শিরোনাম

তারাই এগিয়ে নেবেন বাংলাদেশ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ মিলু শামস  |  ০৩:৩৭, জানুয়ারি ১১, ২০১৯

গোল্ডম্যান স্যাস এর ‘নেক্সট ইলেভেন’ এর এগারো দেশের একটি অথবা মার্কিন প্রতিষ্ঠান জে পি মরগানের ‘ফ্রন্টিয়ার ফাইভ’ দেশের একটি ‘বাংলাদেশ’- বলায় অতিশয়োক্তি থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠী এখন অমিত সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একথা সত্য। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা পঁয়ষট্টি ভাগের বয়স এখন পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে। অর্থাৎ সামনের দিনে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার নেতৃত্বে এরাই। বছর কয়েক আগে ঢাকায় এসে ফিলিপ কটলারও সে কথাই বলছিলেন। প্রচ- সম্ভাবনা দেখেছেন তিনি এদের মধ্যে। তার মতে, সামনের বিশ বছরে দেশকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেয়ার জনসংখ্যা সুবিধা ধারণ করছে এরা। পাশা পাশি তিনি শঙ্কার কথাও বলেছিলেন, এ বিপুল তারুণ্য শক্তি মতাদর্শ বা মূল্যবোধের দিক থেকে বিভ্রান্তিতে জড়ালে এরাই ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ পঁয়ষট্টি শতাংশের শ্রেণি অবস্থান এক নয়। এদের মধ্যে মধ্যবিত্ত অংশটি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নানা ধরনের বিভ্রান্তিতে এর মধ্যেই আক্রান্ত। পরিবর্তনের চালিকা হিসেবে কাজ করছে মূলত শ্রমজীবী শ্রেণি। ভেতর থেকে তারাই বদলাচ্ছেন দেশের অর্থনীতির চিত্র। দেশের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস পোশাক শিল্প। প্রায় ছত্রিশ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন এখানে। শতকরা আশি ভাগের বেশি রফতানি আসে শুধু এ এক খাত থেকে। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে যারা অবদান রাখছেন, তারা প্রবাসী শ্রমিক। সাতষট্টি লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন বিভিন্ন দেশে। তাদের পাঠানো আয়ের ওপর নির্ভর করে দেশে আর্থিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রয়েছে। আর ষোলো কোটির দেশটিকে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করে রেখেছেন যারা, সেই কৃষকদের অবদানও মনে রাখতে হবে। তাদের শ্রম বাঁচিয়ে দিয়েছে সরকারের অনেক বৈদেশিক মুদ্রা। অথচ শ্রমিক- কৃষকদের জীবনই এদেশে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন। স্বাস্থ্যহীনতার ঝুঁকি তো তাদের প্রায় নিয়তির মতো, সঙ্গে রয়েছে মৃত্যুঝুঁকি। প্রবাসী শ্রমিকরাও যথেষ্ট নিরাপদ নন। যেসব দেশে তারা যাচ্ছেন, সেসব দেশের আইন-কানুন ভাল করে বুঝে চলার মতো শিক্ষা তাদের অনেকের থাকে না। যে জন্য প্রবাসে প্রায়ই বিপদে পড়তে হয়। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন ঝুঁকিমুক্ত না হলে সামনের সময়ে দেশের অর্থনীতি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ সত্যটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। ভুলে যান সবচেয়ে বেশি তারা, যাদের উদ্যোগে প্রান্তিক মানুষরা শ্রমিক পরিচয়ে বিশেষায়িত হন- অর্থাৎ উদ্যোক্তারা। তারা আরেকটু সহানুভূতিশীল হলে শ্রমিকরা ন্যূনতম সুবিধা নিয়ে জীবন- যাপন করতে পারেন। মালিক- শ্রমিক সম্পর্কের মূলমন্ত্র ‘শোষণ’ প্রক্রিয়া টিকিয়ে রেখেও কি আরেকটু মানবিক হওয়া যায় না? ‘তাজরিন’ নামের পোশাক কারখানার যে ভয়াবহ অবকাঠামো ও মালিক পক্ষের হঠকারিতার খবর আমরা পেয়েছিলাম তাতে বাকরুদ্ধ হয়। ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই সঙ্কেত বেজেছিল। শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরোতে চাইলে আগুন নেভানোর মহড়া চলছে জানিয়ে শ্রমিকদের কাজ করার নির্দেশ দিয়ে মূল ফটকে তালা লাগায় দায়িত্বে থাকা লোকজন। আগুন ছড়িয়ে গেলে ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে সরু সিঁড়ি বেয়ে শ্রমিকরা নিচে নামেন। কিন্তু একটু পরে বুঝতে পারেন মুক্তির পথ ভেবে তারা আসলে এগিয়েছেন মৃত্যু ফাঁদের দিকে। ভেতরের দরজা জালানাবিহীন গুদাম ঘর তখন আগুনের কু-লী। আর তাতে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে একশ’র বেশি শ্রমিককে। গত শতকের সত্তর দশকের শেষদিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শতভাগ রফতানিমুখী ‘দেশ গার্মেন্টস’। উদ্যোক্তা নুরুল কাদির খান গার্মেন্টস পরিচালনায় সহায়তা নিয়ে ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ো করপোরেশন থেকে। প্রথম পদক্ষেপের মাত্র তিন বছর পর গার্মেন্টসের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত চল্লিশটিতে। পরের তিন বছরে তা দ্রুত বেড়ে হয় পাঁচ শ’ সাতাশটি। তিরাশি- চুরাশি সালে পোশাক রফতানি করে আয় হয়েছিল নব্বই কোটি ডলার। বৃদ্ধির হার দু’হাজার কোটির ঘর ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। উদ্যোক্তার সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। মাত্র তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পাওয়া একটি শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের আরও বেশি দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা চীনের পাশা-পাশি এখন বাংলাদেশের দিকে চোখ রাখছেন। সস্তায় প্রচুর তরুণ শ্রমিক পাওয়া যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের সামনে এখন শ্রমিকদের সম্ভাবনার দরজা আগের চেয়ে সত্যিই অনেক বেশি অবারিত। সে দরজায় পা রাখতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশা-পাশি শ্রমিকদের সুবিধা দেখা শুধু জরুরি নয় অবশ্য করণীয়। বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে তার গতি স্বচ্ছ রাখতে দেশের ভিত্তি যারা মজবুত করছেন তাদের জীবনমান বাড়াতে না পারলে যত ভাল প্রতিবেদনই আসুক তা শুধু কাগুজে দলিল হয়েই থাকবে। মনে রাখতে হবে,পঁয়ষট্টি শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এরাই বড় অংশ। বাকি মধ্যবিত্ত অংশের চেতনার বিকাশ জরুরি। শিক্ষিত বিকশিত মেধাবী প্রজন্মের পক্ষেই স্থূল রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে দেশকে বের করে আনা সম্ভব। তাদের নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণির চেতনার স্তরও বাড়বে। এ দু’দিকের ভারসাম্য নিপুণভাবে ধরতে পারলে আগামি বিশ বছরে বাংলাদেশ সত্যিই সমৃদ্ধির পথে এগুবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত