শিরোনাম

তৃণমূলের রাজনীতি : এগিয়ে আছেন শেখ হাসিনা

প্রিন্ট সংস্করণ॥বিভুরঞ্জন সরকার  |  ০১:৪৯, আগস্ট ২১, ২০১৮

দিন তিনেকের জন্য ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম, সর্ব উত্তরের ছোট্ট জেলা পঞ্চগড়ে। পঞ্চগড় আমার নিজের জেলা। ফলে পঞ্চগড় নিয়ে আমার আবেগ ও অনুভূতি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। হিমালয়ের কাছাকাছি বলে পঞ্চগড়ের প্রকৃতি ও পরিবেশ মোহনীয়। চা-চাষ এবং বাংলাবান্ধা স্থলসীমান্ত বন্দরের কারণে পঞ্চগড় এখন অনেকেরই মনোযোগ কাড়ছে। সড়কপথে দার্জিলিং-শিলিগুড়ি কিংবা ভুটান, নেপাল ভ্রমণে আগ্রহীরা বাংলাবান্ধা সীমান্ত বন্দর ব্যবহার করছেন। ফলে পঞ্চগড় এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এই জেলার মানুষ রাজনীতি সচেতন। একসময় বাম আন্দোলন তথা কৃষক আন্দোলনের জন্য পঞ্চগড়ের কয়েকটি এলাকা ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। তাছাড়া ছোট্ট এই জেলা থেকেই দেশ পেয়েছে জাতীয় পর্যায়ে কয়েকজন নেতা। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার হয়েছিলেন এই জেলার সন্তান গমির উদ্দিন প্রধান। গমির প্রধানের পুত্র শফিউল আলম প্রধানও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক আলোচিত-সমালোচিত নাম। স্বাধীনতার পর তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিলেও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় তিনি মুক্তিলাভ করে আমৃত্যু আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি করেছেন, বিএনপির সঙ্গে হেঁটেছেন। এই জেলার আরো দুই কৃতী রাজনীতিবিদ মির্জা গোলাম হাফিজ এবং ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। মির্জা গোলাম হাফিজ একসময় বাম রাজনীতি করলেও পরে বিএনপিতে যোগ দেন। তার বাড়ি আটোয়ারী উপজেলায়। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারও বাম দিয়ে রাজনীতি শুরু করে বিএনপিতে গিয়ে স্থির হয়েছেন। তিনিও স্পিকার এবং মন্ত্রী হয়েছিলেন। বর্তমানে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য। তিনি তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুরের মানুষ। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য এবং জাতীয় রাজনীতির একসময়ের উজ্জ্বল নক্ষত্র মোহাম্মদ ফরহাদও পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার মানুষ। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ভাষা আন্দোলনের সাড়া জাগানো প্রথম একুশে সংকলন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’র প্রকাশক মোহাম্মদ সুলতানের বাড়িও বোদা উপজেলায়। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের একসময়ের ডাকসাইটে নেতা অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম এবং এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাজমুল হক প্রধান, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজনও পঞ্চগড়ের অধিবাসী। পঞ্চগড় জেলা হিসেবে ছোট হলেও এই জেলার একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। আমি যেহেতু ঢাকায় থাকি, সাংবাদিকতা করি, সেহেতু বাড়ি গেলে স্বাভাবিকভাবেই নানা বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করি, তার মধ্যে রাজনীতি অনিবার্যভাবেই এক বড় অংশজুড়ে থাকে। মাত্র তিনদিন বাড়িতে থাকলেও এবার বেশ ঘোরাঘুরি করেছি, নানা শ্রেণি-পেশা এবং নানা বয়সী মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তাতে তৃণমূলের রাজনীতি সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছি সেটাই আজ পাঠকদের জানাতে চাই। পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত পঞ্চগড়ে জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা দুটি। তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় ও আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড়-১ আসন এবং বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড়-২ আসন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পঞ্চগড় -১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা নাজমুল হক প্রধান। তিনি জাসদের মশাল মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তার সঙ্গে মহাজোটের প্রার্থী ছিলেন জাতীয় পার্টির আবু সালেক। আওয়ামী লীগের কোনও প্রার্থী ছিল না। পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, নির্বাচন করেই জিতেছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাসদের এমরান আল আমিন। আগামী নির্বাচনে কোন দলের অবস্থা কেমন- এই প্রশ্ন অনেকের কাছেই করেছিলাম। সরাসরি উত্তর না দিয়ে উল্টো আমাকেই কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, নির্বাচন কি হবে? হলে কেমন নির্বাচন হবে? সবাই কি ভোট দিতে পারবে? কেউবা জানতে চেয়েছেন, বিএনপি কি নির্বাচনে অংশ নেবে? আবার কেউবা অত্যন্ত স্পষ্ট করেই বলেছেন, পরিস্থিতি এখন আওয়ামী লীগের অনুকূলে। বিএনপি মাঠে নেই। আওয়ামী লীগই আগামী বারও ক্ষমতায় যাবে- সেটা যে প্রক্রিয়ায়ই হোক না কেন! সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি ভালো করবে বলে একটি প্রচারণা দীর্ঘদিন ধরেই চালানো হচ্ছে। কিন্তু এবার আমি তৃণমূলে দেখলাম, মানুষ ভোটের বিশুদ্ধতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরা নিয়ে মোটামুটি সন্দেহমুক্ত। তবে মানুষ যে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে সেটাও মানুষের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যাচ্ছে। ভালো মানুষ আর রাজনীতি করেন না অথবা রাজনীতিতে ভালো মানুষের জায়গা নেই- এমন আক্ষেপ অনেকের মুখেই শোনা যায়। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় রাজনীতি নিয়ে হতাশাই প্রকাশ করেন। দু-একজন বললেন, দেশে কোনও রাজনীতি নেই, আছে দুর্নীতি আর দলাদলি, রেষারেষি। স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি দলের কারো কারো বিরুদ্ধে মানুষের প্রচ- ক্ষোভ। কারা কী পরিমাণ দুর্নীতি করেছেন, আগে কার কী ছিল আর এখন কী হয়েছে তা নিয়ে যেকোনও জমায়েত ও আড্ডায় মুখরোচক আলোচনা শোনা যায়। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আগামী নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে কেউ কেউ মনে করেন। আবার কেউ মনে করেন, দুর্নীতি এখন কোনও ইস্যু নয়। এটা সবার গা-সহা হয়ে গেছে। নির্বাচনে জিতে বা অন্য কোনোভাবে ক্ষমতাবান হয়ে কেউ দুর্নীতিমুক্ত থাকবেন- এটা এখন সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেক মানুষের এখন প্রত্যাশা বরং এমন: দুর্নীতি হোক, তবে সেটা সীমিতমাত্রায় এবং একই সঙ্গে কাজটাও হোক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তাদের তৎপরতা দৃশ্যমান। তবে সাংগঠনিকভাবে দলটি শক্তিশালী বলে অনেকেই মনে করে না। থানা-পুলিশ, সরকারি অফিসে ধরনায়-তদবিরে সরকারি দলের নেতারা ব্যস্ত। দলীয় কার্যক্রম সীমাবদ্ধ বিভিন্ন দিবস পালন কিংবা সরকারি অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণের মধ্যে। অন্যদিকে বিএনপির অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় না। পঞ্চগড়ের দুই আসনেই একসময় বিএনপি জিতেছিল। বিএনপির সেই সুদিন আর আসবে বলে অনেকেই মনে করে না। তবে প্রকাশ্যে না হলেও জামায়াতে ইসলামী ভেতরে ভেতরে তৎপর। কেউ কেউ মনে করেন, পঞ্চগড় জেলায় এখন সবচেয়ে সংগঠিত দল হলো জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত নানা কৌশলে মানুষের কাছে যাচ্ছে। জামায়াতের নারী কর্মীরাও বসে নেই। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য অনেকেই নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছেন। বর্তমান দুই সংসদ সদস্য তো আছেনই, তার সঙ্গে আরও অনেক নতুন নাম শোনা যাচ্ছে। জোট -মহাজোটের সমীকরণে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ঢোলে বাড়ি পড়েছে, নাচতে শুরু করেছেন অনেকেই। পঞ্চগড়-১ আসনের বর্তমান এমপি নাজমুল হক প্রধান এখন জাসদ একাংশের সাধারণ সম্পাদক। গত নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয় অর্জন করেছেন। তাই ১৪ দল বা মহাজোটের মনোনয়ন এবার তারই প্রাপ্য বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা আগামীতে প্রার্থী হওয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। সাবেক এমপি মাজহারুল হক প্রধান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদাত সম্রাট, ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ টু আই কর্মসূচির কর্মকর্তা নাইমুজ্জামান মুক্তা এবং মির্জা গোলাম হাফিজের জামাতা ও শিল্পপতি মনির হোসেন মাঠে রয়েছেন। প্রচার-প্রচারণায় কিছুটা নতুনত্বের কারণে নাইমুজ্জামান মুক্তা সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন বলে অনেকের কাছেই শুনলাম। বিএনপির প্রার্থী হিসেবেও কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, তার ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির এবং পৌরসভার চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলাম। এখানে জামায়াত এবং জাতীয় পার্টিরও প্রার্থী আছে। পঞ্চগড়-২ আসনের বর্তমান এমপি নুরুল ইসলাম সুজন কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন বলে শোনা যায়। এলাকায় তার একটি প্রবল বিরুদ্ধ পক্ষ থাকলেও মনোনয়নের দৌড়ে সম্ভবত তিনিই এগিয়ে। বোদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আলম টবি মনোনয়ন চাইবেন, কিন্তু সুজনের প্রতি যে কেন্দ্রের সমর্থনের পাল্লা ভারী সেটাও তিনি জানেন। দেবীগঞ্জ উপজেলার অধিবাসী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান এলাকায় কিছু দৌড়ঝাঁপ করলেও তাকে নিয়ে তেমন আগ্রহ তৈরি হয়নি। জাসদের একাংশের প্রার্থী হিসেবে গত নির্বাচন থেকেই মাঠে আছেন এমরান আল আমিন। তিনি কলেজ শিক্ষক। সৎ ও ভালো মানুষ বলে পরিচিত। তবে ভোটে জেতার অবস্থা তার আছে বলে কারও কাছে জানা গেলো না। বিএনপির প্রচুর সমর্থক-শুভানুধ্যায়ী থাকলেও সাংগঠনিকভাবে তাদের অবস্থা এখন নাজুক। ফরহাদ হোসেন আজাদ নামের এক যুবদল নেতা ঢাকা থেকে মাঝেমাঝে এলাকায় গিয়ে কিছু মহড়া দেন। এতে তার জনপ্রিয়তা নাকি জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ছে- সে প্রশ্নও উঠছে। তার ব্যাপারে স্থানীয় বিএনপি নেতারাও খুব উৎসাহী বলে মনে হয় না। শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান জুঁই পঞ্চগড়ের যেকোনও একটি আসন থেকে বিএনপির সমর্থনে ভোট করতে চান। তিনিও এলাকায় যাতায়াত করছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, বোদা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. সফিউল্লাহ সুফিকে বিএনপি জোটের প্রার্থী করা হলে ভোটযুদ্ধ আকর্ষণীয় হবে। সুফি জামায়াতের নেতা। তিনি ‘জনপ্রিয়’ বলে মনে করা হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মানুষের ক্ষোভ-অভিমান থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি মানুষের সমর্থন অটুট আছে বলেই আলাপ-আলোচনায় মনে হলো। কিছু মানুষ যেমন পরিবর্তন চায়, তেমনি অনেকেই আবার উন্নয়ন চায়, সমৃদ্ধি চায়, শান্তি চায়। কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেও শারীরিক অবস্থার কারণে আর রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন কিনা তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই সংশয় আছে। তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করায় বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার পথ দীর্ঘ হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। কথায় আছে- মানুষের মুখেই জয়, মানুষের মুখেই ক্ষয়। তৃণমূলে মানুষ সবকিছু দেখছেন, তবে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে মানুষ এখনও কোনও মনস্থির করেনি। ঝুঁকে আছে আওয়ামী লীগের দিকে, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে শেখ হাসিনার দিকে। লেখক: কলামিস্ট
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত