শিরোনাম

যানজটের পুরনো কেচ্ছা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে কি?

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১২:১৫, মার্চ ০৯, ২০১৯

রাস্তা জুড়ে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। দু’পাশে একই অবস্থা। স্থবির হয়ে আছে সব। বাসের ভেতরে বসে বিরক্তি চরমে উঠছে সবার। কটু মন্তব্য আর খিস্তি খেউড় করে কেউ কেউ মনের ঝাল মেটাচ্ছেন। কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন উৎকণ্ঠিত-উদ্বিগ্ন। যাত্রীদের কেউ অফিসে যাবেন, কেউ যাবেন নতুন চাকরির উন্টারভিউ দিতে অথবা অন্যকোনো জরুরি কাজে। সময় মতো পৌঁছতে না পারলে সবই ওলট-পালট হয়ে যাবে। কিন্তু করার কিছু নেই। অতএব নিজেকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর গত্যন্তর কী? ঢাকার রাস্তায় এমন দৃশ্য নতুন কিছু নয়। নিত্যদিনের এ ঘটনার সাথে পরিচিত এই নগরবাসী। তারা এটাকে তাদের নিয়তি বলেই যেন ধরে নিয়েছে। ঢাকা এখন যানজটের জন্য বিশ্বখ্যাত। বহু গবেষণায় উঠে এসেছে এই যানজটের পুরনো কেচ্ছা-কাহিনী ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। যানজট কমানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল মিলছে না। বরং অপরিকল্পিত নানা উদ্যোগ এবং হুটহাট নেয়া নানা সিদ্ধান্ত যানজটের ব্যাপকতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলেই মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদগণ। এর ফলে সমপ্রতি যানজট যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তাতে ঢাকাবাসীর রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার রাস্তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে ছোট বা ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা। এরপরও প্রতিদিনই নতুন গাড়ি নামছে রাস্তায়। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে মোটরসাইকেলের সংখ্যা; যার বেশির ভাগ চালকই কোনো নিয়ম-কানুন মানে না। অযান্ত্রিক যানবাহন কখনো কখনো পুরো সড়কের দখল নিয়ে নেয়। বাসগুলোকে নিয়ম মানানোর সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। যত্রতত্র, এমনকি মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো নিয়মিত চিত্র। পেছনে শত শত গাড়ির লাইন পড়ে যায়। এমনিতে প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তা সরু, তার ওপর অবৈধ পার্কিংয়ের অন্ত নেই। কোথাও কোথাও একাধিক সারিতে পার্কিং থাকে। ফলে রাস্তা আরো সরু হয়ে যায় এবং যানজট ভয়াবহ রূপ ধানণ করে। আগে ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেলের যেখানে দিনে দুটি বা তিনটি ট্রিপ হতো, রাইড শেয়ারিং চালু হওয়ায় সেখানে ট্রিপ সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। এটি রাস্তার ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি করেছে। এর সাথে রয়েছে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ইলেক্ট্রনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু থাকলেও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রিত হয় পুলিশের হাতের ইশারায়। ফলে দেখা যায় লালবাতি জ্বললে গাড়ি চলার অনুমতি পাওয়া যায়, আর সবুজবাতি জ্বললে থেমে যেতে হয়। কোথাও কোথাও বাঁশ বা দড়ি বেঁধেও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় পুলিশকে। তার ওপর আছে কতিপয় প্রভাবশালীর ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর প্রবণতা। এর মধ্যে গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো যুক্ত হয়েছে উন্নয়নের চাপ। কয়েক দিন ধরে মহানগরীর মধ্যাঞ্চলে অস্বাভাবিক যানজট লেগে আছে। এর একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তার একটি বড় অংশ মেট্রো রেলের কাজের জন্য ঘেরাও দিয়ে রাখা। ঘেরাও দেয়ার আগেই এ রাস্তার যানবাহনের চাপ মোকাবেলায় বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন ছিল। এ রাস্তার অপেক্ষাকৃত ছোট অংশ ঘেরাও দেওয়া যেত কি না, ভেবে দেখা প্রয়োজন ছিল। ঘেরাওয়ের ভেতরে কাজ চলছে খুবই ধীরগতিতে। এত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আমরা জানি না, মেট্রোরেল প্রকল্পের কর্তৃপক্ষ কিংবা ট্রাফিক বিভাগ বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করেছিল কি না। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার প্রমাণ পাচ্ছি না। এখানেই শেষ নয়, বিভিন্ন সংস্থার ধারাবাহিক খোঁড়াখুঁড়িও একই সঙ্গে চলছে। যানজটের বর্তমান অবস্থায় নাগরিকদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে তিন-চার ঘণ্টাও লেগে যাচ্ছে। যানজটের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরবাসী। একদিকে সময়ের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিক আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, মুমুর্ষ রোগীকে বহনকারি এ্যাম্বুলেন্স যানজটের কবলে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকছে, অন্যদিকে সেই মুমুর্ষ রোগীর প্রণবায়ূ বেরিয়ে গেছে। অতিসম্প্রতি ঢাকাকে বিশ্বের দ্বিতীয় দুষিত নগরী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায়। এটা আমাদের জন্য সুখকর কোনো খবর নয়। রাজধানী হিসেবে ঢাকা হবে পরিচ্ছন্ন এবং স্বাচ্ছন্দে বসবাসের উপযোগী একটি শহর, এমনটিই প্রত্যা্শা সবার। সে প্রত্যাশা কবে পূরণ হবে তা বোধকরি একমাত্র ভবিতব্যই বলতে পারে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত