শিরোনাম

‘প্রেমে সুখ-দুখ ভুলে তবেই সুখ পায়’

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফেরদৌসি বিকন  |  ০১:২৯, আগস্ট ১০, ২০১৮

পাঠক ছাড়া গ্রন্থ যেমন মূল্যহীন, নিরর্থক, তেমনি পাঠক ছাড়া লেখকও অসহায়, বিপন্ন। লেখক ও পাঠকের সম্পর্ক যদি হয় ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গ, তাহলে গ্রন্থ হয় সার্থক আর লেখক হন জ্যোতিষ্মান। ‘সকলেরই স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। সেদিক থেকে বিচার করলে একজন লেখক ও সেই অধিকারের বাইরে নয়। একজন লেখক যা অনুভব করবে তাই লিখার স্বাধীনতা তাঁর থাকা চাই।’ শিক্ষার সর্বোত্তম বাহন বই, আর বই হলো একজন লেখকের সৃষ্টিশীল স্থিতিমান অস্তিত্বশীলতার প্রতীক। একজন লেখক আর একজন পাঠকের সম্পর্ক তাই নিঃসন্দেহে শিক্ষা ও সাহিত্যাঙ্গনের অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ একটি অংশ। মানবজীবনের সে সম্পর্কই অনড় ও অচপল যা জীবনের অনন্তপ্রবাহী পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েই সানন্দে বিকশিত হয়। পরিবর্তনই জীবনের নীতি, মানুষের গতি। দৈনন্দিন জীবনের গতিময়তার আবর্তে আবর্তিত প্রতিটি অতি সাধারণ মানুষের-পাঠকের দৃষ্টিসীমার অন্তরালেই লুকিয়ে থাকে, ঘুমিয়ে থাকে একজন স্বাধীন, স্বতঃস্ফূর্ত, অসাধারণ প্রতিভাবান লেখক। কেউ কেউ সে ঘুমন্ত মানুষটির ঐশ্বর্যময় আহ্বান পায়, কেউ পায় না। কেউ সে আহ্বানে সাড়া দেয়, কেউ দেয় না। আবার কারো মধ্যে সে লেখক পরিপূর্ণ সাবলীলতা ও সমস্ত শক্তি নিয়েই জেগে ওঠে। পৃথিবীর বিখ্যাত লেখকেরা কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও সেই ঘুমন্ত মানুষটিকে তুষ্ট করতেই ব্যস্ত ছিলেন। জগতের সকল চাওয়া-পাওয়া, আরাম-আয়েশ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে তুচ্ছ করে তাঁরা মেতে ছিলেন সেই স্বপ্নের দেশের, স্বপ্নিল মানুষটির আলো আঁধারের খেলায়। জগত ও জীবনের স্থিতি সম্পর্কে একজন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের সাথে শিক্ষা, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার দ্বারা যুগোপযোগী, উন্নত পরিশিলিত এবং মার্জিত হবার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য অথবা পাঠককে তুষ্ট করতে লেখকের মননশীলতার অভিরুচি এবং চিন্তাশক্তির উথকর্ষ যদি কোন নির্ধারিত গ-ির সীমাবদ্ধতায় বা কোন নির্দিষ্ট তত্ত্ব বা মতবাদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তা সুস্থ, সাবলীলভাবে বিকশিত হবার পথে বাঁধাগ্রস্ত হয়। কারণ যেকোন সাধারণ মানুষের মতো একজন লেখকের মানসিক অবস্থা, বিশ্বাস, অনুভূতি ও অতীত অভিজ্ঞতা তাঁর মনোভাবের জন্ম দেয়। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞতা, আলোচনা সমালোচনা ইত্যাদি দ্বারা মনোভাব প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হতে পারে। মনোভাব কোন বস্তু বা বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে সংগঠিত হয় এবং ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয়ই হতে পারে। মানুষের বিশ্বাস যেমন পরিবর্তনশীল তেমনি অবস্থার পরিপেক্ষিতে মনোভাবেরও পরিবর্তন বা রূপান্তর সম্ভব। ধ্রুপদী রীতির প্রবর্তক ত্রিশ দশকের আধুনিক কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের লেখার বহুল উদ্ধৃত একটি অংশ- ‘লেখক কি অধোগতির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসবেন? নাকি পাঠক ঊর্ধ্বগতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাবেন?’ তার মানে, হয় লেখককে তাঁর চিন্তা প্রকাশের ক্ষমতা ছাড় দিয়ে, তাঁর নিজ অবস্থান থেকে পাঠকের উপলব্ধি ক্ষমতার কাছাকাছি নেমে আসতে হবে, নতুবা পাঠককে স্ব-অবস্থান থেকে আরো বেশি পঠন-পাঠনের মাধ্যমে লেখকের বোধ ও চিন্তার কাছাকাছি উঠে আসতে হবে! স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে, ‘অধোগতির সিঁড়ি বেয়ে’ নিচে নামা লেখকের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ সমকালীন পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য বাকি বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে তালহীন চলা ও আগামী দিনের পাঠকের কাছে নিজের চিন্তাকে দীনহীনভাবে উপস্থাপন করা কোনো দূরান্বয়ী লেখকের কাজ হতে পারে না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, লেখক ও পাঠকের দূরত্ব ঘোচাতে এখন পাঠকই একমাত্র ভরসা। তাদেরই ‘ঊর্ধ্বগতির সিঁড়ি বেয়ে’ ওপরে উঠতে হবে। আর এই প্রক্রিয়া হবে ক্রমাগতভাবে নতুন চিন্তা চেতনাকে গ্রহণ করার মধ্যে দিয়ে। ক্লাসিক্যাল দর্শনে আলোচ্য বিষয়ে পাক্ষিক-বিপাক্ষিক দুটি স্থান নির্ণয় করা হত। তারপর তর্ক বিতর্ক ও আলোচনার পরে উল্লেখিত দুই স্থানের মধ্যবর্তী আরেকটি নতুন স্থান পাওয়া যেত। এই তৃতীয় স্থানটিকে পূর্বের দুই স্থানের সমন্বয় বলা যেতে পারে। আলোচনার শুরুতে যা নিয়ে আলোচনা শুরু করা হত, সেটিকে বলা হত পূর্বপক্ষবাদ, আর এর মোকাবেলায় দ্বিতীয় যে স্থানটি আসত সেটিকে বলা হত প্রতিবাদ। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উপলব্ধি করা হয়। যে স্থানটি মীমাংসিত হয়ে এল অর্থাৎ যে নতুন ধারণায় উপনীত হওয়া হল, তাও কিন্তু শেষ কথা হয়ে থাকবে না। আগামীতে এই নতুন ধারণা সমন্বিত করার মধ্য দিয়ে আরেকটি প্রতিবাদের জন্ম হবে আর এভাবেই চিন্তার উৎকর্ষ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ক্লাসিক্যাল দর্শনে এই ধরনের ‘চিন্তা-ব্যবস্থা’র নাম দ্বান্দ্বিক ব্যবস্থা। একটি সমাজ ব্যবস্থাও এই দ্বান্দ্বিক চিন্তাধারার মধ্যে দিয়েই তার সামাজিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধ মীমাংসা করে ‘প্রগতির’ পথে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ একটি সমাজের পরের অবস্থান তার পূর্ববর্তি সামাজিক অবস্থান থেকে অধিক উন্নত। আর এই চিন্তাও আগের চিন্তাধারার তুলনায় নতুন বলে ধরা যেতে পারে। সুতরাং চিন্তার উথকর্ষ, উন্নতি ও প্রগতির পথকে উপেক্ষা করে কেবল ভক্ত পাঠকের মন যোগানো একজন বলিষ্ঠ লেখকের লক্ষ্য হতে পারেনা। সাময়িক জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি, অসংখ্য বই বিক্রি করে অর্থলাভ করা ইত্যাদি যেসব লেখকদের লক্ষ্য তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠকের মন যুগিয়ে লেখার কথা হয়তো ভেবে থাকেন, কিন্তু এতে তাঁদের ভক্ত পাঠকের গভীর চিন্তার খুঁটিটি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আর এর প্রমাণ হলো সেকেলে বাঙালি পাঠক ও আজকের বাঙালি পাঠকের অনুভবের গভীরতার পার্থক্য। সেদিনের লেখকেরা কম্প্রোমাইজ করে লিখেননি আর তার মূলে কেবল লেখক একাই নন, পাঠক ও গুরুতপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সেদিনের একজন খ্যাতিমান লেখকের একজন পরিপূর্ণ লেখক হয়ে ওঠার পিছনে ছিলো লেখকের নিজস্ব সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, উদার, প্রাণবন্ত হৃদয়ের প্রতিটি সুস্থ অনুভূতির সুষ্ঠু উপলব্ধির প্রয়াসের মাধ্যমে সেই উপলব্ধিকে প্রকাশের পারিপার্শ্বিকতা ও সেই সাথে ছিল লেখকের চিন্তা চেতনাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করার মতো মার্জিত, সুশীল, শিক্ষিত, যোগ্য একদল পাঠক। একজন যোগ্য, সত্যনিষ্ঠ লেখক যা মানুষের জন্য উত্তম, সমাজের জন্য কল্যাণকর তাই লিখবেন। তাঁর লেখা গোটা সমাজকে পরিবর্তন করবে। মানুষকে নিয়েই একটি সমাজ গঠিত হয়। সামাজিক মানুষ যদি পরিবর্তনকে আহ্বান না করে, একজন লেখক তাঁর কলমের আঁচড়ে মানুষের হয়ে সেই আহ্বান করবেন এতেই স্বাভাবিক। লেখকের সেই আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার পাঠকের নিশ্চয়ই আছে। সমালোচনার মাধ্যমে লেখকের সেই আহ্বানের কার্যকারিতা, সীমাবদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য একদল সৃজনশীল সমালোচক ও গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু একজন লেখকের সেই পরিবর্তনের আহ্বানের ডাক দেবার অধিকার হরণ করে নেবার স্বাধীনতা পাঠক কিংবা সাধারণ মানুষের কারোই থাকা উচিৎ নয়। যদিও একজন লেখকের সে অধিকার নিশ্চিত করনের দায়িত্ব থাকে রাষ্ট্রের হাতে, কিন্তু একজন সুবুদ্ধিসম্পন্ন, শিক্ষিত, যোগ্য পাঠকের একটি বিশৃঙ্খল সমাজে বাস করেও সে দায়িত্ব নিজগুণে অর্জন করা চাই। এখানেই একজন সুশিক্ষিত ও একজন শিক্ষিত মানুষের তফাৎ হয়। এখানেই একদল লেখক ও একদল পাঠক একযোগ হয়ে বিশৃঙ্খল সামাজিক গন্ডির ঊর্ধ্বে উঠে আসবেন এবং সেইসাথে পিছনে পড়ে থাকা একদল নির্বোধ মানুষকে সেই গ-ি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান করবেন। মতামত প্রকাশের বা আলোচনা সমালোচনা করার স্বাধীনতা সব মানুষেরই আছে। তবে মনে রাখতে হবে সৃজনশীল মানুষদের সেই সমালচনাকে সুরে বেঁধে নিতে হয়। শিক্ষিত এবং সৃজনশীল মানুষ মাত্রই সেই সুরের ঘাটে ঘাটে তার সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গিকে সেধে যাবে। এখানেই তাদের সাথে অশিক্ষিতের তফাৎ হবে। আমাদের সমাজে মানুষের অনুভুতি অত্যন্ত দুর্বল। প্রায় পাঠকই পুরো লেখা পড়ে তাঁর মতবিরুদ্ধ একটি নির্দিষ্ট লাইনকে টার্গেট করেন, লেখার অন্তর্নিহিত ভাব ও গভীরতর অনুভবকে উপলব্ধি করেন না। লেখা এবং পড়া অত্যন্ত কঠিন সাধনা এবং মুহূর্তে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা প্রায় অসম্ভব। যেকোন অর্থবহ কাজের মতোই এখানেও ক্রমাগত মানসিক সংযুক্তির প্রয়োজন হয়। একজন সুষ্ঠু, বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদী পাঠকের কেবল গ্রন্থ নয়, লেখক সম্পর্কেও স্পষ্টতর ধারণা থাকা চাই। পাঠককে জানতে হয়, লেখক অতীতে কিরকম মনোভাব প্রকাশ করেছেন, অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে তাঁকে যাচাই করতে হবে, একটা লেখা দিয়ে নয়। যিনি অতীতে নারী-পুরুষের পক্ষে লিখলেন সেই একই লেখক যদি আজ তাঁদের বিপক্ষে দাঁড়ান তাহলে বোঝা উচিৎ নারী-পুরুষ উভয়ের দোষগুলোকে তুলে ধরাও একজন লেখকের স্বাভাবিকতা। অনেকে পাঠকই লেখকের এই দ্বৈতসত্ত্বা নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকেন। লেখক হতে যেমন পড়তে হয়, জানতে হয়, সাধনা করতে হয়, একজন পাঠক ও এর ব্যতিক্রম নন। মনে রাখতে হবে আজকের একদল নিষ্ঠাবান পাঠকের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন আগামীর একজন খ্যাতিমান লেখক। পাঠকের বোঝা উচিত একজন লেখক যেকোন পরিস্থিতিতে যেকোন বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের কথাই ধরা যাক। রবীন্দ্রনাথ কখনো পুরুষের বিশালত্বকে তুলে ধরেছেন, কখনো নারীর মহিমাকে তুলে ধরেছেন। কখনো পুরুষের দুর্বলতা নিয়ে রসিকতা করেছেন, কখনো নারীর দুর্বলতা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন। কখনো ধর্মের পক্ষে লিখেছেন, আবার বিপক্ষেও লিখেছেন। বিদ্রুপাত্মক ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি তাঁর লেখা জুড়ে আছে। কিন্তু তিনি ছিলেন আধাত্ববাদের কবি। সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরের বন্দনাই তাঁর সংগীতে সুরের মূর্ছনা হয়ে ঝরে পড়েছিল। আবার কখনো একান্তে বসে আছেন, মন্দিরের ঘণ্টা শুনে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘বুঝিনা আমাদের দেবতারা কি কানে শুনতে পান না যে এদেরকে ঢাকঢোল পিটিয়ে, উলু দিয়ে জাগিয়ে তুলতে হয়?’ এর মানে যেই মুহূর্তে যা অনুভূতিতে আসবে একজন লেখক তাই বলবেন, লিখবেন। তাঁর অনুভূতিকে থামাতে চাওয়া, বা তাঁর আজকের চিন্তা দিয়ে তাঁর আগামীর লেখাকে বিচার করা অবান্তর, অযৌক্তিক। আধুনিক, নবীন ও প্রবীণ প্রজন্ম একটা বিষয় অবগত হওয়া অত্যন্ত জরুরি আর সেটা হলো ভিন্ন মতামতকে গ্রহণ করা। ক্লাসিক্যাল দর্শন অনুযায়ী এখানেই উৎপত্তিলাভ করে নতুন চিন্তা-চেতনা, নতুন ভাবনা। কোন যুক্তি, চিন্তা বা মতবাদই পরোপুরিভাবে নিতে হবে বলে কথা নেই, কিন্তু সবই জানা জরুরি। যার যা ভালো তাঁর সবটুকুকে গ্রহণের মাধ্যমে নিজের ভালোর খুঁটিটাকে আরো মজবুত, আরো শক্ত করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া চাই।
হাজারো খারাপের ভিড় নিঙড়ে তবেই সেই ভালোর দেখা মেলে। তাই রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন, “প্রেমে সুখ দুখ ভুলে তবেই সুখ পায়!” তথাপি জীবনেও ভালো খারাপ বুঝে তবেই ভালো পায়। জোড়ালোভাবে এক মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন করা মানে অন্যসব মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করা। যে ধার্মিক সেভাবে তাঁর ধর্মই শ্রেষ্ঠ, কিন্তু যে প্রকৃত ধার্মিক সেভাবে সব ধর্মই শ্রেষ্ঠ। তাই বলে তাঁকে নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে হবে বলে কোন কথা নেই। সেজন্যই সনাতনী ধর্মীয় গুরু রামকৃষ্ণ পরমসিংহ বলেছিলেন, ‘যত মত, তত পথ’। তিনি সনাতন ধর্মের পাশাপাশি ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের দীক্ষা নিয়েই এই উদ্ধৃতিতে উপনীত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ‘সকলের সকল মতকে গ্রহণ করার মধ্যে দিয়েই একমাত্র ঈশ্বরের সংস্পর্শ লাভ সম্ভব’। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন ভিন্ন পথে তাঁদের বন্দনার গান গেয়ে খুঁজে ফিরছেন সেই একক রূপধারী, সত্যের প্রতিচ্ছবিকে যিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি, জৈন সকলের বিশ্বাস। কারো ঈশ্বর, কারো আল্লাহ, কারো ভগবান। যে সমাজে প্রতিনিয়ত মানুষের স্বাধীনতা হরণ হয়, নিজেকে তুলে ধরার পথ সংকুচিত হয়ে আসে, সে সমাজ সভ্য হয়ে ও সভ্যতাকে ছুঁতে পারেনা। তবে সাহিত্যানুশীলনের জগতে এই দৈন্য কেবল পাঠকের একার নয়, লেখকেরও। তাই কেবল সাময়িক মনোরঞ্জন আর জনপ্রিয়তা কখনো কোনো অবস্থাতেই একজন লেখকের লেখার উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ নয়।
পাঠককে আক্রমণ করা কোন লেখকেরই উদ্দেশ্য নয়, আবার এ কথাও সত্য যে সত্যতো কিছুটা কটু শোনাবেই। একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে সকলেরই স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। সেদিক থেকে বিচার করলে একজন লেখক ও সেই অধিকারের বাইরে নয়। একজন লেখক যা অনুভব করবে তাই লিখার স্বাধীনতা তাঁর থাকা চাই। একজন লেখক আজ এই মুহূর্তে যা ভাববে, অনুভব করবে, লিখবে আজ থেকে দু,চার বছর পর তাঁর সেই অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। এভাবেই প্রতিটি দৈনন্দিন সাধারণ মানুষের মতো একজন লেখক ও বিকশিত হন। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হওয়া চাই প্রাণ খুলে, স্বাধীনভাবে নিজেকে প্রকাশ করা। লেখকের সেই স্বাধীনতাকে পাঠকের বুঝতে হবে, তাঁকে শ্রদ্ধা করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে দিতে হবে লেখকের সেই স্বাধীন অভিব্যক্তি প্রকাশের এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার নিশ্চয়তা। নইলে একটি দেশের উচ্চশ্রেণির একদল বুদ্ধিমান নাগরিক, একদল পাঠক ও লেখক তথা একটি জাতি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

লেখক : গবেষক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত