বিএনপিকে বিকল্প মনে করছে না জনগণ

প্রিন্ট সংস্করণ॥আফছার আহমদ রূপক | ১১:৪৭, জানুয়ারি ০৯, ২০১৭

জাতীয় নির্বাচন ও নতুন ইসি নিয়ে বিএনপি নানা কর্মসূচি দিচ্ছে এবং দলের নেতারা আওয়ামী লীগ সরকারকে মন্দ বলে জনগণের কাছে প্রমাণ করা চেষ্টা করে করছে। লক্ষ্য-আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়া। কিন্তু বিএনপির এই আশা পূরণ হচ্ছে না। প্রতিটি আন্দোলনই ফ্লপ হচ্ছে অথবা আওয়ামী লীগ করতে দিচ্ছে না এবং তাতে সফলও হচ্ছে।

এর অন্যতম কারণ দেশের জনগণ বিএনপিকে মন্দের ভালো কিংবা আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে উপযুক্ত মনে করছে না। তারা মনে করছে মন্দ বলে আওয়ামী লীগকে বর্জন করে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনে জনগণের লাভ কী? যেই লাউ, সেই কদু। বরং আওয়ামী লীগ যেভাবে চলছে চলুক। ৫ বছর ক্ষমতা শেষ করুক। জাতীয় নির্বাচন আসুক। তখন দেখা যাবে। তিন বছর গেছে আর দুই বছর যাক না। এই মনোভাব থেকেই বিএনপির কর্মসূচির দিন জনগণ রাজপথে অন্যদিনের মতো স্বাভাবিকভাবেই ঘর থেকে বেরুচ্ছে। রাস্তায় চলছে যানবাহন। অফিস-আদালতের কাজকর্মও স্বাভাবিক। বিএনপির আন্দোলনে সায় থাকলে এমনটি হতো না।

কিন্তু বিএনপিও নাছোড়বান্দা। জনগণ মানুক আর না মানুক, আন্দোলন সফল হোক বা না হোক একের পর এক কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আন্দোলনের ডাক দিয়ে ঘরে বসে থেকে রাজপথ ফাঁকা রাখছে। গতকালও এমন দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানীতে। বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচিতে নেতাকর্মীরা রাস্তায় নামেনি। ৫ জানুয়ারিকে ঘিরেই এ কর্মসূচি। ওইদিন আওয়ামী লীগের তিনবছর পূর্তিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস আখ্যায়িত করে ৫ জানুয়ারি কালো পতাকা মিছিল এবং ৭ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী সমাবেশের কর্মসূচি ছিল বিএনপির। কালো পতাকা মিছিলটিও ছিল ঢিলেঢালা। দুয়েক জায়গায় হাতেগোনা কয়েকজন নেতাকর্মী রাস্তায় নামলেও পুলিশ ও আওয়ামীলীগ কর্মীদের বাধার মুখে পড়ে মিছিলখানা প- হয়েছে আর সোহওয়ার্দীতে ৭ জানুয়ারির সমাবেশের তো অনুমতিই দেয়নি ঢাকা মহানগর পুলিশ। এই সমাবেশ করতে না দেওয়ার প্রতিবাদেই গতকাল সারাদেশে ছিল বিক্ষোভ মিছিল।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে টানা তিনমাস অবরোধ কর্মসূচি থেকে শুরু করে বিএনপির প্রায় প্রতিটি আন্দোলন-কর্মসূচিই ফ্লপ হচ্ছে। যখনই আওয়ামী লীগ ও পুলিশের বাধার মুখে পড়ছে তখনই কর্মসূচি স্থগিত করছে বা পিছু হটছে। কখনো নিজেরা মাঠে নামছে না, কখনো অসহায়ের মতো জনগণের কাছে বিচার দিচ্ছে। বলছে জনগণই বিচার করবে। জনগণের কাঁধে এরকম বিচারের ভার দিতে সর্বশেষ দেখা গেছে কয়েকদিন আগে।

বিএনপির অঙ্গ সংগঠন কৃষকদলের ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশররফ হোসেন বলেন, ৫ জানুয়ারি বিএনপির কালো পতাকা মিছিলে বাধা দিলে এর বিচার করবে জনগণই। এর দুইদিন আগে আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছিলেন ৫ জানুয়ারি বিএনপিকে রাস্তায় নামতে দেবে না জনগণই। হানিফের এই বক্তব্যের প্রসঙ্গে প্রশ্নের উত্তরের মোশাররফের এই বিচারের ভার দেওয়া।

২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির এই দিনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত না হওয়ায় বিএনপি ও শরিক দলগুলো বর্জন করেছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথমবর্ষপূতিতে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি দেশ সহিংস আন্দোলনের মুখে পড়েছিল। ওইদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি সমাবেশ করতে না পেরে টানা তিনমাস অবরোধ চালিয়ে যায়। পেট্রলবোমাসহ বিভিন্ন সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয় এবং আহত হয়েছিল অনেকেই। অবরোধকালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দিনকাটে গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে। অবশেষে পুরো আন্দোলনই ফ্লপ হয়। তখনও বিএনপি জনগণের ওপর ভরসা করেছিল তাদের অবরোধে শামিল হবে বলে।

কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি দেখা দিয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকা কর্মসূচির পরিসমাপ্তি ঘটে নীরবেই। এবারও ৫ জানুয়ারি সরকারের তৃতীয় বর্ষপূতিকে ব্যাহত করতে আবারো জনগণের দিকেই তীর্তের কাকের মতো তাকিয়ে ছিল বিএনপি। জনসমর্থন পেলে নেতাকর্মীরা চাঙা হবে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন তৈরি হবে-এই আশায়। কিন্তু কিছুই হলো না। জনগণ জনগণের মতোই চলছে। তারা একটু শান্তি চায়, চায় উন্নয়ন ও ভালোভাবে খেয়েপরে বাঁচতে। আন্দোলন, সংঘাত তাদের ভালো লাগে না। শুধু জনগণই নয়, নীরব আছে সরকারি-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। এর অন্যতম কারণ আওয়ামী লীগের ব্যাপক উন্নয়ন ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিগুণ বেতন বৃদ্ধি।

২০০১ সালের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির ডাকা কর্মসূচিতে সরকারি আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেভাবে সমর্থন দিয়েছিল, এখন তার বিন্দুমাত্রও নেই। তখন বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন ড্যাবকেও দেখা যায় রাস্তায় নামতে। যদিও চিকিৎসকদের কাজ চিকিৎসাসেবা দেওয়া, রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করা নয়। এখন রাজপথে না নেমে ড্যাবের চিকিৎসকরা সঠিক কাজই হচ্ছে বলে মনে করছেন। আমার সংবাদকে ড্যাবের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক এই মনোভাব প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কাজ রাজপথে নামা, চিকিৎসকদের দায়িত্ব এটি নয়। রোগী ফেলে রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে চিকিৎসকদের যাওয়া ঠিক নয়। বড়জোর নৈতিক সমর্থন দিতে পারেন তারা।

আন্দোলনে জনসমর্থন নেই কেন-জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, জনসমর্থন নেই কথাটি ঠিক নয়। সারাদেশেই জনগণের কাছে বিএনপির সমর্থন সবথেকে বেশি। তাহলে আন্দোলনে জনগণ সম্পৃক্ত হচ্ছে না কেন-প্রশ্নের জবাবে জাহিদ বলেন, সরকারের দমন-পীড়নে বিএনপির নেতাকর্মীরাই যেখানে রাজপথে নামতে পারছে না, সেখানে জনগণ নামবে কী করে।

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা-কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো বেগবান আন্দোলনের শক্তি এই মুহূর্তে নেই বিএনপি ও শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর। আবার যেভাবে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা চলছে তাতে খুব শিগগিরই সংগঠিত হওয়াও সম্ভব নয়। এই অবস্থা বুঝে বিএনপি জামায়াতের নেতা-কর্মীরা শেষ পর্যন্ত নিচে বাঁচলে বাপের নাম নীতিতেই ঘরে বসে থাকবে, রাজপথে নামবে না।

কারণ দলীয় ক্যাডারগুলোর অনেকেই আত্মগোপনে। রাজপথ কাঁপানোর মতো নেতা-কর্মীদের বড় অভাব এই দলগুলোতে। তারেক রহমানের গ্রেফতারি পরোয়ানা, কিংবা দলের সিনিয়র নেতাদের কারামুক্তি ও মামলার প্রতিবাদে আয়োজিত বিগত মিছিলগুলোতে কর্মীদের কম উপস্থিতিই এর প্রমাণ। বিএনপির রাজনীতি অনেকটা জাতীয় প্রেসক্লাবও দলীয় কার্যালয় নয়াপল্টন নির্ভর হয়ে পড়েছে। আর সহায়ক শক্তি জামায়াতের কর্মসূচি তো চোখেই পড়ছে না। বাকি শরিকদলগুলোর আওয়াজ তো নেই বলেই মনে হচ্ছে।



 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon