শিরোনাম

উপকূলের কাছাকাছি ‘ফণী’, বাড়ছে ঢেউয়ের উচ্চতা

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০৬:৩১, মে ০৩, ২০১৯

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ ধীরে ধীরে উপকূলের কাছাকাছি আসছে। ফলে শুক্রবার ভোর রাত থেকে বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে তীরে আছড়ে পড়ছে বড় বড় ঢেউ।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাচ্ছে, শুক্রবার সকাল থেকেই উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ের প্রভাব বাড়বে। খুলনা ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় শুক্রবার সকাল নাগাদ অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’-এর অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব শুরু হতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রটি বাংলাদেশে প্রথম হানা দিতে পারে মেহেরপুর জেলায়।

ঘূর্ণিঝড়টি এমন সময় বাংলাদেশে আঘাত করতে যাচ্ছে, যখন কৃষকের পাকা বোরো ধান মাঠে; মরিচ, মিষ্টিকুমড়া, রবি ভুট্টা, শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসলও এখন মাঠে। বেশির ভাগ কৃষক তাদের ফসল ওঠাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় ফণীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে কৃষকের।

ঘূর্ণিঝড় ফণীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে জলোচ্ছ্বাস নিয়ে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ফণীর প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, জলোচ্ছ্বাস জোয়ারের সময় হবে নাকি ভাটার সময় হবে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জোয়ারের সময় যদি জলোচ্ছ্বাস হয়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হবে ব্যাপক। আর যদি ভাটার সময় হয় তখন ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কম হবে।

পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোয়ারের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ ফুটের উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হলে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ অনেক বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাঁধ ভেঙে ওই অঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। গত চার দিনে বেশ কয়েকবার গতি বদল করেছে ফণী।

এর সব শেষ গতিবিধি অনুযায়ী মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে সাত নম্বর, চট্টগ্রামকে ছয় নম্বর এবং কক্সবাজারকে চার নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। সমুদ্রে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে নিরাপদ স্থানে থাকতে বলা হয়েছে।

এদিকে, গভীর সমুদ্র থেকে তীরে ফিরতে শুরু করেছে মাছধরার ট্রলার ও নৌকা। মানুষেরা দল বেঁধে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ে। কক্সবাজার এবং চট্টগ্রাম সমুদ্র অঞ্চলেও বৃহস্পতিবার রাত থেকে একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে বাতাসের গতিবেগ ক্রমশ বাড়ছে।

ঘূর্ণিঝড় ফণী পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৮০০ কিলোমিটারেরও বেশি দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান করছে।

এদিকে, ফণীর ছোবলকে মোকাবেলা করতে প্রস্তত হয়ে আছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত এই ঘূর্ণিঝড়টির বর্তমান অবস্থান ও গতিবিধি দুর্যোগ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর, অধিদপ্তর সার্বক্ষণিক মনিটর করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা ও উপজেলাতে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।

কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে ০১৭৬৯৯৫৪১৩৭, ০১৭৫৯১১৪৪৮৮, ৯৮৫৫৯৩৩ এই নম্বরে।
এছাড়াও হটলাইনে যোগাযোগ করার জন্য বিশেষ নম্বরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহারে অনুরোধও জানিয়েছে অধিদফতর। নম্বরগুলো হচ্ছে- ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯২৭৭৭১১৭৮৪, ০১৯২৭৭১১৭৮৫।

পাশাপাশি চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল, রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহন প্রস্তুত, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহকে একযোগে কাজসহ ১২ পদক্ষেপ নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ঘূর্ণিঝড় ফণী-পরবর্তী জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তাসহ যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও তার অধীন সব দপ্তর আজ ও আগামীকাল শনিবার খোলা থাকবে।

বন্দরে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে সব যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ।

ফণীর প্রভাব মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এক আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আজ শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বেলা গড়ানোর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জেলার মানুষদের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, সকালে শুরু করে সন্ধ্যার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রটি বাংলাদেশে প্রথম হানা দিতে পারে মেহেরপুর জেলায়। আর সেটি শনিবার (৪ মে) দুপুর ১টার দিকে আঘাত হানতে পারে।

এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুরে আঘাত হানতে পারে। শনিবার বিকেল ৩টার দিকে শিবগঞ্জ অতিক্রম করতে পারে। যার গতি হতে পারে ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার। এরপর রাজশাহীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পোরশা অতিক্রম করবে শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ।

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা সদরের উপর দিয়ে মূলকেন্দ্রটি অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। রাত ১১টার দিকে সীমান্তবর্তী উপজেলা বিরামপুর অতিক্রম করতে পারে। যে কারণে এই এলাকাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

এরপর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা হয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের উপর দিয়ে অতিক্রম করবে শনিবার মধ্যরাতে। সর্বশেষ কাউনিয়া উপজেলার উপর দিয়ে কুড়িগ্রামের রাজারহাট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করবে রোববার ভোররাতে।

ফণী ভারতের গোহাটির উপর দিয়ে ভুটানে ল্যান্ডফল করবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে ল্যান্ডে আঘাত করার পর ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে ফণী। এতে মেহেরপুরের তুলনায় বিরামপুর, রংপুর শহরে বাতাসের তীব্রতা কম অনুভূত হবে।

এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, বিশাল আকৃতির এই ঘূর্ণিঝড়টি শুক্রবার সন্ধ্যা রাতেই আঁচড় কাটতে পারে বাংলাদেশের সীমানায়। রাত ৯টা নাগাদ প্রথমে শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানতে পারে।

এরপর যশোর, খুলনা, মেহেরপুর, রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম হয়ে ভারতে প্রবেশ করবে। তবে এর পার্শ্ববর্তী জেলা জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও লালমনিরহাটকেও ক্ষতিগ্রস্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবার খানিকটা ডানে টার্ন নিয়ে মেহেরপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুরের সরিষাবাড়ী, কিশোরগঞ্জ হয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনটি হলে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে ফণীর প্রভাবে শুক্রবার দিনের প্রথম ভাগ থেকেই দেশের অনেক জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত