শিরোনাম

মজুরিতে জড়িয়ে থাকে জীবনমানের স্বাদ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ রায়হান আহমেদ তপাদার  |  ০৩:৩৮, জানুয়ারি ১১, ২০১৯

আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা অক্সফাম গত বছরের প্রথম দিকে তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছিলো, বিশ্বের তৈরি পোশাক শিল্পের বড় কারখানার পাঁচ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) চার দিনে যে আয় করেন, তা বাংলাদেশের একজন নারী পোশাক শ্রমিকের সারা জীবনের আয়ের সমান। অক্সফাম তাদের এক প্রতিবেদনে বৈষম্যের এ চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটি বলছে, বিশ্বের সাত প্রধান তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি সবচেয়ে কম। শোভন জীবনযাপনের জন্য যে অর্থ দরকার, তার চেয়ে অনেক কম অর্থ পান বাংলাদেশের শ্রমিকরা। ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত রিওয়ার্ড ওয়ার্ক, নট ওয়েলথ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এ প্রতিবেদনে বিপুল সম্পদ সৃষ্টি এবং এসব সম্পদ যেসব মানুষের শ্রমে-ঘামে অর্জিত হয়, তাদের দারিদ্র্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অক্সফাম এ প্রতিবেদন তৈরি করতে বিশ্বের ১০ দেশের ১ লাখ ২৩০ জনের ওপর জরিপ করেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ অংশে দেশের পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জীবনমানের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। আমরা জানি মেহনতি মানুষের মেহনতে ফসল ফলে মাঠে, মেহনতি মানুষের মেহনতে হরেক রকম পণ্য আসে হাটে। শ্রমিকের শ্রমে গড়ে উঠে বাড়ি, শ্রমিকের শ্রমে তৈরি হয় ছোট-বড় গাড়ি। মজুরি শুধু মজুরি নয়, তাতেও পেতে হবে জীবনমানের স্বাদ। পরিশ্রমের বিনিময়ে শুধু পারিশ্রমিক নয়, ঘোচাতে হবে শ্রমিক শোষণের অপঘাত। শ্রমিকের শ্রমে শক্ত হয় ভিত, স্বপ্ন ছড়ায় রং, গড়ে উঠে পথ, দেশ গড়ায়, স্বপ্ন দেখায় প্রতিফলিত হোক শ্রমিকের অভিমত। নির্মিত হোক মেহনতি মানুষের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। যাদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে প্রায় পাঁচ দশক আগে। এতদিন পরও দেশে শ্রেণিবৈষম্য প্রকট। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অক্সফামের সূচক তা বিশ্ববাসীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। অক্সফাম সিআরআই সূচকে তিনটি মানদ-ব্যবহার করে থাকেÑ সামাজিক খাতে সরকারের ব্যয়, করণীতি এবং শ্রমিকদের অধিকার ও মজুরি। অক্সফামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর আইনে নারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়; কিন্তু শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। বস্তুত দেশে প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষেত্রবিশেষে উন্নতি হলেও পাশাপাশি শ্রেণিবৈষম্যের চিত্রটি উদ্বেগজনক। অথচ স্বাধীনতার পরপরই প্রণীত দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির একটি হিসেবে সমাজতন্ত্রের কথা তুলে ধরা হয়েছিল। বস্তুত সংবিধানে সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা থাকলেও বাস্তবে দেশে এমন এক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে, যেখানে শ্রেণিবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। একদিকে শ্রমিক শ্রেণি তার ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে না, অন্যদিকে ধনিক শ্রেণি শ্রমিকদের শোষণ করে সম্পত্তির পাহাড় গড়ছে। শ্রমিক শ্রেণির জীবনমান উন্নয়নে তাদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা কখনও কখনও মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন করলেও সমাজ বাস্তবতার নিরিখে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় উন্নততর সমাজ ব্যবস্থাপনা না থাকারই ফল। বলা যায়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য তা সুফল বয়ে আনবে না। সর্ব বিচারে এমন ব্যবস্থাই কাম্য, যা দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে। এক প্রতিবেদনে বিশ্বের সাতটি প্রধান পোশাক প্রস্তুতকারক দেশের ন্যূনতম ও বসবাসের জন্য শোভন মজুরির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও আছে ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমিকরা সবচেয়ে কম মজুরি পান। বাংলাদেশে বসবাসের জন্য শোভন মজুরি প্রয়োজন ২৫২ মার্কিন ডলারের সমান অর্থ। এর বিপরীতে বাংলাদেশের একজন শ্রমিক পান ৫০ ডলার। ভারত ও শ্রীলঙ্কার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫০ ডলার। তবে ভারতে শোভন জীবনযাপনের জন্য ২০০ ডলার এবং শ্রীলঙ্কায় ২৫০ ডলারের বেশি অর্থ দরকার হয়। প্রতিবেদনে নারী শ্রমিকদের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কাজের চাপে শৌচাগারে যেতে না পারায় অনেক অল্প বয়সি নারী শ্রমিক মূত্রনালির সংক্রমণে ভোগেন। আমাদের মেহনতি মজুররা কি বাঁচার মতো বেঁচে আছে? তারা কি প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারটুকু জোটাতে পারে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে? প্রচলিত বাজারে নিজেদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারে? হরহামেশা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ে, যাতায়াতের খরচ বাড়ে, চিকিৎসার ব্যয় বাড়ে, ফলশ্রুতিতে খেটে খাওয়া মজুরের উপার্জনে টান পড়ে, শেষমেশ ভাতের ওপর চাপ পড়ে। তারা খায় কী? পরখ করে দেখুন বাজার ঘুরে, শ্রমজীবী মানুষের জীবনপ্রণালি ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করে, বেতনকাঠামো বিশ্লেষণ করে। আসলে মেহনতি শ্রমিকরা খায় কী? বৃটেনে অন্যান্য জিনিসের তুলনায় খাদ্যদ্রব্যের দাম অনেক কম। এটি ওদের জাতীয় স্বাস্থ্যচেতনার লক্ষণ বলেই মনে হয়। ভালো কিংবা দামি কাপড় না পরলে তেমন কিছু এসে যায় না, তাতে অন্তত স্বাস্থ্য নষ্ট হয় না; কিন্তু ভালো ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব ঘটলে জাতীয় স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে; আর জাতীয় স্বাস্থ্যই যে অধিকতর মূল্যবান এ শুধু এদের ধারণা নয়; বরং এদের রাষ্ট্রীয় দর্শনও এটি। আমাদের উন্নয়নের গল্প সর্বত্র ভেসে বেড়ালেও কুলি-মজুর কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এমন কথা বলা যায় না একটা কারণে, তা হলো খাবার-দাবারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। খাদ্যদ্রব্যের চড়া মূল্যের কারণে উপার্জনহীন অথবা কম উপার্জনের মানুষ পুষ্টিকর খাবারের নাগালই পায় না। মাঝে মাঝে পেশাজীবীদের বেতন বাড়ে, মজুরদের মজুরি বাড়ে। সেই সঙ্গে বহুগুণ পাল্লা দিয়ে বাড়ে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপণ্যের দাম। শহর এলাকায় আবার বাড়তি চাপ হিসেবে দেখা দেয় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা বাড়ি ভাড়া। ফলে মজুরদের জীবনমান বাড়ে না মজুরি বাড়লেও। এছাড়াও বেতনবৈষম্য সমাজ জীবনে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা কোনো অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। পোশাক খাতের শ্রমিকরা যদিও ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছেন; কিন্তু রাষ্ট্রে এখনও অসংখ্য খাত রয়ে গেছে, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট মজুরি নেই। গৃহশ্রম, কৃষিশ্রম, দোকানের কর্মচারীর মতো বিভিন্ন খুচরা শ্রমের কিছু পেশায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য নির্ভর করলেও সেখানে ন্যূনতম মজুরি বা তাদের প্রাপ্য ভাতা-বোনাস, সুযোগসুবিধার আলাপ তোলার কোনো সুযোগই নেই। যেকোনো খাতের একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কত হবে, রাষ্ট্র কর্তৃক এ সীমা ঠিক করে দেওয়ার দাবিটা অনেক দিনের। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত শুধু বিশেষ কিছু খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম ব্যবস্থা করতে পেরেছে। যদিও জাতীয় ন্যূনতম মজুরির দাবিটা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির একটি, যা দিন দিন ধরে উপেক্ষিত। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়ে উঠে, তাদের চাওয়া হলো মানুষের মতো বাঁচতে পারার উপযোগী মজুরি। বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিশ্বে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়া। আর সূচকে এ অঞ্চলের যে আট দেশের তথ্য এসেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ আছে ৭ নম্বরে। আট দেশের মধ্যে সামাজিক খাত ও করনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৪। তবে শ্রমিক অধিকার ও মজুরির ক্ষেত্রে অবস্থান একেবারে শেষে। শ্রম অধিকার নিশ্চিতে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ ১০ দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। শ্রমিক হত্যা, ইউনিয়ন করতে না দেওয়া, আন্দোলন দমনে কঠোর মনোভাব, অনিরাপদ কর্মপরিবেশের মতো বিষয়ের কারণে বাংলাদেশ শ্রমিকদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। এমন তথ্য উঠে এসেছে শ্রম অধিকারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশ নের ২০১৭ শীর্ষক এক জরিপ প্রতিবেদনে প্রতিবেদনে ১৩৯ দেশের শ্রম অধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ছাড়া শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় আছে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কলম্বিয়া, মিশর, ফিলিপাইন, গুয়েতেমালা, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও কাজাখস্তান। প্রতিবেদনে শ্রম অধিকার বাস্তবায়নে একটি দেশের সার্বিক অবস্থান তুলে ধরতে সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ৫ নম্বর দেওয়া হয়েছে। একটি দেশ ৫ নন্বর পেলে ধরে নেওয়া হয়েছে সেখানে শ্রম অধিকার বলতে কিছু নেই। আর ১ নম্বর পাওয়ার অর্থ হলো ওই দেশে শ্রমিকরা মোটা দাগে সব ন্যায্য অধিকার পাচ্ছেন। ২০১৬’র এপ্রিল থেকে ২০১৭’র মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। আইটিইউসির প্রতিবেদন অনুসারে, এক বছরে ১১ দেশে শ্রমিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ ১১ দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। খুন ছাড়াও শ্রমিকদের ওপর সহিংস হামলা, অপহরণ, হুমকি দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও বাংলাদেশে গেল এক বছরে বেড়েছে। শ্রমিকদের ওপর এমন হত্যাবহির্ভূত ঘটনা গেল বছর ঘটেছে ৫৯টি, যা এক বছর আগে ছিল ৫২। আমাদের মতে, আইনের প্রতি সবারই শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। শ্রমিকদের অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে। শ্রমিকরাও নাগরিক, পরিশ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক বা মজুরগিরির বিনিময়ে মজুরি মানে শুধু খেয়ে পরে কোনো মতে বেঁচে থাকা নয়, শ্রমিকরাও মানুষ, মানুষকে বেঁচে থাকতে হবে মানুষের মতো করে, তাই শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নেও রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত মজুরি কাঠামো যদি শ্রমিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়, শুধু বাধ্যবাধকতার কারণে নিয়ম রক্ষার মজুরি বৃদ্ধি কোনো কাজে আসবে না। বরং শ্রমিক অসন্তোষ বাড়বে। উল্লেখ্য জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১০ নম্বর লক্ষ্য হলো, দেশের ভেতরে এবং দেশে দেশে আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমিয়ে আনা। অক্সফাম বলছে, জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩ দেশ ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণে কাজ করার অঙ্গীকার করে। আর বৈষম্য কমিয়ে আনতে না পারলে এসডিজির প্রথম লক্ষ্য অনুযায়ী দারিদ্র্য দূর করা অসম্ভব। আমাদের জাতীয় খাদ্যনীতি-স্বাস্থ্যনীতি কী বলে? শ্রমনীতি কী বলে? শ্রম অধিকার কী বলে? মজুরের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করার বিধান কী? বাস্তবে তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কী? প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কি তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে খবর হয় শ্রমিকরা আন্দোলন করে, মজুরিও বাড়ে; কিন্তু তাদের জীবনমান বাড়ে না কেন? খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন আয়ের শ্রমিকের বা সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থাৎ জাতীয় স্বাস্থ্যচেতনায় কী নিদারুণ প্রভাব ফেলে নীতিনির্ধারকরা কি তা ভেবে দেখেন?

লেখক ও কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত