শিরোনাম

পরিবর্তনের হাওয়ায় প্রত্যাশিত সুযোগ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ডা. পলাশ বসু  |  ০১:২৮, আগস্ট ১০, ২০১৮

মরুর দেশ বলে পরিচিত আজকের সৌদি আরব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৩২ সালে ইবনে সৌদের হাত ধরে। মুসলমানদের ‘পুণ্যভূমি’ বলে খ্যাত সৌদি আরব। কারণ ইসলাম ধর্মের শেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন সেখানে। তার রওজা মোবারকও সেখানে। ইসলামের আজকের যে ব্যপ্তি তা শুরু হয়েছে নবীজীর নেতৃত্বে সৌদি আরব থেকেই। প্রতি বছর লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান সৌদি আরবে যান পবিত্র হজ পালনের জন্য। তেল, গ্যাস বিক্রি থেকে যেমন সৌদি আরব প্রচুর টাকা আয় করে তেমনিভাবে পবিত্র হজের মৌসুমে হাজীদের কাছ থেকেও আয়টা নেহায়েত কম হয় না। এভাবেই সৌদি আরবের অর্থনীতি সবসময় গতিশীল থাকে। চাঙা থাকে। ১৯৩৮ সালে সৌদি আরবে পেট্রোলিয়াম আবিষ্কৃত হয়। তা উত্তোলন ও বিক্রি শুরু হয় ১৯৪১ সাল থেকে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে তেলের দাম যথেষ্ট বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৯ সালে ইরানে শিয়া শাসক আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতা দখল করার পর থেকে সৌদি আরবের রাজনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা হয়। সেখানে আগে থেকেই কট্টরপন্থি ওয়াহাবি মতবাদের যে প্রাধান্য ছিল, সেটা নবতর মাত্রা পায়। কট্টরপন্থি সুন্নীদের ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ফলে ওয়াহাবিজম সেখানে পুরোপুরি খুঁটি গেড়ে বসার সুযোগ লাভ করে। তারপর থেকে সৌদি আরবে সিনেমা হল, থিয়েটার নিষিদ্ধ হয়ে যায়। নারীদের ব্যাপারে নানা ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ করা হতে থাকে। একা একা ঘরের বাইরে বের হওয়া থেকে শুরু করে চাকরি বাকরি এবং নানা ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গাড়ি চালানোর ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। যদিও নানা সময়ে সেখানে এর বিরুদ্ধে নারীরা প্রতিবাদ করেছেন। বিক্ষোভ করেছেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ১৯৯০ সালে নারীরা প্রথম গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েও আসেন এবং গ্রেপ্তার হন। সম্প্রতি সৌদি আরবে যুবরাজ সালমান ক্ষমতায় অভিসিক্ত হওয়ার পর থেকেই সৌদি রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা হয়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। রাজ পরিবারের অনেকেই গ্রেপ্তার হন। দুর্নীতিলব্ধ অর্থ শেষমেষ রাজ কোষাগারে ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে অনেকে মুক্তিও পান। পরিবর্তনের এ ছোঁয়া নারীদের জীবনেও লাগতে শুরু করে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ঘোষিত হয় যে, একমাত্র দেশ হিসেবে সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোয় যে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা তুলে নেওয়া হবে ২০১৮ সালের জুনে। এ ঘোষণার অংশ হিসেবে ২৫ জুন থেকে নারীরা স্বাধীনভাবে গাড়ি চালানোর সুযোগ লাভ করল। যদিও গত মধ্য রাত থেকেই অনেক নারী রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হতে শুরু করেন। দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় নেতাদের কাউন্সিল এই পদক্ষেপকে সমর্থন দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর ফলে সৌদি আরবের অর্থনীতি আরও বেশি গতিশীল হবে। নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ লাভ করবে। কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস কোপার্স বলছে, ২০২০ সালের মধ্যে ৩০ লাখ নারী ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন ও গাড়িও চালাতে পারবেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্তের কারণে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে সৌদির জাতীয় অর্থনীতিতে ৯০ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে। (সূত্র: দি বাংলাদেশ টুডে, ২৫ জুন ২০১৮) নারীদের এমন সুযোগ হয়তো প্রত্যাশিতই ছিলো। যদিও অনেকে মনে করছেন যে, যুবরাজ সালমান তার ক্ষমতা পোক্ত করতেই রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিযুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। পশ্চিমা বিশ্বকে খুশি করতেই তার এমন পদক্ষেপ নেওয়া। ইসরায়েলের সঙ্গেও তার সম্পর্ক বেশ ভালো। তাই ফিলিস্তিন প্রশ্নে তিনি নীরবতা পালন করার নীতি গ্রহণ করেছেন। আর দুর্নীতি বিরোধিতার নামে আসলে রাজ পরিবারের অন্য যুবরাজদেরকে আর্থিকভাবে পঙ্গু বা তার ওপর নির্ভরশীল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এমন আলোচনা বা সমালোচনার মুখে সৌদি আরব শেষ অবধি কোন দিকে তার যাত্রা অব্যাহত রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: চিকিৎসক ও শিক্ষক,
সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ,
এনাম মেডিকেল কলেজ, সাভার।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত