শিরোনাম

প্রবাসীদের অর্থ ব্যবস্থাপনা

প্রিন্ট সংস্করণ॥রিয়াজুল হক  |  ০১:২৮, জুন ১২, ২০১৮

কয়েকদিন আগে ম্যাসেঞ্জারে পরিচিত একজনের একটি বার্তা এসেছিল। বার্তাটির মূল কথা ছিল, প্রবাসীরা দেশে আসলেই বেকার হয়ে যায়। কোন কাজ পায় না। জীবিকার তাগিদে আমাদের দেশের প্রবাসীদের মধ্যে বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করে। অধিকাংশই নির্মাণ শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী কিংবা কায়িক শ্রম নির্ভর কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের টাকায় মাসে ৩০,০০০ কিংবা ৩৫,০০০ টাকা আয় করে। নিজের খরচ মিটিয়ে এই প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠায়। ১০/১২ বছর বিদেশে অমানুষিক পরিশ্রম করে করে যখন দেশে চলে আসে, তখন যেন অনেকেই অন্ধকার দেখতে পায়। মাসে মাসে যা পাঠিয়েছে, যেন কিছুই অবশিষ্ট নেই। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে।(ক). খুলনার সন্তান ফারুক হোসেন সৌদি আরবে একটি ক্যাটারিং সার্ভিস কোম্পানিতে স্টোর কিপার হিসেবে ১০ বছর ধরে কর্মরত আছেন। মাসিক বেতন পাচ্ছে বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৫,০০০ টাকা। খুলনায় এসে ক্যাটারিং সার্ভিসের কোন কোম্পানিতে চাকরি করবে, সেই রকম কোন কোম্পানি খুলনায় নেই। তাহলে দেশে এসে তিনি করবেন? (খ). বরিশালের সন্তান ফয়সাল হোসেন ২০০৫ সালে বাহরাইনে যান এবং সেখানে প্রতিষ্ঠিত গাড়ি কোম্পানির পার্টস তৈরি করে অ্যাসেম্বেলির কাজ করে থাকেন। মাসিক বেতন ওভারটাইমসহ ৭০,০০০ টাকা। পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু একা একা পরিবার পরিজন ছেড়ে প্রবাসে আর কতদিন? দেশে আসা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে এসে এই ধরনের কাজের কোন সুযোগ খুবই সীমিত। তাহলে দেশে এসে তিনি করবেন? (গ). বাগেরহাটের কাদির ৫ বছর ওমান ছিল। সেখানে একটি কারখানায় কাজ করত। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর আর নবায়ন হয়নি। বাধ্য হয়েই দেশে ফিরে আসে। এখন দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিকের কাজ করছে। তারপরেও প্রতিদিন কাজ পাওয়া হয় না। আজকের এই লেখাটি সকল প্রবাসীর অর্থনীতির সাথে মিলে যাবে তা কিন্তু নয়। তবে অনেকের সাথেই মিলে যাবে। কারণ অনেকেরই কারিগরি জ্ঞান না থাকায়, তারা প্রবাসে যেয়ে ভালো বেতনে চাকরি পায় না। অনেকেই বৈধভাবে প্রবাসে না যেয়ে, বিভিন্নভাবে হয়রানির স্বীকার হয় এবং পালিয়ে থেকে কাজ করে সামান্য কিছু আয় রোজগার করে থাকে। আবার অনেকের পরিবার পরিজন প্রবাসীদের পাঠানো টাকা বিভিন্নভাবে অপচয় কিংবা নষ্ট করে থাকে। রফিক চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই। বাবার একটি ছোট চায়ের দোকানের আয়ে অভাব অনটনে চলত তাদের সংসার। খুব ছোট থাকতেই আল-আমিন বাবাকে চায়ের দোকানে সাহায্য করত। কিন্তু সংসারের অভাব অনটন যাচ্ছিল না। ২০০৭ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে কাজের জন্য বাহরাইন চলে যায়। বেতনের প্রায় সবটুকুই দেশে পাঠিয়ে দেয়। বাবা-মা এখন একটা ভালো বাসায় থাকে। বাবাকে আগের মতো দোকান চালাতে হয়না। দেশে সংসার এখন ভালই চলছে। কিন্তু এই ১১ বছর কেমন কাটছে বাহরাইনে রফিকের সময়? সারাদিন কাজের পর, বাড়তি কিছু আয়ের জন্য সাধ্যমতো ওভারটাইম করে। রান্নার কাজ থেকে শুরু করে ঘরের সব কাজ নিজেকেই করতে হয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে সবকিছু। কিন্তু মনের মধ্যে কষ্ট অন্য জায়গায়। গত আট বছরে ষোলটি ঈদ গেছে। মাত্র দুই বার ঈদ-উল-ফিতরের সময় বাবা-মায়ের সাথে ঈদ করার সুযোগ পেয়েছিল। দেশে যে চলে আসবে, সে সুযোগও নেই। কারণ বিগত বছরগুলোতে পরিবারের মানুষজন কিছুটা বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এরা সকাল ৫ টায় কাজের জন্য বের হয়। আর আমরা ঠিকই সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমাই। এরা সেই লোক যারাসকালের নাস্তা ভুলে গিয়ে পলিথিনের ব্যাগে করে খাবার নিয়ে যায়। আর আমরা সাহেবের মতো নাস্তা করি খাবার টেবিলে বসে। এরা সেই লোক যারা ৫০ ডিগ্রি রোদের মধ্যে কাজ করে, বিশ্রামের জন্য যাদের ঠাই হয় খেজুর গাছের নিচে বালুর মধ্যে। আর আমরা ঠিকই এসি, ফ্যান চালিয়ে আরামে বিশ্রাম নিয়ে থাকি। এরা বিকেলে রুমে আসতে গাড়িতে উঠার জন্য তিনশত গজ লম্বা লাইন ধরে দাড়িয়ে থাকে । আর আমরা গাড়ি ভাড়া করে বাড়িতে আসি। এরা সেইলোক যারা মৃতব্যয়ী হয়ে কষ্ট করে বাড়িতে টাকা পাঠায়। আর আমরা বাবুগিরি করে টাকা উড়াই। এরা সেই লোক, যারা একবার অসুস্থ হলে ডাক্তারেরভিজিট যাবে বাংলার দুই হাজার টাকা এবং সাথে আরও কত টাকার ঔষধ, এই চিন্তা করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে থাকে। আর আমাদের পেটেব্যথা হলে ঠিকই ভালো ডাক্তারের কাছে যাই। এরা সেই লোক যারা অতি কষ্টে দিন কাটালেও বাড়িতে কাউকে বুঝতে দেয়না যে এরা কষ্টে আছে। আর তাদের কাছে আমাদের চাহিদার শেষ নেই। তবু এরা শত কষ্ট বুকের মধ্যে জমা রেখে আমাদের সুখী রাখতে চায়। আমাদের দেশের অল্প শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত মানুষগুলো যখন প্রবাসে যায়, তখন পরিবারের মানুষগুলোর জন্যই অমানুষিক পরিশ্রম করে। নিজেরা কিছুই সঞ্চয় করে না। সকল উপার্জিত অর্থই পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। তথ্য মতে, ৫৭ ভাগ পরিবার প্রবাস আয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ করেননা। অর্থ খরচ করেন ভোগ্য পণ্য ব্যয়ে। বাকি ৪৩ শতাংশ পরিবারের ৭৪.৭৮ শতাংশ ব্যয় করে দালান কোঠা নির্মাণ, ফ্ল্যাট বা জমি কেনায়। খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে পরিবারের আরাম আয়েসের মাত্রায়। অথচ যে মানুষটি দিন রাত পরিশ্রম করে দেশে অর্থ প্রেরণ করছে, সে যখন দেশে আসবে সে হয়ত তার জন্য সঞ্চিত কিছুই দেখতে পাবে না। পরিবারের সুখ, সমৃদ্ধি এবং সচ্ছলতার কথা চিন্তা করে প্রবাসীরা দেশে আসারও সাহস করেন না। অথচ মন যে পরে থাকে তার প্রিয়জনদের কাছেই। যাদের স্বজন প্রবাসে অবস্থান করছে, তাদের প্রত্যেকটি পরিবারের উচিত একটু হিসেব করে খরচ করা। ছোট ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করা। সেটা মুদি দোকানও হতে পারে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, প্রবাসীদের নামে ব্যাংকে টাকাগুলো জমা রাখা। কারণ আজ যে মানষটি প্রবাসে অবস্থান করছে, সবসময় সে প্রবাসে থাকবে না। এক সময় দেশে আসবে। তার আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা পরিবারের অন্য সদস্যদের করতে হবে। কারণ সে তার সারাটা জীবন পরিবারের সদস্যদের জন্যেই ব্যয় করেছে।
সবশেষে আরেকটি ঘটনা দিয়েই আজকের লেখা শেষ করব। আলম (ছদ্মনাম) পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য এইচএসসি পাশ করার পর ১৯৯৩ সালে সিঙ্গাপুর যায়। ওয়েল্ডিং এর কাজ করে ভালই চলছিল তার চাকরি। প্রতি মাসেই নিজের খরচের টাকা রেখে বাকি টাকা মায়ের কাছে পাঠাত। ছয় বছর পার হয়ে যায়। একটি বারও দেশে আসা হয়নি। তবে কোন মাসেই টাকা পাঠাতে দেরি হয়নি। এর মধ্যে আলমের হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস ধরা পড়ে।
আলম দেশে চলে আসেন। মায়ের কাছে পাঠানো টাকা তার মা পরিবারের ব্যয়ের জন্য কিছু রেখে বাকি টাকা আলমের ভগ্নিপতির কাছে দিতেন ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ভগ্নিপতি সেটা না করে নিজের নামেই সকল টাকা জমা ব্যাংকে জমা রেখে দিতেন। অনেক শালিস বিচার করেও আলম একটি টাকাও ফেরত পায়নি। ছয়টি বছরের সকল পরিশ্রমের ফলাফল একটা বড় শুন্য।

লেখকঃ উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত