শিরোনাম

সোনালি অতীত প্রয়াতদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১১:২৪, জানুয়ারি ০৩, ২০১৯

বিদায় নিলো ২০১৮, হারিয়ে গেলো কালের গর্ভে। কিন্তু একেবারে শেষ সময়টায় তুলে নিলো বেশ ক’জন শ্রদ্ধেয় বাঙালি ব্যক্তিত্বকে, যারা শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় কালজয়ী সৃষ্টির স্বাক্ষর রেখে আমাদের সমৃদ্ধ ও কৃতজ্ঞ করে গেছেন। সবশেষে, বছরের একেবারে প্রান্তসীমায় চোখের আড়াল হলেন চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। তাঁর আগে আমরা হারালাম চিত্রশিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর, সঙ্গীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ও কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে। এরা প্রত্যেকেই দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন, পরিণত বয়সেই তাঁদের প্রস্থান। কিন্তু এটা তো অনস্বীকার্য যে যারা সৃষ্টিশীল, যাদের সৃষ্টিকর্ম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে নিয়ে যায় শিল্পসুধা ও শিল্পসৃষ্টির প্রেরণা- তাদের প্রস্থান সব সময়েই অকাল প্রয়াণ। তাই এই অপূরণীয় ক্ষতি প্রতিটি সচেতন বাঙালির হৃদয়েই শোকের অনুরণন তুলে যায়। একটি জাতির শিল্পকলা-চলচ্চিত্র সঙ্গীত তথা সমগ্র সংস্কৃতির ভিত নির্মাণ ও তার ঋজুতা দানের জন্যে কাজ করে থাকেন খুব অল্প ক’জন ব্যক্তিত্ব। মৃণাল সেন এবং তাঁর কালের আরও দুই গুণী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটক বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ছিলেন তেমনি কালজয়ী স্রষ্টা। তাদের নির্মাণ বিশ্বমানের। একইভাবে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও বাংলা কবিতায় একজন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে প্রোথিত করেছেন তার শিল্প-স্বাক্ষর। চিত্রশিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর বাংলাদেশের শিল্পকলা ভবনের গোড়াপত্তন ও তার আধুনিক বিস্তারে ভূমিকা রেখেছেন একজন অগ্রণীর মতোই। আর সঙ্গীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় একজন ‘আদি’ রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী এবং পরে আধুনিক গানের গায়কপাখি হিসেবে বাঙালি সমাজে প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন। বিশ্বব্যাপী বাংলা প্যারালাল বা সমান্তরাল সিনেমাগুলোর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দূত হিসেবে বিবেচিত মৃণাল সেন। তিনি মার্কসবাদী দর্শনের অনুসারী ছিলেন। আজীবন বামপন্থায় বিশ্বাসী মৃণাল সেন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সাংস্কৃতিক কর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বকীয় শিল্প-সত্তার অধিকারী মৃণাল সেনের প্রতিটি চলচ্চিত্রই মানবসমাজের জন্য এক গভীর শিক্ষা। পেশাদার গায়ক হিসেবে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় প্রায় দেড় হাজার গান রেকর্ড করেছেন। এর মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত ৮০০। আরেক কিংবদন্তি সঙ্গীতব্যক্তিত্ব সলিল চৌধুরীর সঙ্গে জুটি বেঁধে একের পর এক অনবদ্য সৃষ্টি এবং গণনাট্য সংঘের হয়ে কাজ করেছেন তিনি। ঢাকায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও অন্যান্য শিল্প-শিক্ষকের হাতে যে-চিত্রশিক্ষার সূচনা তারই প্রথম দিককার শিক্ষাপ্রাপ্ত শিল্পীদের একজন সৈয়দ জাহাঙ্গীর। শিল্পকলা একাডেমিতে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বড় অর্জন এশীয় দ্বিবার্ষিক শিল্পকলা প্রদর্শনীর আয়োজন। ফলত দু’বছর অন্তর এশিয়ান শিল্পীদের শিল্পকর্ম দেখার সুয়োগ ঘটছে বাংলাদেশের শিল্পীদের। এর মাধ্যমে ভিনদেশি শিল্পীদের সঙ্গে আমাদের শিল্পীদের ভাব বিনিময়ের সহজ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কবি। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি তরুণ নীরেন্দ্রনাথের ‘শহীদ রামেশ্বর’ কবিতা চিনিয়ে দিয়েছিল তাঁর প্রতিবাদী মন ও সঙ্গত সাহস। তিনি ছিলেন মননশীল আধুনিক নাগরিক, যার ছিল ছন্দোবিভা, শিল্পডুবুরির দীক্ষা, শব্দ-ওজস্বিতা এবং প্রকৃত সংবেদী মন। নিজের কালকে তারা সমৃদ্ধ করেছেন, কালোত্তর প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন উত্তরাধিকার। বলা নিষ্প্রয়োজন, তাঁদের বিদায় যুগের অবসানই হয়েছে। যদিও যুগ-যুগান্তরে রয়ে যাবে তাদের অবদান। তাদের মাপের ও উচ্চতার বাঙালি শিল্পসাধক ও গায়ক পেতে হয়তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বহুকাল। কাল কখনোই সম্পূর্ণরূপে শূন্য থাকতে পারে না। সেটি নিশ্চয়ই পূর্ণ হবে, কিন্তু প্রকৃত পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য এই প্রয়াত দিকপালেরাই বিবেচিত হবেন প্রেরণা ও পথিকৃৎরূপে। সদ্যপ্রয়াত এই চার গুণীজনের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ভালোবাসা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত