শিরোনাম

রাজধানীর পথেপ্রান্তরে ইফতার

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ  |  ০৮:১১, মে ২৪, ২০১৯

ইফতার রোজার একটি মৌলিক বিষয়। সে ইফতার আয়োজন একেকজন করে থাকে একেকভাবে। কেউ পালন করে নানা ধরনের খাবারের পসরা সাজিয়ে, কেউবা রাস্তায় পত্রিকা বিছিয়ে, কেউবা এক গ্লাস পানি খেয়ে।

উচ্চবিত্ত মানুষ যখন বাহারি আইটেমের পসরা নিয়ে ইফতার সারতে ব্যস্ত ঠিক তখন কিছু মানুষ রাস্তার যানজটে কিংবা ফুটপাতে বসে পানি, খেজুর, মুড়ি কিংবা জিলাপিসহ হালকা খাবার দিয়ে ইফতার করছেন। কেউবা আবার এক গ্লাস পানি খেয়ে। ফুটপাতে ইফতার করা মানুষদের অধিকাংশই শ্রমজীবী মানুষ।

গতকাল ছুটির দিনে ইফতারের সময় রাজধানীর মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় এসব চিত্র চোখে পড়ে। সন্ধ্যায় ব্যাংক এশিয়া হিসেবে পরিচিত মতিঝিলের বিদ্যুৎ বোর্ড ভবনের সামনেই একদল শ্রমিক পত্রিকা বিছিয়ে তৈরি হচ্ছে ইফতার করতে। পেপারে কিছু মুড়ি, বুট, খেজুর রয়েছে। আজান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ইফতার করে। তাদের মধ্যে একজনের নাম শহিদুল।

তিনি আমার সংবাদকে বলেন, আমরা দিনমজুর আমাদের তো ধনীদের মতো বিভিন্ন আইটেম দিয়ে ইফতার করা সম্ভব না। আমরা এভাবেই প্রতিদিন কাজ শেষে যেখানে ইফতারের সময় হয় সেখানেই বুট, মুড়ি দিয়ে ইফতার করি।

পাশেই একটি চায়ের স্টলে দৌড়ে এসে একজন বলছে, ভাই এক গ্লাস পানি দেন। তিনি একজন রিক্সা ড্রাইভার। এক গ্লাস পানিই তার ইফতার। কারণ রিকশায় যাত্রী বসা। তাই তিনি পানি খেয়ে দ্রুত আবার রিকশায় যায়। কয়েক সেকেন্ডে তার নামটা জানা গেল। তার নাম আব্দুল করিম। দৈনিক বাংলা মোড়ে কথা হয় লেগুনা ড্রাইভার সজিবের সাথে।

তিনি বলেন, ‘গত সাত বছর ধরে যেখানে সন্ধ্যার আজান হয় সেখানে ইফতার। এভাবেই রোজাগুলো কাটে। তবে এই রোজায় গতকালই প্রথম কমলাপুরে বসে ইফতার করেছি। কারণ সেখানে টিকিট কিনতে গিয়েছিলাম। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ফুটপাতে মোহাম্মদ সেলিম বাক্সের মধ্যে শার্ট বিক্রি করছিলেন।

তার পাশেই ভ্যানে ফলমূল বিক্রি করছিলেন শাহিন আলম। এই দুজনসহ আরও কয়েকজন একসঙ্গে ইফতার করতে বসেছেন। মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘চার-পাঁচজন একলগে ইফতার করি। ভালাই লাগছে। আমরা গরিব মানুষ।

আমাদের জীবনটাই এমন, রাস্তায় রাস্তায় কাটে। ফুটপাতে বসে ইফতার করছিলেন মো. আব্দুল গফুর নামের এক বৃদ্ধ। তিনি পেশায় ভিক্ষুক। তার ইফতারে ছিল একটি বক্সে মুড়ি, দুটি আলুর চপ আর এক বোতল পানি।

তিনি বলেন, ‘একজন কিছু মুড়ি আর দুইডা চপ দিলেন। এই দিয়েই ইফতার করি। জ্যামের কারণে বাসে বসেই ইফতার করছিলেন শিউলি আক্তার। তিনি বলেন, যাব রামপুরা। ভাবছিলাম বাসায় গিয়ে ইফতার করব। কিন্তু এত বেশি জ্যাম যে বাসায় গিয়ে ইফতার করার আর সুযোগ হলো না। তাই এখানেই ইফতার করতে বাধ্য হলাম।

মতিঝিল মোড়, দৈনিক বাংলা মোড়, পল্টন মোড়ে ট্রাফিক পুলিশদের দাঁড়িয়ে ইফতার করতে দেখা গেছে। পুলিশদের সাথে কথা বললে তারা জানান, আমাদের কাজই রাস্তায় রাস্তায়। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে যেখানে ইফতারের সময় হয় সেখাইনেই ইফতার করতে হয়। এমনকি প্রায় সময় সেহরিও খাইতে হয় রাস্তায়।

এছাড়াও গুলিস্তানের বিভিন্ন শপিংমলগুলোতে দেখা গেছে কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে ইফতার করছেন। বঙ্গমার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই বসে পড়েছেন মেঝেতে। কেউ-বা আবার ইফতারের আগ মুহূর্তে শপিংমলের সিঁড়িগুলোতেই বসে পড়েন ইফতারের জন্য। সারাদিন রোজা রাখার পর সাধারণত ইফতারের আগে শপিংমলগুলোর ফুড কোর্ট বা ফাস্ট ফুডের দোকানে অনেকেই ভিড় করেন।

এ বিষয়ে রাজধানীর বঙ্গমার্কেটের সামনে ইফতার বিক্রেতা নাহিদ বলেন, ঈদ যতই এগিয়ে আসছে, ততই ইফতারের আগে চাপ বাড়ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তো ওয়ান টাইম প্লেটগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় কোনো রকমে খবরের কাগজে দিয়েছিলাম; যাতে ইফতার রেখে মাটিতে বসেই অনেকেই ইফতার করতে পারেন।

তিনি জানালেন, তবে মাটিতে বসে ইফতার করতে আপত্তি নেই বঙ্গমার্কেটে আসা ক্রেতাদের। রংপুর থেকে মাল কিনতে এসেছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতি বছরই রমজানে মালামাল কিনতে বঙ্গ মার্কেটে আসতে হয়। তাই এভাবে এ মাসের কয়েকদিন রাস্তায় ইফতার করতে হয়।

তিনি বলেন, ইফতারের সময় হলে যেখানে জায়গা পাই, সেখানেই ইফতার করি। আর শপিংমলে মাটিতে বসে ইফতার করার মজাই আলাদা। একথা বলেই হেসে ওঠেন তিনি। ইফতারের সময় দোকানগুলোতে বিক্রি বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান ফুলবাড়িয়া মার্কেটের কর্মচারী মেহদী হাসান।

তিনি বলেন, আজান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১৫ মিনিটের জন্য বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায়। তখন মালিক আমাদের নিয়ে ইফতার করেন। আমরাও যা খাই, উনিও তাই-ই খান।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত