শিরোনাম

অসতর্কতায় করুণ মৃত্যু সচেতন হতে হবে সবাইকে

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০২:১৬, মার্চ ১০, ২০১৯

রেললাইনে কাটা পড়ে বা চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় গত পাঁচ বছরে সারা দেশে নিহত হয়েছে ৪ হাজার ৬১৪ জন। গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকের প্রধান প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এসব মৃত্যুর বেশিরভাগ হয়েছে পথচারীদের অসর্তকতার কারণে। প্রতিবেদনে পত্রিকাটি যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, তাতে দেখা যায়, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সালে পর্যন্ত রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে, রেলে কাটাপড়ে বা ট্রেনের ধাক্কায় মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকাতেই বেশি। পত্রিকাটি লিখেছে- রেলপথের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার লোকজন, রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে এসব দুর্ঘটনার পেছনে সাতটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। এগুলো হচ্ছে- মোবাইল ফোনে কথা বলা অথবা হেডফোনে গান শুনতে শুনতে রেললাইন পার হওয়া, বাঁকা পথের কারণে ট্রেন দেখতে না পওয়া, রেললাইন ধরে অসতর্কভাবে হাঁটা, অন্যমনস্কভাবে রেললাইন পার হওয়া ইত্যাদি। এছাড়া হতাশা থেকে আত্মহত্যাজনিত দুর্ঘটনাও রয়েছে। সারা দেশে বহু রাস্তা রেললাইনের ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে গেছে। এসব ক্রসিংকে বলা হয় লেভেল ক্রসিং। এসব লেভেল ক্রসিংয়ে বৈধ রেলগেট রয়েছে এবং ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় লোহার বার ফেলে রাস্তা বন্ধ করার জন্য গেটম্যান রয়েছে। কিন্তু এর বাইরে সারা দেশে রয়েছে বহুসংখ্যক অবৈধ লেভেল ক্রসিং, যেগুলোতে কোনো গেটম্যান নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রমতে, সারা দেশে এমন অবৈধ রেলগেটের সংখ্যা ৬৫৪টি। এর বাইরেও প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে ‘সুবিধা গেট’। এগুলো সাধারণত স্থানীয় লোকজন তাদের সুবিধার জন্য বানিয়ে থকে। এসব অবৈধ রেলগেট একেকটা মৃত্যুফাঁদ হিসেবেই দেখা দিয়েছে। রেললাইনে দুর্ঘটনার প্রধান একটি কারণ অসতর্কভাবে রেললাইন পার হওয়া। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে রেলওয়ের অননুমোদিত রেলগেট দিয়ে পারাপারের সময় অনেকেই ট্রেন আসছে কিনা খেয়াল করেন না। ফলে দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। তাছাড়া আজকাল তরুণ বয়সিদের কানে হেডফোন লাগিয়ে পথ চলতে দেখা যায়। কানে হেডফোন থাকায় এরা বাইরের শব্দ শুনতে পায় না। রেললাইন পারাপারের সময় তাই অনেক সময় প্রাণ হারায় অসতর্ক এসব মানুষ। কিছুদিন আগে ঢাকায় বেড়াতে এসে খিলক্ষেত রেললাইনে চলন্ত ট্রেনের সাথে সেলফি তুলতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এক কিশোরের। রেল কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, রেললাইনে মৃত্যুর আশি শতাংশই হয় অসতর্কতার কারণে। এর সত্যতা নিয়ে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। চোখের সামনে মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা দেখেও আমাদের হুঁশ হয় না। শুধু রেললাইনে নয়, সড়কেও কি একই দৃশ্য দেখা যায় না? রাজধানীতে পথচারীদের দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্কবাণী প্রচার করে থাকে মেট্রোপলিটন পুলিশ। ট্রাফিক সপ্তাহগুলোতে এ প্রচারণা বহলাংশে বৃদ্ধি পায়। ফুটপাত ধরে হাঁটা, জেব্রাক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপার, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার ইত্যাদির প্রতি পথচারীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য নানা ধরনের প্রচারণা চালানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এসব মানতে চায় না। নিয়ম-নীতি না মানা বা উপেক্ষা করার একটি নেতিবাচক প্রবণতা যে আমাদের কারো কারো আদতে পরিণত হয়েছে তা বোধকরি অস্বীকার করা যাবে না।রেললাইন দুর্ঘটনার জন্য কর্তৃপক্ষের অবহেলা উদাসীনতাও কম দায়ী নয়। দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে- রাজধানীতে গজিয়ে ওঠা অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো হয় বন্ধ করে দেয়া হোক, না হয় সেসব স্থানে গেটম্যান নিয়োগ দেয়া হোক। কিন্তু এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যেন উদাসীন। তারা এদিকে কোনো মনোযোগ দিয়েছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কথাও বলা হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগ নিয়েও তা বাস্তবায়ন করছে না। উদাহরণস্বরূপ- খিলগাঁও ফ্লাইওভারের খিলগাঁও প্রান্তের কথা বলা যায়। উত্তর শাহজাহানপুর থেকে খিলগাঁওয়ে যাতায়াতের জন্য পথচারীদের রেললাইন পার হতে হয়। প্রতিদিন ছাত্র-ছাত্রীসহ হাজারো মানুষ এ রাস্তাটি পারাপার হয়। এখানে একটি ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। একবার সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগও নিয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা আজো বাস্তবায়িত হয়নি।
দুর্ঘটনা কখনো প্রাকৃতিকভাবে ঘটে না। মানুষের অসতর্কতাই প্রধানত এজন্য দায়ী। সড়ক, রেল, নৌ, অগ্নিকাণ্ড- সবক্ষেত্রেই মানুষের অসচেতনতা ও অসতর্কতা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কিংবা গত পরশুর সদরঘাটের নৌকাডুবি- অসতর্কতাই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। সবক্ষেত্রে সরকার বা কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা সঙ্গত নয়। বুদ্ধি-বিবেচনাকে কাজে লাগিয়ে দুর্ঘটনা এড়িয়ে নিজেদের নিরাপদ রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। পথ চলতে সতর্কতা অবলম্বন করলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে আসবে-সচেতন ব্যক্তিরা এমনটিই মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমরা কবে সচেতন হবো? আর কত মৃত্যু চোখের সামনে দেখলে আমাদের চৈতন্যোদয় হবে?

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত