শিরোনাম

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বৈষম্য রয়েই যাচ্ছে

প্রিন্ট সংস্করণ॥রায়হান আহমেদ তপাদার  |  ০২:১২, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯

বাংলাদেশ অনেক আগেই বেরিয়ে এসেছে তলাবিহীন ঝুড়ির অভিধান থেকে। যেসব দেশ এক সময় বাংলাদেশকে নিয়ে এমন বিরূপ সমালোচনা করত, বতর্মানে সেসব দেশই বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে, স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে অভ্যুদয়কালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল শতকরা ৮৫ ভাগ। স্বাধীনতার ২৯ বছর পরে ২০০০ সালেও দেশে দারিদ্রের হার ছিল শতকরা ৪৮ দশমিক ২ ভাগ। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে প্রায় ২ জন গরিব ছিল। আশার কথা যে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ মতে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। দারিদ্র্যের হার কমে আসার এ ঘটনা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতেই দারিদ্র্যের হার নিম্নমুখী। জানা যাচ্ছে, সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ২০১৭-১৮ অথর্বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার প্রক্ষেপণ করেছে ২১ শতাংশ। চলতি বছর শেষে এই হার কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়াবে বলেও বিশেষজ্ঞরা প্রাক্কলন করেছেন। জানা যায়, দারিদ্র্য হ্রাস হচ্ছে এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ছে; পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্যও প্রকট, তখন স্বাভাবিকভাবেই দ্রারিদ্র্য হ্রাস কমর্সূচি বাস্তবায়নে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যথাযথ উদ্যোগ নেয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। গণমাধ্যমের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে উঠে আসে, উন্নয়নশীল অনেক দেশের চেয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। আবার এটাও জানা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। গেল কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ সফলতা অর্জন করেছে। দারিদ্র্যবিমোচনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মানুষের মাথাপিছু আয়। জীবনযাত্রার মান। শিক্ষার হার ও গড় আয়ু। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২দশমকি ৬৩ বছর। দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ। তার পরও দেশে সাড়ে দিন কোটিরও বেশি মানুষ গরিব। এ অবস্থায় গত ১৭ অক্টোর, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালিত হলো আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যদূরীকরণ দিবস। গত আট বছরে দেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্র্য জয়ে সক্ষম হয়েছে। ২০১০ সালে দেশে যত গরিব মানুষ ছিল, তাদের এক-তৃতীয়াংশই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যে এমডিজি ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। তিন বছর আগেই, অর্থাৎ ২০১৩ সালেই সেটা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশ তার আগেই সেই লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে মনে করেন সরকারি বিভিন্ন মহল ও বিশেষজ্ঞগণ। আয় বৃদ্ধির ফলেই দারিদ্র্য কমানোর ফসলতা এসেছে বাংলাদেশে। এই আয় বৃদ্ধির ধারায় ধনীরাই এগিয়ে আছে বেশি। এ কারণে ধনী-গরিবের বৈষম্যও বেড়েছে। বিবিএসের সর্বশেষ হিসেবে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষ দেশের ৩৮ শতাংশ সম্পদের মালিক। আর সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের কাছে আছে মাত্র দেশের ১ শতাংশ সম্পদ। বেশি দিনের কথা নয়, আজ থেকে তিন বছর আগে ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠির প্রত্যাশা ও আইন প্রণেতাগণের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বলা হয়েছে সব দেশেই ১৪ শতাংশ দরিদ্র থাকে। কিন্তু দেখা গেছে একমাত্র মালয়েশিয়া তাদের দারিদ্র্যের হার ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসন ছাড়া দারিদ্র্য ও অতি দরিদ্রদের শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ২০১৮ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৩ শতাংশে নেমে আসার কথা। যেটুকু বাকি থাকবে তা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে দূর করা সম্ভব হবে না। সেজন্য প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। শতভাগ দারিদ্র্য দূর করার জন্য স্থানীয় সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদগণের কথা ২০০৫ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ এখন তা ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দারিদ্র্য কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কৃষি ও গ্রামীণ খাতে প্রবৃদ্ধি অনেক বেড়েছে। গ্রামীণ খাত চাঙ্গা থাকার কারণে গত কয়েক বছরে ৬ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দারিদ্র্যের হার অনেক কমেছে। তার চেয়ে আরো বেশি কমাতে হলে রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ দারিদ্র্যবিমোচনে সাফল্য অর্জন করেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। এতে একদিকে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে, অন্যদিকে আয় বৈষম্যও কমবে। গত আট বছরে গরিব মানুষ কমেছে ১ কোটি ১৫ লাখ। শুধু আয়ের ভিত্তিতে নয়, বাংলাদেশে দারিদ্র্যাবস্থা গণনা করা হয় খাদ্য গ্রহণের মৌলিক চাহিদা পূরণের ভিত্তিতে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় পদ্ধতি অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে দৈনিক ২ হাজর ১২২ ক্যালরি পাওয়ার জন্য খাবার কিনতে যে পরিমাণ আয় করতে হবে, ওই ব্যক্তি সেই আয় করতে ব্যর্থ হলেই তিনি দরিদ্র। আর কোনো ব্যক্তি যদি দৈনিক ১ হাজার ৮০৫ ক্যালরি পাওয়ার খাবার কিনতে যে টাকা দরকার, তা আয় করতে ব্যর্থ হন তবে তিনি অতিদরিদ্র। গত আট বছরে হত দরিদ্র কমেছে ৭৮ লাখ। দেশে এখন হতো দরিদ্র লোকের সংখ্যা ১ কোটি ৮৬ লাখ। ২০১০ সালে এ ধরনের হতদরিদ্র ছিল ২ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ। ২০০০ সালে বাংলাদেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। তখন জনসংখ্যা ছিল ১৩ কোটি। তখন ৬ কোটি ৩৫ লাখ লোক গরিব ছিল। দেড় যুগের ব্যবধানে ২ কোটি ৮০ লাখ গরিব মানুষ কমেছে। সাবেক তত্ত্বাবধায় সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের দারিদ্র্যবিমোচনে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। এটি একটি বড় অর্জন। কৃষিতে, বিশেষ করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া; শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, এসব কারণে দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমেছে। দারিদ্র্য বিমোচনে শুধু শতাংশের বিবেচনায় দেখলে হবে না, কত লোক এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। এখনো ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ গরিব। এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। পাকিস্তান আমলে একজন কৃষিশ্রমিক সারাদিন কাজ করে দেড় থেকে ২ টাকা মজুরি ও তিন বেলার খাবার পেতেন। এমনকি তাকে সকাল ৮টায় এসে সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। তখন চালের কেজি ছিল এক টাকা। কিন্তু সারাদিনের আয় দিয়ে একজন কৃষিশ্রমিককে ১ কেজি চাল, সামান্য সবজি, লবণ ও কেরোসিন কিনে বাড়ি ফিরতে হতো। কিন্তু এখন একজন কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এই আয় দিয়ে তিনি ৫ কেজি চাল, ছোট মাছ, শাকসবজি কিনে হাসি মুখে বাড়ি ফেরেন। একজন রিকশাচালক সারাদিনে ২০ থেকে ২৫ টাকার বেশি আয় করতে পারত না পাকিস্তান আমলে। মালিকের আমদানি ১০ টাকা পরিশোধের পর তিনি পেতেন ১০ থেকে ১৫ টাকা। এখন একজন ভ্যানচালক দিনে আয় করেন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। মালিকের আমদানি দেওয়ার পরও তার নিট আয় হয় ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। এই আয় দিয়ে পরিবারের খাবার খরচ মিটিয়েও সে তার সন্তানের পড়াশোনার খরচ, নিজের ও পরিবারের চিকিৎসার খরচসহ অন্যান্য খরচ মেটাতে পারেন। আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগেও এটা সম্ভব ছিল না। স্বাধীনতার পর এ দেশের গ্রাম-গঞ্জে প্রচুর পাকা রাস্তা ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ হয়েছে। বিদ্যুৎ-সুবিধা সম্প্রসারিত হয়েছে প্রতিটি গ্রামে। বিদ্যুতের সহজলভ্যতা কাজে লাগিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্ম গ্রামগঞ্জে গড়ে তুলেছে ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প। তারা ঝুঁকি নিয়ে গড়ে তুলেছে অনেক হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খামার, ফল ও সবজি বাগান। এতে তাদের আয় বেড়েছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি বিশেষ করে বিধবা-ভাতা, বয়স্ক-ভাতা, প্রতিবন্ধী-ভাতা, মুক্তযোদ্ধা-ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প ও ন্যাশনাল সার্ভিসের মাধ্যমে বেকার যুবকদের চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থাও দারিদ্র্য দূরীকরণে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দারিদ্র্যবিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে গ্রামীণ অঞ্চলে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড বাড়াতে হবে। উন্নয়নমূলক খাতে বিনিয়োগে ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এতে গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। দেশের বিশেষ বিশেষ এলাকায় অতিদরিদ্র নারী শ্রমিক, চা-শ্রমিক, দলিত শ্রেণি, প্রতিবন্ধী, পথশিশু পরিচ্ছন্নতাকর্মীর এখনো বাজেট পরিকল্পনার বাইরে রয়েছে। তাদের বাজেটভুক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে। সেই সঙ্গে দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল ও হাওর এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। গ্রামীণ মানুষকে পুঁজি গঠনে সহায়তা করতে হবে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কারণে গ্রামে কর্মসংস্থান হয়েছে এবং দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে কিন্তু এখনো ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য রয়েই যাচ্ছে। তথ্য মোতাবেক, ৭০ ডলার মাথাপিছু আয় নিয়ে যাত্রা করা বাংলাদেশ তিনটি শর্তপূরণ করেই উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে ২০২৪ সালে। তবে, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে অতি দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে অতি দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ হবে। আর এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে গড়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। আমরা মনে করি, ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে হলে দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি উন্নয়ন পথের প্রতিবন্ধকতাসমূহ শনাক্ত ও তা দূরীকরণের ক্ষেত্রেও যথাযথ পদক্ষেপ থাকা অপরিহার্য।
লেখক ও কলামিস্ট
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত