শিরোনাম

ক্রিকেট, তোমাকে স্যালুট

কামাল সিদ্দিকী  |  ১১:২৩, মার্চ ১২, ২০১৮

কোন রান করলেন না তারপরেও দল কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছে গেল! বাধভাঙ্গা জোয়ারের মত সমর্থক আর বিসিবির কর্মকর্তারা ছুটে এলেন। শাবাস বাংলাদেশ। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। সত্যিই এএক অপরুপ প্রাপ্তি, এক ভূবন জয়ের আনন্দ। বুক চেতিয়ে বিজয়ের ভঙ্গিমায় ব্যাট উঠিয়ে মুশফিক জানিয়ে দিলেন পাহাড়ের চুড়ায় আমরা উঠেছি। আমরা পারি এবং পেরেছি। মেহেদির হাতে রং নেই কিন্তু মনের রঙ্গে রাঙ্গিয়ে গেল শ্রীলঙ্কার স্টেডিয়াম। বাঙালি তার বীরত্ব গাথা আরো একবার এঁেক দিল সিংহলজীর প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে। এবিজয় কেবল মাত্র বিজয় নয় এটি আমাদের সকল বড় অর্জনের অন্যতম একটি। মাত্র বিশ ওভারের খেলায় যেখানে বল থাকে মাত্র ১২০টি সেখানেই কিনা রান হলো ২২৪। এই হিমালয়সম রানের দিকে তাকিয়ে তখন লঙ্কান দলপতি দীনেশ চান্দিমাল তখন ফুরফুরে মেজাজে। টি-টোয়েন্টির ইতিহাসে এই রান চেজ করার মত কোন দল নেই। সেখানে বাংলাদেশ? একটু উপেক্ষার হাসিতো ঠোটের কোনায় লেগে থাকতেই পারে। আর লেগেছিল। এ দিকে যে দলের বিরুদ্ধে তারা এই রানের পাহাড় গড়েছে তাদেরকে এইতো সেদিন দুটি টি-টয়েন্টিতে নাস্তানাবুদ করে এসেছে।আর তা তাদের দেশের মাটিতেই। একথা তখনো জ্বলজ্বল করছে শ্রীলঙ্কার আকাশে। বেশকিছুদিন ধরে বাংলাদেশ জয় বঞ্চিত। একটি জয়ের জন্য যখন তারা মুখিয়ে তখন তাদের সামনে এই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে লঙ্কানরা আর একবার মনে করিয়ে দিতে চাইছিল, থাম বৎস থাম আমরা হলাম গিয়ে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! বর্তমান সময়ের ত্রাস ভারতকেও আমরা হারিয়েছি হেসে খেলে। তাদের দেওয়া টার্গেটকে আমরা অতি সাধারণ করে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছি। তোমাদের সবদর্প আর গর্ব ভাঙ্গতেই দেশ প্রেমের দোহাই দিয়ে ফিরিয়েছি তোমাদের কোচকে। বলো আর কি চাই? যার অধীনে এতোদিন বাংলাদেশ- টিম বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিলো। যার হাত ধরে দলটি তাদের বিজয় রথ চালিয়েছে। সেই কারিগর যে এখন তাদের মহানায়ক। তারই প্রত্যক্ষ তত্বাবধনে এখন তারা বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর। হাথুরাসিংহে। নামের সাথে সিংহ জড়িয়ে আবার শ্রীলঙ্কান দলের প্রতীক এই সিংহ। সেখানে বাঘের থাবা উফ নস্যি। ঠিক এমন তৃপ্তি আর জয়ের সুবাস নিয়েই লঙ্কান দলপতি ও তাদের কোচ বিরতিতে গিয়েছিলেন। জয়তো তখন হাতের মুঠোয়। আর সেই সুবাস থেকে তারা মাত্র ২০ ওভার তথা ১২০ বল দুরে। শ্রীলঙ্কার পতাকা নিয়ে তার সমর্থকদের সেকি উচ্ছাস আর উল্লাস। বোলারদের সাহস জোগাতে উৎসাহ দিয়ে প্রস্তুত করছে লড়াই করার মানসিকতা। আর শ্রীলঙ্কার টিম ম্যানেজমেন্ট আরো ফুরফুরে মেজাজে । ব্যাটসম্যানেরা তাদের দায়িত্ব প্রত্যাশিতভাবে শেষ করেছেন। কোচের মুখে লম্বা হাসি। জয়ের পর কিভাবে সেটি সেলিব্রেট করবেন তারও একটা পরিকল্পনা তাদের তৈরি করা আছে। এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা বাকি। লঙ্কানদের জয়ের উচ্ছাস আর প্রত্যাশা তাতে বাগড়া দিয়েছে আমাদের টাইগারেরা। এদিন তারা সত্যিই টাইগার হয়ে ঝাপিয়ে পড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিলো সিংহের শরীরকে। সেই গল্প যার হাতে তৈরি হলো সেই তিনি আমাদের মুশফিক প্রিয় রহিম। ৩৫ বলের টর্ণেডো ইনিংসের ৭২ রান এ যেন পাবলো নেরুদার হাতের তুলি। ইচ্ছেমত তার ব্যবহার করে তিনি উপহার দিলেন স্বপ্নের জয়। অবদানে হাত রেখেছেন লিটন দাস, তামিম। এই জুটিই আমাদের জয়ের কক্ষপথে রেখেছিলো। সে কক্ষপথেই এলো বিজয়ের হাসি। তোমাকে স্যালুট ক্রিকেট, তোমাকে স্যালুট।
কথায় আছে বনের রাজা সিংহ। তবে বাঘের ক্ষিপ্রতাকে অস্বীকার করা যাবেনা বলেই বিধাতা অলক্ষ্যে দাড়িয়ে হেসেছিলেন। এই রান তাড়া করতে হলে যে চিতার গতিতে এগুতে হবে এই মন্ত্রটি সেদিন টাইগাররা বেশ ভালোভাবেই পাঠ করেছিলো। ব্যাুিটংএ নেমেই সেই লক্ষ্যপূরণের লড়াই শুরু। হয় মন্ত্রের সাধন না হলে শরীর পতন। খেলার শুরুতেই ওপেনার লিটন দাস আর তামিমের ব্যাটে খই ফুটতে থাকে। চার ছয়ের ফুলঝুরি ছুটিয়ে এগিয়ে চলে বাঙালির রথ। লিটনের এই সংহার মুর্তি দেখে চুপসে যায় লঙ্কান বোলাররা। লেন্থ লইনের হিসাব নেই। মারা বল পেলে মারো, পাঠিয়ে দাও বাউন্ডারির বাইরে অথবা সোজা গ্যালারিতে। ব্যাটসম্যানদের এই সংহার মুর্তি দেখে নড়ে চড়ে বসে গ্যালারি। যারা ভেবেছির এই রানের নীচে চাপা পড়ে বাংলাদেশ দম আটকে মরবে তারা অবাক হয়ে দেখলো বাঙালি ব্যাটসম্যানদের বাহারি স্ট্রোকের ফুলঝুরি। তরতর করে রানের গ্রাফ উর্দ্ধমুখী। তবে বিজয় থেকে তখনো অনেক দুরে। অতি বিশ্বাসী বাঙালী সমর্থকও সেটি চিন্তায় আনতে পারেননি। কিন্তু কথায় আছে অসম্ভবকে সম্ভব বানাতে বাঙালির জুড়ি নেই। সে তার প্রমাণ বহুবার দেখিয়েছে। ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে আবার প্রিয় নেতার মুক্তির জন্য রাজপথে লড়াই করেছে । সর্বশেষ স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ রক্ত অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে। ফকির আলমগীর তাই গাইলেন, আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়/ আমি দাম দিয়ে........
এই সেই মার্চে যার সূচনা আর ডিসেম্বরে যার প্রসব। ‘বাঙালির এক নেতা অবিভক্ত ভারতের বাঙালি সুভাষ বোস বলেছিলেন গিভ মি ব্লাড আই উইল গিভ উই ফ্রি-ডোম।‘ তবে তখন সে রক্তে কোন সুফল বয়ে আনেনি। কারন,বাঙালিদের সম্পৃক্ত করা এবং উজ্জীবিত করার মত কোন মহানায়ক সেদিন ছিলো না। তবে শতাব্দী শেষের আগেই তার বাস্তবায়ন। মহানায়কের জন্ম হলো। এই বাংলার ফরিদপুরে। মহাকুমা গোপালগঞ্জ আর থানা ছিলো কোটালিপাড়া। তিনি বললেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তবে তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকবেলা করবে। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশে আল্লা।’ তাই বুঝি নিজেদের সামর্থের উপর ভরসা রেখেই লিটন আর তামিম টর্নেডো বইয়ে দিলেন শ্রীলঙ্কার উপরে। ওরা করেছিল ২১৪। জিততে চাই ২১৫। প্রেমাদাসায়। সিঙ্গেল নিয়ে দলকে জিতিয়ে দু হাত উঁচিয়ে হুংকার ছুঁড়লেন মুশফিকুর রহিম। প্রায় ৩০ হাজার দর্শকে ভরা গ্যালারি স্তব্দ। সেই নীরবতায় মুশফিকের গর্জন আরও তীব্র ভাবে ছড়িয়ে গেল চারপাশে। এ যেন হারের বলয় ভাঙার চিৎকার। দুঃসময়কে পাল্টা জবাব দেওয়ার চিৎকার। অসাধারণ এক জয়ের আনন্দ-চিৎকার। ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে জেতালেন মুশফিক। এসবই তুলে রেখেছিলেন হৃদয়ের নীল ক্যানভাসে। যেখানে বেদনা জমা থাকে। মোক্ষম সময়ে উইলোকে তুলি বানিয়ে মুছবেন বলে!
উইনি শটের প্রতি ব্যাটসম্যানদের লোভ থাকবেই। আর চার কিংবা ছক্কায় ম্যাচ শেষ করে আসলে তো কথাই নেই! মুশফিকুর রহিম ঠিক এটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু সেদিন এই আবেগটুকু সামলে রাখলে কি হতো বা হতে পারতো? এদিনের ম্যাচ দেখে ‘হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে’ ইচ্ছে করছে শ্রীলঙ্কার জন্য । গুরু হাতুরুসিংহের অনুভূতি হয়তো এমনই ছিলো। কারন, পুরাতন শিয্যদের কাছে নিজের কোচিংএর এমন পরিনতি হবে তাকি তিনি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন? যে পরীক্ষায় অনায়াসে উৎরে গেলেন লিটন তামিম,রিয়াদ মোস্তাফিজ আর মুশফিকের। শেষ ওভারে সবার চার ওভার শেষ হয়ে যাবার ফলে থিসারা পেরেরার হাতে বল তুলে দেন শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক । তখন যে বাংলাদেশ নতুন মাইল ফলকের একেবারে ই দ্বারপ্রান্তে।
শেষ ওভারে দরকার ১১ রান। প্রথম তিন বল থেকেই ৯। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে মুশফিকের টানা দুই বাউন্ডারি।শেষে সেই নাগিন নৃত্য ? আহ কত সুন্দরই না ছিলো এদিনের এই বিজয় উৎসব। সারা বাংলা আর তার ষোলকোটি মানুষের আকাঙ্খাকে ঘাড়ে করে মুশফিক যে সিঙ্গেলসটা নিয়ে এপ্রান্তে এলেন তখন মনে হল বঙ্গোপসাগরের সব জল ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়েছে প্রেমদাশায়!!!
জয়তু বাংলাদেশ জয়তু ক্রিকেট।
লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, কলামিস্ট, কবি এবং ছোটগল্পকার
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত