শিরোনাম

বিএনপির দুর্গে আঘাত হানাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য

আলী হোসেন॥প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১১:৩৯, আগস্ট ০২, ২০১৭

লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনটি বিএনপির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত। তাই আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দুর্গ ভেঙে ভোটের লড়াইয়ে আসনটি ধরে রাখতে কাজ করছে আওয়ামী লীগ। বিগত ৫ই জানুয়ারীর (২০১৪) নির্বাচনে এ আসন থেকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী একেএম শাহজাহান কামাল।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ এর ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত আসনটি বিএনপির দখলেই ছিল। আগামী নির্বাচনে বিএনপি তাদের ‘দুর্গ’ পুনরুদ্ধার এবং আসনটি ধরে রাখতে রাজনৈতিক মিত্রদের সাথে নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দলের বেশিরভাগ নেতা-কর্মী নিজ এলাকায় অবস্থান করতে না পারায় বিএনপি এখনও মাঠে পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারেনি।

অন্যদিকে, বিগত নির্বাচনে বিজয়ের ধারাবাহিকতায় আগামী নির্বাচনেও আসনটিকে নিজেদের দখলে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। এ কারণে ক্ষমতাসীন দলটি নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছে আগেভাগেই। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয়কর্মসূচিতে সরব অংশগ্রহণসহ পৃথক পৃথকভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

লক্ষ্মীপুর-৩ আসনটি একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ২০০৮ এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ১ লাখ ৭ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী শিল্পপতি এম এ হাসেম পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫শ’ ভোট। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী প্রায় ২৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন।

২০০১ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মরহুম এ্যাড. কাজী ইকবাল হোসেন ভোট পান ৪২ হাজার। ৫ বছরের ব্যবধানে ২০০৮ এর নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান প্রায় অর্ধেক বৃদ্ধি পায়। অবশ্য ভোটাররা জানিয়েছেন, এখানে এম এ হাসেমের মরহুম পিতা ইব্রাহিম মিয়া আজিজ কোম্পানী এবং তাদের পারিবারিক ইমেজের কারণে অনেক সাধারণ ভোটার নৌকায় ভোট দেন। তারা বলেন, এ আসনে জামায়াত পৃথক ভোট করলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোট প্রায় সমান সমান।

এ দিকে নির্বাচনের এখনও প্রায় দেড়বছর বাকি থাকতেই অধিকাংশ সম্ভাব্য প্রার্থী সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিংয়ের পাশাপাশি ব্যানার-পোস্টার-বিলবোর্ডের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন। কেউ কেউ উঠান বৈঠকসহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ এবং এলাকার সামাজিক কর্মকান্ডে সরব অংশগ্রহণ করছেন।
আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন, বর্তমান এমপি একেএম শাহজাহান কামাল, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মিয়া গোলাম ফারুক পিংকু, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র আবু তাহের, সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি এম এ হাসেম এবং ঢাকা মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সমাজসেবক অধ্যক্ষ এম এ সাত্তার।

এদিকে, আওয়ামী লীগে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা পাঁচের বিপরীতে বিএনপিতে প্রার্থী মাত্র দুইজন। তারা হলেন, সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সাবেক মেয়র সাহাবুদ্দিন সাবু।

এ্যানি চৌধুরী কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। এরপর তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এবং বর্তমানে প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন ও আন্দোলন সংগ্রামে বিএনপিতে সব সময় সক্রিয় এই নেতা নিজ এলাকায়ও বেশ জনপ্রিয়। নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রার্থী হিসেবে প্রথম পছন্দ শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তৃণমূল কর্মীরা তাঁকে এ্যানি ভাই হিসেবেই সম্বোধন করেন।

আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী বর্তমান সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামাল আমার সংবাদকে বলেন, ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে তিনি এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। তিনি আগেও মানুষের পাশে ছিলেন, আগামীতেও থাকবেন। এ কারণে তিনি আবারও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। আর দলীয় মনোনয়ন পেলে আসনটি দলকে উপহার দিতে পারবেন বলে তাঁর বিশ্বাস।

আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা মনে করেন, দল ক্ষমতায় আসার পর লক্ষ্মীপুরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আগের তুলনায় রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোগত ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। নৌবন্দর স্থাপনসহ চলমান রয়েছে আরও বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্প। এগুলো আগামী নির্বাচনে দলের জন্য অনেকটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে দলের অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের মধ্যে বিশৃঙ্খলা আগামী নির্বাচনে কিছুটা হলেও দলের প্রার্থীকে বিপাকে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন নেতা-কর্মীরা।

গোলাম ফারুক পিংকু বলেন, তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর থেকে দল অনেক সুসংগঠিত হয়েছে। ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লক্ষ্মীপুর সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্যদিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চাঙ্গা হয়েছে। আর তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর জেলার ৪৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪৭টিতেই দলীয় প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এটি দলের জন্য জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির লক্ষণ।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আবু তাহের বলেন, দলের মধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব না থাকলেও দলীয় নেতা-কর্মীদের সুখে-দুঃখে তিনিই পাশে থাকেন। লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের উন্নয়ন কাজ দেখতে গিয়ে দুর্ঘটনায় অসুস্থ্য হলেও পৌরবাসী ও দলের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তাই লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলে আসনটি নেত্রীকে উপহার দিয়ে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।

শিল্পপতি এম এ হাসেম বলেন, চন্দ্রগঞ্জ থানা বাস্তবায়নসহ চন্দ্রগঞ্জবাসীর চিকিৎসায় হাসপাতাল, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত এবং রাস্তাঘাটের উন্নয়নে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি জয়লাভের ব্যাপারে আশাবাদী। আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী অধ্যক্ষ এম এ সাত্তার বলেন, বেকারত্ব দূরীকরণ ও যুবসমাজকে কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করতে তিনি লক্ষ্মীপুরে চালু করেছেন শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এছাড়া এতিমখানা, উপাসনালয় ও সমাজের অসহায় মানুষকে নিয়মিত সাহায্য প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। দল থেকে সদর আসনে মনোনয়ন পেলে তিনি জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনকে সম্মেলনের মাধ্যমে আরও সক্রিয় করতে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হামলা-মামলা মোকাবেলা করে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির সঙ্গে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। তার বিরুদ্ধে এখনও ৬০/৭০টি মামলা রয়েছে। এরপরও মাঠে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি নেতাকর্মীদের সাথে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি বলেন, সারাদেশে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট হলে বিএনপি ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবে এবং সরকার গঠন করবে।

বিএনপির অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী সাহাবুদ্দিন সাবু বলেন, লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সব সময় মাঠে ছিলেন। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং তাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েও কর্মী-সমর্থকদের পাশে ছিলেন। সদর আসনে আগামী নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক পেলে নির্বাচন করবেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত