শিরোনাম

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ বাঙালির জেগে ওঠার দিন

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০১:৩২, মার্চ ০৭, ২০১৯

একটি জাতির ইতিহাসে এমন সব ঘটনা ঘটে যা কখনোই স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় না। কালজয়ী ঘটনা হিসেবে তা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনের তেমনি একটি দিন। স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠা এদেশের মানুষকে সেদিন জাগিয়ে তুলেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উত্তাল সমাবেশে তিনি শুনিয়েছিলেন বাঙালি জাতির আজন্ম লালিত স্বপ্ন স্বাধীনতার এক অমর কবিতা, অবিনাশী গান। বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন-‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় প্রহর গণনারত জাতি সেদিন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল দখলদারদের কবল থেকে দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে এদেশের মানুষ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে। বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের বিদায় নেয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টোর প্ররোচনায় ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে ফুঁসে উঠতে থাকে বাঙালি জাতি। ফলে সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনী নেমে পড়ে অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার বাঙালিকে দমন করতে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় বহু মানুষ। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিযা খান ১ মার্চ বেতার ভাষণে অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করেন। পরিষ্কার হয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চক্রান্ত। তারা যে বাঙালি নেতাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে সম্মত নয় তা আর চাপা থাকলো না। জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়লো। তারা দখল করে নিল রাজপথ। জাতিকে সবকিছু জানানোর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন ৭ মার্চের জনসভার। সে জনসভা পরিণত হলো জনসমুদ্রে। লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হলো স্বাধীনতার স্লোগান। জনতার সেই মহাসাগরে এক সময় দৃঢ়, ঋজু ভঙ্গিতে মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আর তখন যেন রক্ত-মাংসের মানুষ নেই; পরিণত হয়েছেন বাঙালি জাতির আশা ভরসার মূর্ত প্রতীকে। তাঁকে ঘিরে বাঙালি জাতি তখন স্বপ্ন দেখছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মালিক হওয়ার, একটি নতুন পতাকা হাতে নিয়ে শির উঁচু করে বিশ্বদরবারে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে দাঁড়ালেন। সামনে তার ক্ষুব্ধ তরঙ্গমালার মতো লাখো জনতা। তারা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে কী শোনান তাদের নেতা তার জন্য। বঙ্গবন্ধু তার জলদগম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন এদেশের মানুষের সেই পরিচিত শব্দ-‘ভাইয়েরা আমার’। তারপর বলতে থাকলেন বাঙালি জাতির ২৩ বছরে বঞ্চনার ইতিহাস, পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতার কাহিনী। তিনি বললেন কীভাবে এদেশের মানুষকে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে, কীভাবে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করা হয়েছে। বজ্র নির্ঘোষে তিনি উচ্চারণ করলেন-‘সাত কোটি মানুষকে আর দাবায়ে রাখতে পারবা না’। তারপর তিনি এদেশের মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার বাণী শোনালেন, যার জন্য গোটা বাঙালি জাতি অপেক্ষা করে আসছিল দীর্ঘ দুই যুগ ধরে। উল্লাস-উত্তেজনায় গোটা রেসকোর্স ময়দান যেন ফেঠে পড়ল। ধ্বনিত হতে থাকল- বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। মূলত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকেই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চারিত হয়। গোটা বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদেরকে স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত করেছিলেন তিনি। ফলে তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ এদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য সাধারণ ঘটনা হিসেবে সমাদৃত। আমাদের জন্য আরো গর্বের বিষয় হলো, বঙ্গবন্ধুর সে ভাষণ আজ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সূচিন্তিতভাবেই সেদিন তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর অনুপস্থিতিতে বাঙালি জাতি কী করবে তার দিকনির্দেশনাও তিনি ওই ভাষণে দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, ২৫ র্মাচ রাতে পাক হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির ওপর সশস্ত্র আঘাত হানার পর জাতি সে দিকনির্দেশনা মোতাবেকই কাজ করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীনতার পতাকা আকাশে উড্ডীন করেছে।বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এক ঐতিহাসিক দলিল। ওই ভাষণই জাতিকে স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করেছে। যতদিন পৃথিবী থাকবে, ৭ মার্চের ভাষণ তাই অম্লান হয়ে থাকবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত