শিরোনাম

আমাদের কালচার-আমাদের মানসিকতা

প্রিন্ট সংস্করণ॥মো. শওকত আলী  |  ০১:৩৪, জুলাই ১২, ২০১৮

কালচার বলতে আমরা আসলে কি বুঝি? সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়েছে, ঈঁষঃঁৎব রং যিধঃ বি ধৎব. আর সভ্যতাকে বলা হয়েছে, পরারষরুধঃরড়হ রং যিধঃ বি ঁংব. কালচার আসলে অ পড়হমৎবমধঃরড়হ ড়ভ যধনরঃং. হ্যাবিট যেহেতু আমাদের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ তাই আমাদের কালচারই আমাদের চরিত্র। তো আমাদের সেই হ্যাবিটগুলো কি কি? সেগুলোর অধিকাংশ কি আমাদের দোষ না গুন? বাঙালিদের গুনপনার কথা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এবং কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র যেমন বুঝেছিলেন সম্ভবতঃ আর কেউ এত গভীরভাবে তা বুঝতে পারেন নি। বাঙালির মন-মানসিকতা সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বললেও এই দু’জনের মত আর কেউ এমন নির্ভুল বর্ণনা দিতে পেরেছেন বলে জানা যায় না। বঙ্গবন্ধু অবশ্য স্বাধীনতার পর একবার বলেছিলেন, ’কবিগুরু দেখে যান, আজ আপনার বাঙালি মানুষ হয়েছে।’ কিন্তু সে ওই পর্যন্তই। হঠাৎ করে বাঙালি মানস সম্পর্কে বলতে যাচ্ছি কেন? কারণ হচ্ছে স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে বাঙালি মানসের যে প্রকৃতিগত ও প্রবৃত্তিগত তেমন কোন পরিবর্তন হয় নি সেটা বোঝানোই এই লেখার প্রতিপাদ্য। আজকে স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও বাঙালি কোন পর্যায়ে বিভক্ত ও বিছিন্ন হয়েছে; আর কেনই বা হয়েছে সেটা বলবার জন্যই এই লেখা। আর বিশ্বকবি যে ’প্রফেটিক’ বিশ্লেষণ করেছিলেন বাঙালি মন-মানসের, সেটার সত্যতা আজও যে তেমনি অমলিনই আছে সেটাও ’রিকনফার্ম’ করা। মৃত্যুর মাত্র বছরখানেক আগে বাংলা ১৩৪৭ সালের বৈশাখী সংখ্যার ’শনিবারের চিঠি’ নামীয় এক মাসিকের সাথে শেষ এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাঙালি মানস ও বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে একেবারে প্রায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর ভাষায়- কোন কিছু কিছু গড়ে তোলার বিষয়ে পুরুষালী সহ্যশক্তি ও ধৈর্য অত্যাবশ্যক; কিন্তু এর বদলে বাঙালির আছে স্ত্রীলোকসুলভ ঘ্যানঘ্যানানির স্বভাব। তাদের সার্বক্ষনিক অভিযোগ অন্যরা তাদের এমন সব কিছু থেকে বঞ্চিত করছে যা তারা নিজেরা করতে পারত না। বাঙালি মানস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, এদের মধ্যে বেপরোয়াপনার প্রবণতা এত উচুমাত্রার যে কোন জিনিস ধ্বংস করার এক অদ্ভুত দক্ষতার অধিকারী এরা। মহান, বৃহত্তর ও প্রশংসনীয় কোন জিনিসকে প্রশংসা করা বা উৎসাহিত করা এদের ধাতে নেই। বরং পরষ্পরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে এদের পারদর্শিতা বিস্ময়কর। বাঙালি পরষ্পরের প্রতি কুৎসা ও ঘৃনার ছুরি শান দিতে পিছিয়ে থাকেনি কখনো। বাঙালি রাজনীতিকদের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা তিনি গোপন করতে পারেন নি। তাঁর ভাষায় উঁচু পর্যায়ের নেতারাও নিম্নশ্রেণির মহিলাদের মত ঝগড়া করেন এবং রাজনীতির নামে বিভাজন প্রক্রিয়ায় সততঃ সক্রিয় থাকেন। তিনি এই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, বাঙালি এমন এক জাতি যারা নিজেরা তো নিজেদের জন্য কিছু করতে চায়ই না অন্যদেরকেও তা করতে দেয় না। তিনি এদের মধ্যে ধ্বংসাত্মক প্রবণতার প্রকোপ লক্ষ্য করে বলেন যে, বুদ্ধির অভাব তাদেরকে বিপথগামী করে না বরং তাদের অন্তর্গত দুষ্ট প্রকৃতিই তাদের দুর্দশার জন্য দায়ী। হিংসা এদের মধ্যে এমনই যে তিনি তার এক কবিতায় বলেন, ..... হিংসায় উন্মত্ত পৃত্থী, নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিছে নিঃশ্বাস/ শান্তির ললিত বাণী শোনাইছে ব্যর্থ পরিহাস। তিনি বলেন, বাঙালি তাদের মঙ্গলকে নিজেরাই অসদুপায় অবলম্বনের মাধ্যমে অন্তর্ঘাত করে থাকে যেটা তাদের গভীর স্বার্থপর ইচ্ছা ও বেপরোয়া রাজনীতির দ্বারা আরো গভীরতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়। ছাত্ররাজনীতির বিষয়টিকে তিনি এই বলে সমালোচনা করেন যে, রাজনীতিকরা তরুনদেরকে তাদের যথার্থ স্থান শ্রেণিকক্ষ থেকে বিচ্যুত করে তাদের তারুণ্যের শক্তির চরম অপচয় ঘটাচ্ছে। নোবেলবিজয়ী এই বিশ্বকবি এই বলে আক্ষেপ করেন যে এসব নৈরাশ্যজনক ঘটনা’ যার সাক্ষী হিসেবে যে দীর্ঘজীবন তিনি লাভ করেছেন তা, তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে ধ্বংস করছে। তাঁর চোখে ভবিষ্যতের আশার কোন আলো নেই কারণ, তাঁর ভাষায়, মিথ্যার ওপর সত্য বেড়ে উঠতে পারে না। তিনি বলেন, যে বাঙালিই প্রথম ইউরোপীয় শিক্ষা ও সভ্যতার সংস্পর্শে এসে সমগ্র ভারতে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অগ্রগামী হয়; কারণ এই বিষয়টি ব্যক্তিগত নিষ্ঠা ও প্রচেষ্টার বিষয় ছিল, যেটা বাঙালি মানসের এক শক্তিশালী ও উজ্জ্বল দিক। কিন্তু দেশ ও জাতিগঠন ভিন্ন এক জিনিস। এর জন্য সামষ্টিক ও সম্মিলিত ইচ্ছা ও নিরলস প্রচেষ্টা অত্যাবশ্যক। আর এখানেই এদের প্রচন্ড ঘাটতি। নিজেদের ধ্বংসাত্মক প্রবণতার ফল হিসেবেই তারা বিভক্ত হবার জন্য এক হয়; পৃথক হবার জন্যই একত্রিত হয়। এই কঠোর বক্তব্যগুলি এমন একজন মানুষের মুখ থেকেই উচ্চারিত হয়েছে যিনি সারা জীবন তার কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাসে বাঙালি চেতনাকে প্রশংশিত করেছেন। তথাপি বাঙালি রাজনীতিকদের চরিত্র ও কার্যকলাপ তাকে এতদূর হতাশ ও দুঃখিত করেছিল, যে মানুষদের আবেগ অনুভূতি তাকে এমন সৃষ্টিশীল হতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল তাদের সম্পর্কেই তাঁকে এমন কঠিন বক্তব্য দিতে হয়েছে। এতে তার অতি গভীর অন্তর্বেদনার অকপট বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। জীবনসায়াহ্নে এসে বাঙালিকে আর একবার গভীর অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে নিজেদের দিকে তাকাতে বাধ্য করার জন্যই হয়ত এভাবেই তিনি তাঁর ক্ষোভ ও হতাশাকে প্রকাশ করেছিলেন। অনেককে বলতে শুনি আমাদের অর্থাৎ বাঙালিদের কালচার নাকি হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এবং খুবই সমৃদ্ধ। তারা কিসের ভিত্তিতে এটা বলেন সেটা বোঝা বেশ কঠিন। আজ যখন চারিদিকে তাকিয়ে দেখি তখন কালচার বলতে ঐসব আঁতেল যারা আমাদের কালচার তথা সংস্কৃতিকে হাজার বছরের পুরানো এবং খুবই সমৃদ্ধ বলেন, তাদের কাছে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে কালচার বলতে তারা কি বোঝেন? খুব বেশী দূরে না গিয়ে যদি আমাদের চারপাশে তাকিয়ে দেখা যায় তবে দেখা যায় যে মানুষের যতগুলো বদভ্যাস থাকা সম্ভব তার ৯০% আমাদের বাঙালিদের মধ্যে সগৌরবে বিরাজমান। চারপাশে তাকিয়ে দেখুন যত রকমের ময়লা আবর্জনা সারা রাস্তাঘাট জুড়ে পড়ে আছে; আর সেগুলো মাড়িয়েই আমরা নিত্য চলাফেরা করছি। বাড়ির কোনে ড্রেনগুলো নানা রকম পচা আবর্জনায় ভর্তি হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছ। অথচ আমরা দিব্যি তার পাশ দিয়ে মনের আনন্দে দূষিত বাতাস বুক ভরে টানতে টানতে চলে যাচ্ছি। আমাদের পাবলিক টয়লেটগুলোতে একবার গেলে অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত উঠে আসবে; হয়ত সেদিনকার ক্ষুধাটাই মাটি হয়ে যাবে। সরকারি অফিসগুলোর সিঁড়ি? মাশা’আল্লাহ্! একবার তাকালে সেদিনকার ক্ষুধা হয়ত কয়েকদিনের জন্য মরেই যাবে। আচ্ছা সেখানে তো শিক্ষিত (?!) প্রগতিশীল আলোকপ্রাপ্ত ভদ্রলোকেরাই (!!) কাজ করেন। একই অবস্থা ট্রেনের টয়লেটগুলো। দেশে নতুন বাস, নতুন ট্রেন চালু হওয়ার ২/৪ দিনের মধ্যে দেখা যায় তাদের সিটগুলো ব্লেড দিয়ে কাটা, ট্রেনের সুইচগুলো ভাঙা, পাখাগুলো অচল। রাস্তা দিয়ে যেতে যদি আশপাশের দিকে তাকান যায় তবে দেখা যাবে পথের পাশের ফুলগাছগুলোর (যদি থাকে) ডাল মুচড়ে ভাঙা, ফুলগুলো আশপাশেই পদদলিত হচ্ছে। এই শহরেই রাস্তায় চলার সময় কেউ ট্রাফিক নিয়মের ধার ধারেনা। যে যার খুশীমত চলছে। এমনিতে তো বাস-ড্রাইভার ভাই সাহেবানরা ট্রাফিক নিয়মের কোন পরোয়াই করেন না। যত্রতত্র রাস্তার ওপর তাদের গাড়ি আড়াআড়ি রেখে রাস্তার মাঝখানেই যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছেন; আমাদের তথাকথিত ভদ্রলোকগণ যারা গাড়ি ব্যবহার করেন তারাও রাস্তার বামের লেন, যেটা বিশ্বের সব দেশেই খোলা থাকে (অবশ্য যে দেশে ডান দিক দিয়ে গাড়ি চলে সেখানে ডান দিকের লেন খোলা থাকে।) সেই লেনও দখল করে রাখেন যাতে তাদের পেছনের বাম দিকে যাবার গাড়িগুলোও রাস্তায় আটকে থাকে। এসবই তো কমন সেন্স-এর ব্যাপার। কিন্ত কথায় আছে ’ ঈড়সসড়হ ংবহংব রং ঃযধঃ ংবহংব যিরপয রং ঁহপড়সসড়হ ঃড় সধহু. ’তাই বলতেই হয় যে আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত লোকদেরও কমনসেন্স ও সিভিক সেন্স-এর প্রকট অভাব। রাস্তার ওপর ওভারপাস না থাকলে আন্দোলন, সংগ্রাম; কিন্তু যেই সেটা তৈরি হয়ে গেল, সেটার দিকে আর কেউ মাড়াবে না। ব্যস্ত রাস্তায় ডিভাইডার আছে; আছে কাছেই ফুট ওভারব্রিজ। কিন্তু ছোঁড়া-ছুঁড়ি, বুড়ো-জোয়ান পাইকারী হারে ওভারব্রিজে না উঠে রাস্তা পার হচ্ছে। এমনকি বাচ্চা কোলে মহিলারা পর্যন্ত শাড়ি উঠিয়ে ডিভাইডার ডিঙোচ্ছে। স্যুট-কোট পরা ভদ্রলোকেরা (?!) অবলীলায় পথের পাশে প্রাকৃতিক কর্ম সারছে। হয়ত ফুটখানেক দূর দিয়ে নারী-শিশু-যুবা-বুড়োরা হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু‘ ওই ভদ্রলোকদের তাতে কিছু এসে যায় ন্।া প্রকাশ্যে ধুমপান আইনতঃ নাকি দন্ডনীয়। কিন্তু খোদ পুলিশ ভাইয়েরাই থানার সামনে সেই দন্ডনীয় অপরাধ অবলীলায় করে যাচ্ছেন। তাহলে আমাদের কালচার, সেটা যে খুবই সমৃদ্ধ, সেটা কোন অর্থে? হ্যাঁ, আমাদের সভ্যতার পারদ বেশ উঁচুতে উঠেছে, সেটা ঠিক। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রায় গড়ে ফেলেছি। বাড়ি বাড়ি, এমনকি ঘরে ঘরে এলইডি টিভি, ফ্রিজ, এসি, পশ্চিমা ধাঁচের আসবাব, হয়ত অনেকে কাঁটা-চামচও রপ্ত করে ফেলেছেন। মাঝারি মধ্যবিত্ত প্রায় সবাই গাড়িতেও চাড়েন। কিন্তু বাইরে তাদের কারবারটা দেখে বোঝা মুশকিল তারা কোন কালচার আত্মস্থ করেছেন বা করতে সক্ষম হয়েছেন। যারা মুসলমান তাদের তো জানা থাকার কথা যে ইসলামের নবী (সা.) বলেছেন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অংগ। কিন্তু তার সাথে কি আমাদের মিল আছে? না কি এজন্যই ইসলাম আমাদের ভাল লাগে না? সত্যিই কালচার বলতে অধিকাংশই আমাদের হ্যাবিট বা অভ্যাস। আর সেই অভ্যাস যে আমাদের বাঙালিদেরকে কিসে পরিনত করেছে তা ব্যাখ্যা করার বোধহয় কোন দরকারই নেই।

লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক, লালমাটিয়া গার্লস স্কুল এ- কলেজ, ঢাকা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত