শিরোনাম

মাদক ও নারী সমাজ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ওসমান গনি  |  ০২:০৮, জানুয়ারি ১৬, ২০১৯

সময়ের সাথে দেশ এগিয়ে গেলেও আমাদের নারী সমাজের একটা অংশ এগিয়ে যাচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে। এই অংশটা সমাজ তথা দেশের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে পুরুষ অপরাধীদের ভায়া হয়ে তারা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা নারী হওয়ার সুবাধে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোন জোড়ালো ভূমিকা রাখতে পারছে না। তার কারণ একজন পুরুষ যখন অপরাধ করে তখন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু একজন নারী যখন অপরাধ করে একজন পুরুষ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ইচ্ছা করলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। কারণ সে মহিলা। তাকে আইনের আওতায় আনতে হলে নারী পুলিশের দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও সে পরিমান মহিলা পুলিশ তৈরি হয়নি। যার কারণে এসব নারীরা অপরাধ করে অতিসহজে আইনের হাত থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। দেশের সর্বত্র কোন মহিলা পুলিশ নাই। আমাদের দেশে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলিতে দিন দিন বাড়ছে নারী অপরাধী। ছিনতাই, চুরি, অপহরণ, প্রতারণা, অস্ত্র বহন, মাদক বিক্রি ও বহন, যৌনতার জালে ফেলে প্রতারণা, নকল টাকা বহনসহ বিভিন্ন ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে নারী। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীদের দিয়ে অপরাধ করানো তুলনামূলক নিরাপদ। এ কারণেই দেশের বড় বড় পুরুষ অপরাধীরা তাদের দলে টানছে এবং তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছে।। প্রশাসন বলছে, সামাজিক অবক্ষয় এবং কোমল মানসিকতার সুযোগ নিয়ে নারীদের বিপথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রধানরা মোটিভেটেড করে তাদের অপরাধ জগতে নিয়ে যাচ্ছে। মাত্র পনেরো বছর বয়সে বিয়ে হয় রুমানার। পাঁচ বছরে দুই ছেলে হয়। বিশ বছর বয়সে যৌতুকের কারণে স্বামী তাকে তালাক দেয়। দু ছেলেসহ ফিরে আসে মায়ের কাছে কক্সবাজারের টেকনাফের নীলা এলাকায়। গরিব মায়ের পক্ষে তিনজন মানুষের ভরণপোষণ করার সাধ্য নেই। বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সপ্তম শ্রেণির পর আর পড়াশোনাও করেনি রুমানা। ওর প্রতিবেশী ইয়াবা ব্যবসায়ী। সেই ওকে প্রস্তাব দেয় ১৭০০ পিস ইয়াবা চিটাগাংয়ে পৌঁছে দিলে ৫ হাজার টাকা দেবে। সংসারের অভাবের কারণে ইয়াবা চিটাগাং পৌঁছে দিতে রাজি হয়। পলিথিনে ইয়াবা ভরে কাপড়ে পেঁচিয়ে ব্যাগে ভরে নেয়। ২০১৮ সালের মার্চে গাইড হিসেবে একজন পুরুষের সঙ্গে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রামের পটিয়ায় আসে। পটিয়ায় বাস থেকে নেমে হাঁটতে থাকে। যাকে ইয়াবা হস্তান্তর করা হবে সে একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। কয়েক হাত এগুতেই সিভিল ড্রেসে দুজন লোক তাদের দুজনকে আলাদা আলাদা জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা দুজনই ভাইবোন পরিচয় দেয়। লোক দুজন তাদের গাড়িতে উঠতে বলে। গাড়িতে উঠতেই ওদের দুপাশে দুজন বসে পড়ে। ভয়ে কাঁপতে থাকে ও। ব্যাগটা পেছনের সিটে ফেলে দেয়। ওরা চোখে চোখে কথা বলে। এটা ওই লোকদের দৃষ্টি এড়ায় না। ওদের চিটাগাং কোতোয়ালী থানায় নিয়ে যায়। ব্যাগ চেক করে ইয়াবা পায়। তারা ওদের দুজনের কাছে এক লাখ করে দুলাখ টাকা দাবি করে। ওর সঙ্গের লোকটি ওই দুজন লোকের সাথে কথাবার্তা বলে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড় পেয়ে যায়। এত টাকা ও কোথায় পাবে? ওর সঙ্গে কারও যোগাযোগ করতেও দেয়া হয় না। মাদক মামলায় ওর জায়গা হয় চট্টগ্রাম জেলা কেন্দ্রীয় কারাগারে। বড় ছেলে মায়ের কাছে টেকনাফে থাকে। এক বছরের ছেলে মা ছাড়া থাকতে পারবে না তাই তার কাছে রেখেছে। একমাত্র ছোট ভাই দু-একবার দেখা করেছে। উকিল জোগাড় করে মামলা চালাচ্ছে। যার কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে সে ওই পাঁচ হাজার টাকাও ওর পরিবারকে দেয়নি। কোনো খোঁজও নেয়নি। এখানে তিন মাস সমাজসেবা অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ করেছে। কারাগার থেকে বেরিয়ে এই প্রশিক্ষণটাকে কাজে লাগাতে চান তিনি। চট্টগ্রাম জেলা কেন্দ্রীয় কারাগারের সূত্রে জানা যায়, এ বছরের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪৭০ জন নারী বন্দি ছিল। তাদের মধ্যে মাদক পাচার, বহন, ব্যবসায় জড়িত অর্থাৎ মাদকসংশ্লিষ্ট মামলায় ৩৫৩ জন নারী বন্দি ছিল। চট্টগ্রাম জেলা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপারের মতে, মাদক মামলায় যে নারীরা কারাগারে রয়েছে তাদের কেউ ক্যারিয়ার, ব্যবসা, স্বামী অথবা ভাইয়ের কারণে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। কারাগার থেকে বেরিয়ে তারা যাতে আর মাদক ব্যবসায় ফিরে যেতে না পারেন এজন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তাদের বোঝানো হচ্ছে, মাদক ব্যবসায় যুক্ত থাকায় তাদের সন্তানরা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে। এর ফলে তাদের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে তারা যে ভুল করেছে তা তাদের আচরণে বোঝা যায়। তাদেরকে দুই মাসের বুটিক, বাটিক, নকশি কাঁথা, টেইলার্রিং, বিউটি পার্লারের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে মাদক ব্যবসা থেকে বের করে এনে তাদের স্বাভাবিক, সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ শেষে তাদের সার্টিফিকেট প্রদানের কথাও ভাবছি। যাতে তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। শুধু তাই নয়, জিআইজেড প্যারালিগ্যাল আইনি সহায়তার মাধ্যমে তাদের মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। অর্থের অভাবে যারা মামলা চালাতে না পারে তাদেরকে এই সুবিধা প্রদান করা হয়। তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে মাদক বহনকারী এক মায়ের জায়গা হয়েছে কক্সবাজার জেলা কারাগারে। কক্সবাজারের টেকনাফে ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এই মা। মাদক মামলার দায়ে অপরাধী হয়ে দুই বছর ধরে কক্সবাজার জেলা কারাগারের মহিলা ওয়ার্ডে বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। তিন বছরের মেয়ের বয়স এখন পাঁচ বছর। তার স্বামী জীবিত থেকেও সন্তান আর স্ত্রীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি। মহিলা রাইটার (দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি), মহিলা হাজতি ও কয়েদিদের সঙ্গেই বেড়ে উঠছে মেয়েটি। অভাবের কারণে আমাদের দেশের মহিলারা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা কিশোরী ও নারীদের মাদক এক স্থান থেকে অন্যস্থানে পাঠাতে ব্যবহার করে। মোটা টাকার লোভে পড়ে তারাও অনাসয়ে জড়িয়ে পড়ছে এই অবৈধ ব্যবসায়। মহিলাদের সাথে ছোট বাচ্চা থাকলে অনেক সময় পুলিশ সন্দেহ করেন না। মাদক ব্যবসায়ীরা এ কৌশলটাকেই কাজে লাগায়। কোমরে অথবা পেটে মাদক বেঁধে বাচ্চা সাথে নিয়ে, বাচ্চার জামাকাপড়ে ইয়াবা পেঁচিয়ে ব্যাগে ভরে মাদক নিয়ে যাতায়াত করে থাকে। যাতে কেউ মাদক পাচারকারী হিসেবে সন্দেহ করতে না পারে। কক্সবাজারের উখিয়ার কোটবাজারে স্বামী-সন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন মিলি (আসল নাম নয়)। আড়াই বছর আগে পুলিশ ওর ঘর রেট করে কয়েক হাজার পিস ইয়াবা পায়। সে সময় ওর স্বামী বাড়ি ছিল না। মাদক মামলায় ছয় মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে ওর জায়গা হয় কক্সবাজার জেলা কারাগারে। এরপর ওর স্বামীও চিটাগাংয়ে ইয়াবাসহ ধরা পড়ে। ওর স্বামীও মাদক মামলায় চট্টগ্রাম জেলা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে। স্বামীও কারাগারে থাকায় ওর আর সন্তানের খোঁজখবরও কেউ নেয় না। কক্সবাজার জেলা কারাগারের সূত্রে জানা যায়, এ বছরের ৮ জানুয়ারিতে ২১৪ জন নারী বন্দি ছিল। তাদের মধ্যে মাদকসংশ্লিষ্ট মামলায় ১৭৫ জন নারী বন্দি ছিল। কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত এলাকা। এ কারণে এলাকার নারীদের মধ্যে মাদক ব্যবসা, বহন ও পাচারে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। কর্মসংস্থান না থাকায় অভাবের কারণে কম টাকায় তারা মাদক বহন করতে রাজি হয়ে যায়। কক্সবাজার-চিটাগাং রোডটাই মাদক পাচারকারীরা বেশি ব্যবহার করে। কারাগার থেকে বেরিয়ে এসব নারীরা যাতে আবার মাদক পাচার বা ব্যবসায় জড়িত না হয় এজন্য তাদের কে হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। অনেকে দ্রুত কাজ শিখেছে। অনেকের সময় লাগছে কাজ শিখতে। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। মাদক ব্যবসায় নারীদের ব্যবহার বন্ধে নারীদের সার্চ করার ক্ষেত্রে প্রথম প্রথম প্রশাসনের লোকজন ইতস্তত বোধ করত। বেশভূষার কারণে অনেক নারী সন্দেহের আওতায় আসত না। মাদকব্যবসায়ীরা এ সুযোগটাকে গ্রহণ করে নারীদের মাদক বাহক হিসেবে মাদক ব্যবসায় ব্যবহার করেছে। এখনও করছে। এটা যেমন সত্যি, তেমনি কিছু কিছু নারী মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে তারা অত্যন্ত আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা যে কোনো পুরুষকে টেক্কা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। নারী তার বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করে মাদক ব্যবসায় জড়িত হচ্ছে। আগে এড়িয়ে গেলেও এখন প্রশাসনের লোকজনও সচেতন হয়েছে। মাদক পাচার ব্যবসায় জড়িত সন্দেহে এখন সবার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল অর্থাৎ সবাইকে সমানভাবে সার্চ করা হচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারীরা প্রত্যেকেই ভাবে তারা মাদক ব্যবসার মাধ্যমে আর্থিক লাভবান হচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থান হলে তারা এ কাজ থেকে সরে যাবে। অনেকে আবার জেনে শুনে, বুঝে মাদক ব্যবসা গ্রহণ করে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত