পাদকের চলতি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঢাকাসহ ফুলগাজী সমিতির ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। একজন নরম প্রকৃতির কোমল হৃদয়বান মানুষ শেখ আবদুল্লাহ। তিনি কর্মীবান্ধব ব্যক্তি হিসেবে নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়। জাতীয় ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকা-ে জড়িত থাকার কারণে এলাকার জনগণের কাছে বেশ আস্থাভাজন। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি দানশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। মানুষকে সহযোগিতার ব্যাপারে তিনি সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে এবারের ফুলগাজী-পরশুরামে বন্যায় তিনি এককভাবে নিজ অর্থায়নে হাজার হাজার দুর্গত মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দীন চৌধুরী নাসিমের প্রতি সদা আস্থাশীল শেখ আবদুল্লাহ ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী এমপির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ আসন থেকে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী শেখ আবদুল্লাহ। তবে আলাউদ্দিন নাছিম প্রার্থী হলে তিনি মনোনয়ন চাইবেন না। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে দলের বিজয়ের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে তিনি কাজ করে যাবেন। এদিকে ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও আ.লীগ সাধারণ সম্পাদক মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল বলেন, আমাদের কাজ হচ্ছে জননেত্রী শেখ হাসিনার নৌকা মার্কাকে বিজয়ী করা। আমরা সে লক্ষ্যেকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে দিনরাত সাংঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এ আসনে আ.লীগ থেকে প্রার্থীর কোনো বিকল্প নেই। আমরা আলাউদ্দীন নাছিম চৌধুরী ও জননেতা নিজাম উদ্দিন হাজারী নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ও সু-সংগঠিত। তিনি বলেন, এ আসনে মহাজোট থেকে কোনো প্রার্থী আমাদের দরকার নেই। কারণ আমরা গত দশম জাতীয় নির্বাচনে আ.লীগ থেকে মনোনিত প্রার্থী খায়রুল বাশার তপন ভাইকে ছেড়ে দিয়ে নেত্রীর সিদ্ধান্তে মহজোটের প্রার্থী শিরিন আক্তারকে নির্বাচিত করেছি। আমরা আ.লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষকলীগ, শ্রমিকলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিভিন্নভাবে তাকে বিজয়ী করি। কিন্তু আমাদের স্বপ্নের মাঝে যেন গুড়েবালি এসে পড়েছে। সে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর আমাদের ৩ উপজেলার আ.লীগের সব নেতাকর্মীর সাথে কোনো যোগাযোগ না রেখে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি সে কেবল বিএনপি-জামাত থেকে লোক নিয়ে তার সংগঠন ভারী করছে। এজন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। তারা চায় আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে আ.লীগ থেকে প্রার্থী দেওয়া হোক। সোহেল বলেন, আগামীতে ফেনী-১ আসনে বেগম খালেদা জিয়াকে পরাজিত করে আ.লীগের বিজয় সুনিশ্চিত করতে হলে দলের প্রার্থীর বিকল্প নেই। আলাউদ্দীন আহমেদ চৌধুরী নাসিম ও খায়রুল বাশার তপন নির্বাচনে না এলে তিনি প্রার্থী হবেন বলে জানান। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় আমি নির্বাচন করবো। দল থেকে যাকে মনোনিত করবে ওই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবো।

জাপা :
বর্তমানে এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে দলীয় প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা নাজমা আক্তারকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে নাজমা এ আসনে নির্বাচন করবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জামায়াত :
বিএনপির অন্যতম শরীক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ফেনীর ৩টি আসনের অন্তত ১টি আসনে প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে। ফেনী জেলা জামায়াতের আমীর একেএম সামছুদ্দিন এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত