শিরোনাম

জামায়াত নেতার ডাকে এক টেবিলে কামাল-খালেকুজ্জামানরা!

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ১৩:৫৪, মার্চ ২৫, ২০১৯

 

মানবিক-মানবতার ইস্যুকে কেন্দ্র করে এক মঞ্চে বসল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বিশিষ্টজনরা। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক এবং শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াত থেকে সদ্য বহিষ্কৃত জামায়াত নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জুর ডাকে সাড়া দিয়ে গতকাল এক টেবিলে বসেছেন গণফোরামের সভাপতি ও অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদ্বীন মালিক, গণস্বাস্থ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষক ড. সুকোমল বড়ুয়া, আইন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুলসহ বহু বিশিষ্টজনরা।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ও আহত মজলুম মানুষদের প্রতি শোক এবং সংহতি প্রকাশ করে বাংলাদেশের সর্বস্তরের বিবেকবান নাগরিক ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বিবেক, বিদ্ধেষ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে মানবিক সংহতি এ স্লোগানে এসব ব্যক্তি এক টেবিলে বসেন।

অনুষ্ঠান থেকে বিশিষ্টজনরা বলেন, রাষ্ট্র ও রাজনীতির মধ্যে ধর্ম আনা যাবে না। ধর্মীয় আক্রোশ, ঘৃণা-বিভাজনের রাজনীতি দিয়ে কোনো দেশ এগোতে পারে না। সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। তাই ঘৃণা, বিদ্বেষ, বিভাজনের রাজনীতি পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। বাংলাদেশেও আজ অনেক ক্ষেত্রে মানবতা হারিয়ে যাচ্ছে। তাই নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্নকে অনুসরণ করতেও অনেকে পরামর্শ দেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার জন্য হিংসা করা উচিত নয়। রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার করা যাবে না। মানুষের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা যায় না। এটা সারা দেশের মানুষ বিশ্বাস করে। বৈষম্য হলো নীতি, ঐতিহ্য ও ধর্মের পরিপন্থি। এ মূল্যবোধ জাগ্রত করেই এবারের স্বাধীনতা দিবস পালনের আহ্বান জানান তিনি।

ড. কামাল বলেন, স্বাধীনতার অর্জনগুলো ধরে রাখতে সমপ্রীতির মূল্যবোধকে ছড়িয়ে দিতে হবে, ধর্মের ভিত্তিতে ঐক্যকে বিনষ্ট করা সংবিধানসম্মত না, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মাঝে বৈষম্য সৃষ্টি করতে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংবিধানেও আছে ধর্মকে অপব্যবহার করা যাবে না। আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক এই নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সব ধর্মের সাথে সমপ্রীতি গড়ে তোলা। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই মানুষের সকল অধিকারকে রক্ষা করতে হবে। ধর্মের নামে বৈষম্য আমাদের দেশে নাই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, নিউজিল্যান্ডে নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করছি। তাদের শহীদি মর্যাদায় জান্নাত কামনা করছি। তিনি বলেন, নিউজিল্যান্ড আজ দৃষ্টান্ত হলো। তাদের ধর্মের নয়, অন্য ধর্মের লোককে মারার পর তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। মানবিক দৃষ্টান্ত থেকে তারা এ ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রের নির্দেশে রেডিও টিভিতে আজান প্রচার হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন হিজাব পরে এসেছে। জুমার নামাজে মুসল্লিদের পাহারা দেয়ার জন্য অনেকেই আসেন। এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ নজরুল ইসলাম আরো বলেন, আমাদের দেশেও অনেক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কাউকে লজ্জিত হতে দেখিনি। নিউজিল্যান্ডের ঘটনা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ধর্ম যখন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহূত হয়, তখনই তা মানবতাবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল বলেন, শুধু মানুষ মারা যাওয়ার সংখ্যা নিয়ে বলছি না। সেজদারত, নিরস্ত্র শান্তিপ্রিয় মানুষকে সেজদারত অবস্থায় বর্বরভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তার চেয়ে বড় বর্বরতা মনে হয়েছে যখন তা লাইভ ফেসবুকে প্রচার করা হয়েছে।

আসিফ নজরুল বলেন, নিউজিল্যান্ডের মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেভাবে মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সর্বোপরি নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন যেভাবে রিয়েক্ট করেছেন, মনে হয়েছে- সন্ত্রাসীর বাণীকে তারা ভালোবাসা ও মানবতার বাণী দিয়ে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করেছেন। আমি তো মনে করি পৃথিবীর অন্যান্য এলাকার মানুষের মতো আমাদের এ সভা থেকেও প্রস্তাব আসা উচিত যে, জেসিন্ডা আর্ডার্নকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হোক। সেটা তার জন্য একটা ছোট পাওনা হবে, কিন্তু পৃথিবীর অনেক মানুষের জন্য বড় দিকনির্দেশনা হবে। আসিফ নজরুল বলেন, ইসলাম ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়, যার ফলে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের এ হত্যাকাণ্ড। আমাদের কাছে দুঃখ লাগে যে, ইসলামফোবিয়া আমরা বাংলাদেশেও দেখতে পাই। কিছু মানুষের কাছে প্রগতি হচ্ছে ইসলামকে গালাগাল করা। এ ধরনের ধর্মের ওপর ফোবিয়া আমাদের বন্ধ করতে হবে।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমরা একটা বিপরীত জগতে বাস করছি। নিউজিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট বিশ্বব্যাপী মানবতাবাদির পরিচয় পাচ্ছেন। আর আমাদের... আমাদের রাষ্ট্র কিসের চর্চা করছে আমরা কি দেখছি না! তিনি বলেন, এ দেশে আজ মানবতা নেই, গাড়িতে চাপা দিয়ে মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে, ঘুম-খুনের কোনো বিচার নেই। মানুষ ভোট দিতে পারে না। তা হলে এ দেশে কি মানবতা আছে? নেই...

মান্না আরো বলেন, নিউজিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করেনি। এ জন্য তিনি মডেল। আর আমাদের দেশে এই ধর্মকে ব্যবহার করে ধর্ষণ করে অন্যের কাঁদে তুলে দেয়া হচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র ও রাজনীতির মধ্যে ধর্ম আনা যাবে না।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশে হলি আর্টিজানে জঙ্গির নামে কত মানুষ মেরেছে, আমরা দেখেছি। একজনকেও জীবিত ধরতে পারেনি। আর নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় দেখেছি জীবিত ধরেছে। বাংলাদেশে এভাবে মানুষ মারার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স আসতে হবে। তিনি আরো বলেন, নিউজিল্যান্ডে কোনো পোগ্রাম করতে অনুমতি লাগে না। পুলিশকে জানালেই হয়। আজ পুরো বাংলাদেশ আগুনের ওপর বসে আছে।

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে শান্তিপ্রিয় ও মানবতাবাদী। বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এ কথা মনে রেখেই তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে। জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু রাজনৈতিক দল ও জনগণ আলাদা সত্তা।

এ কথা মনে রেখেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অ-দলীয় অ-রাজনৈতিক, সামাজিক-নাগরিক-মানবিক এ উদ্যোগ। আমরা আন্তর্জাতিক সহাবস্থানের পক্ষে। বিশ্বের সব দেশের জন্য নিউজিল্যান্ডের অতিসমপ্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, অভিব্যক্তি ও কর্মপন্থা দিকনির্দেশনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, মাওলানা সাইয়েদ কামাল উদ্দিন জাফরী, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, সাবেক সচিব মোফাজ্জল করিম চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, প্রফেসর মেজর (অব.) ডা. আব্দুল ওহাব মিনার, মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, মোফাজ্জল করিম চৌধুরী, অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরীন মুন্নী, শ্রী বিজন কান্তি সরকার, ফরিদা আখতার, মাওলানা জাইনুল আবেদীন, মতিউর রহমান চৌধুরী, সাংবাদিক নেতা এম আব্দুল্লাহ প্রমুখ।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত