শিরোনাম

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন : ডেটলাইন ২০২১

প্রিন্ট সংস্করণ॥মো. আকতারুল ইসলাম  |  ০১:২১, মে ১৬, ২০১৮

কচি দুটি পা ধরে আসছে শিশু মেহেদীর। ক্ষীণকন্ঠে ডেকে চলেছে আগারগাঁ, তালতলা, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মোহাম্মদপুর, মিরপুর-১০ এর লেগুনার হেলপার। ঘড়ির কাটা রাত নয়টা ছুইছুই। চোখের পাতা দু’টি এক হয়ে আসছে। আর কত সারা দিন গেছে লেগুনার পা-দানি আর হাতলে ঝুলে। ড্রাইভারের সিটে বসা আরেক কিশোর ডাকছে এ্যাই ডাক ডাক, এটাই শেষ ট্রিপ। এমন হাজারো মেহেদীর দিন কাটে লেগুনার হাতলে ঝুলে, ইট ভাঙা, লেদ মেশিন অথবা ঝুঁকিপূর্ণ অন্য কোন কাজে। মেহেদীর বয়স কত হবে ৯ কিংবা ১০। এখন তার লেখাপড়া করার বয়স। মেহেদীর কাঁধে বই নয়, চড়ে বসেছে সংসার। রাজধানী ঢাকায় প্রতিটি রুটে লেগুনার হেলপারদের বেশির ভাগই শিশু। প্রতিটি শিশুই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেগুনায় হেলপারি করছে। ছোট ছোট দুর্ঘটনার কবলে তারা প্রায়ই পড়ে। চলন্ত লেগুনা থেকে পড়লেতো কথাই নেই, সরাসরি হাসপাতালে। শুধু রাজধানীই নয় সারা দেশেই লেগুনা, টেম্পুর হেলপার শিশুরাই। লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এই সকল শিশুরা। সারা দেশে পরিবহন সেক্টরেই দেড় লক্ষ শিশু কাজ করছে। তাদের ভবিষৎ নিয়ে হয়তো তাদের বাবা-মা ভাবছেন না। তারা মনে করছেন, লেখাপড়া করাবো, টাকা পাবো কই? আর আজ হেলপার কিছু দিন পর ড্রাইভার হবে। আর টাকা তো আসছেই, তাদের পিছনে তো আর টাকা খরচ করতে হচ্ছে না। শুধু পরিবহন খাতেই নয় আরো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এই শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। শিশুশ্রম সংক্রান্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণা প্রতিবেদনে, সারা দেশে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার। এই বিপুল সংখ্যার শিশুদের শিক্ষার বাইরে রেখে ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শিশুশ্রম নিরসনে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের বেধে দেয়া সময় অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে সরকার সকল প্রকার শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন করে জতীয় কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। সরকার ঘোষণা করেছে, যেকোন উপায়েই হোক ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন করা হবে। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছর পর্যন্ত কোন শিশুকেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না। তবে ১২ বছর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নয় এমন হালকা কাজে নিয়োগ দেয়া যাবে। সরকার শিশুশ্রম নিরসনে ২০১০ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। পরবর্তীতে ৩৮টি কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ঘোষণা করে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো হচ্ছে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, বিড়ি-সিগারেট কারখানা, ইট-পাথর ভাঙা, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, টেক্সটাইল, লেদ মেশিনের কাজ, লবণ কারখানা, সাবান ও ডিটারজেন কারখানা, স্টিল, ফার্নিশার্স ও মটর গেরেজ, চামড়াজাতীয় দ্রব্যাদি অর্থাৎ ট্যানারি শিল্প, ওয়েলডিং বা গ্যাস বার্নার, কাপড়ের রং ব্লিচ, জাহাজ ভাঙা, ভলকানাইজিং, জিআই সিট, চুনা পাথর, চকসামগ্রী, স্পিরিট ও আ্যালকোহল, জর্দা বা তামাকজাতীয় দ্রব্যাদি, সোনা বা ইমিটেশন, কাচ বা কাচের সামগ্রী, আতশবাজি, ট্রাক, টেম্পো বা বাস হেলপার, স্টেইনলেস স্টিল, কার্বন ফ্যাক্টরি, তাঁতের কাজ, ইলেট্রিক মেশিন, বিস্কুট বা বেকারি, সিরামিক, নির্মাণকাজ, কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, কসাইয়ের কাজ, কামারের কাজ, বন্দর বা জাহাজে মালামাল হ্যান্ডেলিং, অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় দ্রব্যাদি তৈরি, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, প্লাস্টিক বা রাবার তৈরি এবং কীটনাশক তৈরির কারখানা। আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে গার্মেন্টেস শিল্পে কোন শিশু শ্রমিক নেই। সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় দেশের বড় চারটি বিভাগীয় শহরে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কি পরিমাণ শিশু কাজ করছে তার একটি জরিপ সম্পন্ন করেছে। আইএলও এর সহযোগিতায় প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিভাগীয় কমিশনারের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক, ইউএনও, বিভিন্ন বেসরকারি এবং সামাজিক সংস্থার সমন্বয়ে জনসচেতনতামূলক সেমিনার করেছে। শিশুশ্রম নিরসনে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করেছে। শিশুদের উন্নয়নে কাজ করে এমন সকল মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, এনজিওদের সমন্বয়ে জাতীয় কমিটি কাজ করছে। শিশুশ্রম নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদী এই তিনভাগে ভাগ করে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অবশ্যই ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্র্ণ শিশুশ্রম এবং ২০২৫ সালের মধ্যে সকল প্রকার শিশুশ্রম নিরসন করতে হবে। সরকারও বদ্ধ পরিকর। এ লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ঝুঁকিপূর্র্ণ শিশুশ্রম প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ে এসে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের আওতায় বাড়ছে। ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেক এ প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ২ লাখ শিশুকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্ত জীবনে ফিরিয়ে আনা হবে। এর মধ্যে এক লাখ শিশু পাবে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা আর এক লাখ পাবে কারিগরি প্রশিক্ষণ। সেই সঙ্গে প্রতিমাসে দেয়া হবে এক হাজার টাকা করে বৃত্তি। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। চলতি বছর থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এর আগে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে নিয়োজিত ৯০ হাজার শিশু শ্রমিককে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং তাদের বাবা-মাকে ক্ষুদ্র ঋণ দেয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে হাজার হাজার মেহেদী পাবে শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ। প্রচার প্রচারণায় বাড়বে জনসচেতনতা। মেহেদীদের বাবা-মা, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রতিটি বাবা-মা তাদের সন্তানদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে ফিরিয়ে এনে স্কুলে পাঠাবেন। নিজেরা কষ্ট করে হলেও তাদের সন্তানকে শিক্ষিত করবেন, প্রশিক্ষিত করবেন। ২০২১ সালের পর ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আর কোন শিশু থাকবে না। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি শিশু প্রশিক্ষিত জনসম্পদ আর শিক্ষিত জাতি হিসেবে গড়ে উঠবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবো, এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের। (পিআইডি- শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক ফিচার)
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত