শিরোনাম

খাদ্যশস্যে বিষাক্ত উপাদান ভাবতে হবে গুরুত্ব সহকারে

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০৬:১৬, মার্চ ০৬, ২০১৯

বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। পুষ্টিকর সুষম খাদ্য একজন মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু প্রতিদিনের খাদ্যই যদি বিষাক্ত হয় তাহলে? বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত। ধান থেকে চাল, চাল থেকে ভাত হয়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে। নতুন নতুন জাতের ধান এসেছে। উচ্চ ফলনশীল এসব ধান দেশে খাদ্য বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিন্তু অধিক ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে আমরা যে জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছি, তা কি ভেবে দেখেছি? ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির গবেষণায় যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা রীতিমতো ভয়াবহ। গবেষণার জন্য চালের যে ২৩২টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, তার ১৩১টিতে পাওয়া গেছে বিভিন্ন মাত্রার ক্রোমিয়াম। ১৩০টিতে পাওয়া গেছে ক্যাডমিয়াম ও সিসা। ৮৩টিতে মিলেছে আর্সেনিকের মতো মারাত্মক বিষের অস্তিত্ব। কী সাংঘাতিক!জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিক মানুষের শরীরে ঢুকলে তা সহজে বের হতে পারে না। সব ক’টিই দীর্ঘ মেয়াদে মানবদেহের কিডনি, লিভার ও মস্তিষ্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ছাড়া ক্যান্সারসহ নানা ধরনের জীবনঘাতি রোগের বড় উৎস হচ্ছে এসব রাসায়নিক। এক কথায় এগুলোর সব ক’টিই ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে সক্ষম। মানব শরীরে অতিরিক্ত ক্যাডমিয়াম জমা হলে মারাত্মক বিষক্রিয়ায় ক্যান্সার, হূদরোগ ও কিডনি রোগ দেখা দিতে পারে। ইউরোপীয় কমিশনের নীতিমালা অনুসারে মানবদেহের জন্য ক্রোমিয়ামের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ১ পিপিএম। কিন্তু জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণায় চালে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে ৩.৪১৪ পিপিএম পর্যন্ত। ক্যাডমিয়ামের সহনীয় মাত্রা ০.১ হলেও পাওয়া গেছে ৩.২৩৯৫ পর্যন্ত। সিসার সহনীয় মাত্রা ০.২ হলেও পাওয়া গেছে ১.৮৭ পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালে ক্যাডমিয়ামের প্রধান কারণ জমিতে নিম্নমানের টিএসপি সার প্রয়োগ এবং গার্মেন্ট, ওষুধ কারখানা, টেক্সটাইল ও ট্যানারির অপরিশোধিত বর্জ্য জমির মাটিতে মিশে যাওয়া। তাদের মতে, পরিবেশদূষণের পাশাপাশি কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের পরিণতি কমবেশি সবাইকেই ভোগ করতে হচ্ছে। কারণ কীটনাশক পানিতে মিশে যে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে তা জলচর প্রাণির দেহে সংক্রমিত হয়। সেখান থেকে তা মানবদেহে প্রবেশ করে। বিশেষ করে সঠিক মান রক্ষা করে এবং প্রয়োগবিধি না মেনে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে একাধারে উৎপাদিত ফসল, মাছ, পানি ও জমি মারাত্মকভাবে দূষণের কবলে পড়ছে। এর যেকোনো মাধ্যম থেকে মানুষের শরীরে সহজেই ঢুকে পড়ছে এই বিষাক্ত উপাদান। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসল ও মাছে ভারী ধাতু ঢুকছে মূলত মাটি ও পানি থেকে। মাটি ও পানি এমনভাবেই রাসায়নিক দূষণের কবলে পড়েছে, যা খাদ্যচক্র হয়ে মানবদেহে ঢুকে মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকিতে ফেলছে মানুষকে। এ ক্ষেত্রে শিশুরা সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে রয়েছে। শিশুদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা অল্পতেই আক্রান্ত হচ্ছে।খাদ্য মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা মেটাতে আমরা উৎপাদন বৃদ্ধির নানা কলা-কৌশল প্রয়োগ করে চলেছি। কোয়ানটিটি বাড়াতে গিয়ে কোয়ালিটির দিকে মনোযোগ দিতে পারছি না। যে খাদ্য মানুষের জীবন ধারনের প্রধান পূর্বশর্ত, সে খাদ্যই হয়ে উঠছে জীবনের জন্য হুমকি। শুধু প্রাকৃতিক দূষণ থেকেই নয়, নিম্নমানের খাদ্য, যেগুলোকে অখাদ্য বলাই সঙ্গত, সেগুলো গ্রহণ করতে এক রকম বাধ্য হচ্ছে মানুষ। হোটেল রেঁস্তোরায় নিম্ন মানের ও পচা-বাসি খাবার বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। নামি দামি কোম্পানির গুদাম থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্ধার করছে নষ্ট হয়ে যাওয়া মাছ মাংসসহ খাদ্যদ্রব্য। জনস্বাস্থের জন্য মারাত্মক হুমকি এসব খাদ্য যারা বাজারজাত করে তারা মানুষের পর্যায়ে পড়ে কি না ভেবে দেখা দরকার। মানুষ নামের এসব অমানুষের বিরুদ্ধে নেয়া দরকারে কঠোর পদক্ষেপ।আজ সময় এসেছে এসব নিয়ে ভাবার। আমাদের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য যেমন উৎপাদন বৃদ্ধির প্রযোজন রয়েছে, তেমনি খাদ্যের পুষ্টিগুণ রক্ষা এবং বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনের দিকেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। কীভাবে মানুষের শরীরে সহনীয় মাত্রার রাসায়নিক দ্রব্য সংবলিত খাদ্য শস্য উৎপাদন করা যায়, বিজ্ঞানীদের সে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি রাসায়নিক কীটনাশক যথাসম্ভব কম ব্যবহার করে ভিন্ন উপায়ে ফসলকে কীটপতঙ্গমুক্ত রাখার উপায়ও উদ্ভাবন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত