শিরোনাম

দেশ হোক দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ

রায়হান আহমেদ তপাদার  |  ০১:৫০, মার্চ ১৩, ২০১৮

দেশে দুর্নীতি রোধে সবসময়ই ভালো ভালো উদ্যোগ নেয়া হয়। কাজের বেলায় দেখা যায় ঠন্ঠনাঠন। দুর্নীতি রোধে অনেক আওয়াজ ওঠে কিন্তু দুর্নীতি বন্ধ হয় না। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে দুর্নীতিবাজরা। এবার যেন তা না হয় এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তবে এবার একটু আশার আলো দেখছি আমরা। গোয়েন্দারা ছদ্মবেশে বিভিন্ন সরকারি দফতরের কোথায় কিভাবে দুর্নীতি হচ্ছে, সরকারি অর্থের বেহাত হচ্ছে কিনা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে আসা মানুষের কাছে কোন কোন কর্মকর্তারা ফাইল বা কাজের বিনিময়ে ঘুষ নিচ্ছে এসব নিয়ে কাজ শুরু করেছে দুদক। দুদকের চেয়ারম্যান অনেক সৎ জীবনযাপন করেন বলেই জানি। দেশে দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। দুর্নীতির ব্যাপারে সরকার কঠোর হচ্ছে। সরকারের সেবাদানকারী সেক্টরসহ ২৫টি সেক্টরে দুর্নীতির উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মাঠে নামছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। গেল বছর শিক্ষা খাত ও ভূমি খাতে দুর্নীতির উৎস, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজদের তালিকা তৈরি করার পর এ বছর ২৫ সেক্টরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে দুদক এমন সংবাদই সেদিন পত্রিকায় দেখলাম। স্বাস্থ্য, যোগাযোগ খাত, পাসপোর্ট অধিদফতর, সিটি করপোরেশন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ সেবা খাতের এসব প্রতিষ্ঠানে ঘুষ বাণিজ্য, হয়রানি, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে অবস্থান নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গোয়েন্দা ইউনিট। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা ইউনিট গঠনও করা হয়েছে। এ টিমে সৎ, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ গোয়েন্দা ইউনিট ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে। প্রশ্ন হলো এর পরও কি দুর্নীতি কমবে? রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত হতে পারবে কি দুর্নীতি দমন কমিশন? দেশে দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। দুর্নীতি রোধ হওয়া দরকার। সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে এটা ভালো কথা তবে তা যেন বজ্র আটুনি ফঁস্কা গেরো না হয়। সরকারকে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর হতেই হবে। তা না হলে স্ব-উদ্যোগে পদ্মা সেতু, দেশজুড়ে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলে, এক্সপ্রেসওয়ে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সকল উন্নয়ন প্রাপ্তি ভেস্তেই যাবে। দুর্নীতি রোধে সরকারকে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। খুঁজে খুঁজে দুর্নীতিবাজদের বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দেশের সাধারণ ব্যক্তি থেকে শুরু করে মন্ত্রী এমপিরাও দুর্নীতি করলে যেন রেহাই না পায় তার ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। যতদূর জানি তিনি এবার নড়ে চড়ে বসেছেন। কোন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকলে তিনি দুর্নীতিবাজদের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও দুর্নীতি রোধে সকলকে কঠোর হতে বলেছেন। এ ধরনের বক্তব্য দুর্নীতি বাজদের ভিত কাঁপাচ্ছে। গোয়েন্দারা সরকারি দফতরের ঘুষখোর কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করছেন। কি জানি কি হয় এভয়ে তটস্থ আছেন অসৎ কর্তাব্যক্তিরা। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ সমাজের উঁচু পর্যায়ের মধ্যে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ আসছে তাদের বিষয়েও খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করেছেন। দুর্নীতিবাজদের দুর্নীতির উৎস, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে দুদক। গেল বছরের চেয়ে নতুন বছর (২০১৮) দুদক আরও গতিশীল হয়ে দুর্নীতি দমনে কাজ করবেন। তা যেন সফলতার সাথে হয় সেদিকে সংশ্লিষ্টদের সজাগ থাকতে হবে। দেশে সম্পদ পাচার একটি বড় সমস্যা। দুর্নীতি দমন কমিশন এ বছর সরকারি অর্থ-সম্পদ অপচয়ের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে। দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন বন্ধ হওয়া দরকার। দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টি চলমান। সরকার চেষ্টা করছে তা মনে হয়। মূল কথা হলো, দুর্নীতি হওয়ার আগেই যাতে দুর্নীতি বন্ধ ও প্রতিরোধ করা যায়। ব্যাংকিং সেক্টরে কেলেঙ্কারি বাড়ছে। অর্থ খাতে দুর্নীতি খুবই বাজে বিষয়। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি খুবই দৃশ্যমান। গত বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির উৎস প্রকাশের মাধ্যমে শিক্ষা খাতের দুর্নীতি খুঁজে বের করে দুদক। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে প্রায় ৬ শতাধিক সরকারি শিক্ষকের তালিকা করা হয় যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে দুর্নীতি করে আসছিল। ওই সব শিক্ষকদের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এছাড়া ভূমি অফিসে কিভাবে খাজনা, পরচা ও নামজারির মাধ্যমে দুর্নীতি হয় এবং কোন কোন ভূমি অফিসে কোন কোন কর্মকর্তারা ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত তার একটি তালিকাও হয়। এ বছর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, স্বাস্থ্য অধিদফতর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, রেল যোগাযোগ, নৌপথ যোগাযোগ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, পাসপোর্ট অধিদফতর, সিটি করপোরেশন, কারা অধিদফতরসহ সরকারি ২৫টি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির খাত বের করে সেগুলো বন্ধে সুপারিশ করবে দুদক। এসব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তালিকা করার পাশাপাশি দুর্নীতি বন্ধে শুদ্ধি অভিযানও চালাবে দুদক। দুর্নীতি দমনে সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক টিমগুলোকে আরও সচল করতে হবে। এ কথা সত্য যে, চুনোপুটি পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে অনেক বড় বড় দুর্নীতিবাজ। এদিকে অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে ইচ্ছে থাকলেও বড় ধরনের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদক কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এখানেই আমাদের ভয়। দুর্নীতি রোধ হবেতো? এছাড়া দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দুদকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়। আত্মশুদ্ধি না হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অনেক কঠিন হবে। দেশে দুর্নীতি চলতেই থাকবে। অনেকেই বলে থাকেন দেশে দুর্নীতির চাষ হয়। তাতো হয়ই। তা প্রমাণে বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া দু’একটি উদাহরণ টেনে আনতে চাই। ‘ময়মনসিংহে ঘুষ গ্রহণকালে গ্রেফতার ভূমি কর্মকর্তা’, “চট্টগ্রামে ৫ লাখ টাকা ঘুষসহ গ্রেফতার প্রধান প্রকৌশলী” -এ সংবাদ দু’টি বলে দেয় দেশে ঘুষ গ্রহণ দেদারছে চলছে। ঘুষ বন্ধে ১২২ ভাগ বেতন বাড়ালেন প্রধানমন্ত্রী কিন্তুু তাতেও সরকারি অফিস আদালতের ঘুষ গ্রহণ বন্ধ নেই। এটা আমাদের চারিত্রিক দোষ বটে! প্রধানমন্ত্রীর কথা যদি বুঝে থাকি, তাহলে এ প্রশ্নের জবাবে বলতে পারি, আমাদের চিন্তা, চেতনা এবং সব কর্মকান্ডের ভেতর থেকে এ আবর্জনাকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। আগাছা পরিষ্কারের মধ্য দিয়ে সমাজ থেকে দুর্নীতিকে উচ্ছেদ করতে হবে। যদি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, কোথা থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদ করা হবে? সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য আমাদের রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলা আর দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনেরও কোনো বিকল্প নেই।
তাছাড়া দেশে রাজনৈতিক দল, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও ভূমি সেবায় উদ্বেগজনক হারে দুর্নীতি বেড়েছে বলে পত্রিকায় সব সময়ই খবর বের হয়। বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান করছে। এ দেশের মানুষের ধারণা, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিপ্রবণ খাত বা প্রতিষ্ঠান হলো- রাজনৈতিক দল ও পুলিশ। এর পরের খাতই হলো বিচার ব্যবস্থা। এমন অবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “এই বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে” এমন ঘোষণা দিতেই পারেন। বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য আমাদের সবার মানসিকতার পরিবর্তনেরও কোনো বিকল্প নেই। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালনের অবকাশ রাখেনি। সমাজ ও রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা দেশের জনগণের মনে তীব্র হতাশার সৃষ্টি করেছে, দুর্নীতির পথে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে সৃষ্টি করেছে বাধা। যতদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভূমিকা কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে না, সমাজে দুর্নীতির ব্যাপক দৌরাত্মের প্রতাপ আমাদের দেখে যেতে হবে। দুর্নীতির যে ধারণা আমরা সৃষ্টি করেছি, সেই ধারণাকে বদলাতে হবে আমাদেরই। আর তা করতে হবে কথাকে কাজে পরিণত করার মাধ্যমে। বাংলা নামের এদেশ আমাদের সবার, তাই আমাদের সবার মিলিত প্রতিরোধে সমাজের সব অনাচার দূর করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও সঠিক ভূমিকা থাকতে হবে। সুতরাং এসব বিষয়ে সরকার জনতার ন্যায্য সমর্থন পাবে বলেই আমার বিশ্বাস। বর্তমান সরকারের সাফল্যের অনেক নজির আছে তা অস্বীকার করার জো নেই। দেশের দুর্নীতির ব্যাপকতা জনগণের মনে যে পরিমাণ হতাশার সৃষ্টি করে তা তুলনাহীন। এ হতাশা লাঘবে সরকারকে যে কোন মূল্যে দুর্নীতি রোধে সচেষ্ট হওয়া দরকার। দুর্নীতি কেবল ওপর মহলে হয় তাই নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে দুর্নীতির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এই অংশগ্রহণের কারণ সব ক্ষেত্রেই শুধু লোভ নয় বরং অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে ন্যূনতম জীবন-যাপনের প্রচেষ্টা। এই অসহায়ত্বের সাথে যুক্ত হয়েছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃষ্টান্ত, যেখানে দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির সুযোগ নেই বরং জনগণকে মূল্য দিতে হয় সৎ থাকার জন্য। এটা কেন হয়? জনগণের কাছে এই ধারণা ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে যে, সমাজে নীতিবান হয়ে থাকার মাঝে কোনো গৌরব নেই বরং আছে বহু ভোগান্তি। সমাজের সুশীল অংশেও ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে বে আইনি পথে থাকার সুবিধা রয়েছে অনেক। জনগণের মনে এই ধারণা যত ক্রমবিকাশমান হচ্ছে, হতাশা ততো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত