শিরোনাম

অটিজম ও বাংলাদেশ

প্রিন্ট সংস্করণ॥মো. মাইদুল ইসলাম প্রধান  |  ০১:৪৪, অক্টোবর ১১, ২০১৮

বাংলাদেশে অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কিছুসংখ্যক বেসরকারি সংগঠন কাজ শুরু করে আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে। তখন অটিজম বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা ও জাতীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কাজটি সহজ ছিল না। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই যাত্রায় শরিক হওয়ার পর থেকে এই ধরনের প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কার্যক্রম এক নতুন আলোর সন্ধান পায়। ২০১১ সালে বিশ্বনন্দিত অটিজম বিশেষজ্ঞ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। তখন থেকেই অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও উন্নয়নে বাংলাদেশ এগিয়ে যায়। ১৪টি মন্ত্রণালয় নিয়ে গঠিত হয়েছে জাতীয় টাস্কফোর্স। ৮টি মন্ত্রণালয়/ বিভাগ এর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি। এর মধ্যে প্রথম সারির ৫টি হলো সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ, শিক্ষা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বেসরকারি পর্যায়েও অনেক বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠান অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করতে উৎসাহী হয়েছে। (অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন কখনো সরাসরি, কখনো ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সকল জাতীয় কর্মকা-ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।) অটিজম কোনো রোগ নয় এটি শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশজনিত একটি সমস্যা যা শিশুর সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করে। অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুর চেহারা হয় স্বাভাবিক সুন্দর, কিন্তু সে তার মা বাবা বা আপনজনের ডাকে সাড়া না দিয়ে নিরব থাকে। এ ধরনের শিশুদের নিয়ে মা-বাবাকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এ ধরনের শিশুর জন্মের জন্য পিতা মাতাকে সবসময় দায়ী করা যায় না। কি কারণে অটিজম বৈশিষ্ট্য নিয়ে শিশুর জন্ম হয় বিজ্ঞানীরা তা নির্ণয় করতে আজও সক্ষম হয় নি। অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১‘ এবং ‘নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১‘ নামে দুটি আইন প্রণয়ন করেছে। ট্রাস্ট আইনের অধীনে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে এ বোর্ডের অনুকূলে ইতোমধ্যে একত্রিশ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়। পর্যায়ক্রমে এ তহবিলকে একশত কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রচেষ্টা চলছে। এ তহবিলের অর্থ থেকে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ক্যাম্পাসে অটিজম রিসোর্স সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত সেন্টার থেকে অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, ফিজিওথেরাপি, কাউন্সিলিং বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় ১০৩ প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুদের ডায়াগনসিস করে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে প্রেরণ করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে থেরাপিউটিক, কাউন্সিলিং ও রেফারেল সেবা এবং সহায়ক উপকরণ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া উক্ত কেন্দ্র হতে কৃত্রিম অংশ, হুইল চেয়ার, সাদাছড়ি, সেলাই মেশিনসহ সহায়ক উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। দেশে প্রতিবন্ধীদের পরিচয়পত্র প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩ ডিসেম্বর ২০১৫ আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় পত্র প্রদান কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এ পরিচয় পত্রের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। বাংলাদেশ সরকার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশুসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের কল্যাণে প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা ভাতা চালু করেছে। জনপ্রতি মাসিক ৫০০ টাকা হারে ছয় লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া ষাট হাজার প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা মাসিক ৫০০ টাকা হারে, উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ৬০০ টাকা হারে, কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ৭০০ টাকা হারে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ১২০০ টাকা হারে শিক্ষা উপবৃত্তি পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিউরো-ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম এর মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তারদের অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ ১৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ১৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করে অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল সমস্যাজনিত শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিবছর অটিজমে আক্রান্তের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঊধৎষু উবঃবপঃরড়হ, অংংবংংসবহঃ ধহফ ঊধৎষু ওহঃবৎাবহঃরড়হ নিশ্চিত করার জন্য ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে একটি করে, ‘অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী (এনডিডি) কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছে। অটিজম বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণে অটিস্টিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি তাদের মাতা-পিতা ও অভিভাবককেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এ সকল প্রশিক্ষণ পরিচালনায় অটিজম বিষয়ে দক্ষ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চিকিৎসক, এনজিও প্রধানসহ ভিন্ন ভিন্ন পেশায় দক্ষ প্রশিক্ষকবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। দেশের অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি ট্রাস্টি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ‘নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩’ সরকার প্রণয়ন করেছে। এ আইনের আওতায় নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যথা অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ট্রাস্ট কাজ করে যাচ্ছে। নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩ এর ধারা ৮ অনুসারে জুন ২০১৪ সনে সরকার ‘নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট বোর্ড’ নামে একটি বোর্ড গঠন করেছে। শিশুদের অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যার চিকিৎসাসেবা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জানুয়ারি-২০১৫ তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিসঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অটিজম ও স্নাযুবিকাশজনিত সমস্যা সম্পর্কে দেশের জনগণকে অধিকতর সচেতন করার লক্ষ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিতব্য উপকরণাদি সমগ্র, নির্বাচনসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এজন্য জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক ন্যাশনাল সেলিব্রেটিদের মধ্যে থেকে কয়েকজন সেলিব্রেটিকে অটিজম অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নির্বাচন করা এবং নির্বাচিত ন্যাশনাল সেলিব্রেটিদের দিয়ে ফিলার নির্মাণ কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অটিজম ও স্নাযুবিকাশসহ আপামর সকল শিশুর উন্নয়ন ও কল্যাণে সমাজের সকল স্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। অটিজম শিশুদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ তাদের অধিকার ও উন্নয়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অটিজমের লক্ষণ সমূহের বিষয়ে সকলকে সচেতন হতে হবে যাতে করে শৈশবেই ডায়াগনোসিস হয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় আনার চেষ্টা করা যায়। সর্বোপরি এরা সমাজের বোঝা নয় বরং সঠিক পরিচর্যা পেলে তারাও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উন্নয়নের মূলধারায় তাদেরকেও সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। (পিআইডি প্রবন্ধ)
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত