শিরোনাম

নারীর ক্ষমতায়ন এবং ক্রমবর্ধমানভাবে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী  |  ১৩:২০, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮

যুগ যুগ ধরে এ দেশের নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। চিরকাল তারা পুরুষের নিয়ন্ত্রণে অবস্থান করেছে। বিশেষ করে, পুরানো যুগে নারীর অবস্থান ছিল কেবল ঘরের ভিতরে। না ছিল শিক্ষার সুযোগ, না ছিল ঘরের বাহিরের কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ। আমরা বেগম রোকেয়ার অবদান এর কথা ভুলতে পারি না। বাঙ্গালী মহিলাদের ঘরের বাহিরে গিয়ে লেখা পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন এই মহিয়শী নারী।

আজ বাংলার নারী মুক্তআকাশের নিচে, স্বাধীনভাবে লেখাপড়া করছে, রোজগারের কাজ করছে, দায়িত্ব পালন করছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে, আনন্দ ফুর্তি করছে। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন আসেনি। প্রয়োজন হয়েছে অনেক আন্দোলন, অনেক শ্রম এবং সাহসীকতার পরিচয়।

নারী আন্দোলনের পরিভাষায় “ক্ষমতায়ন” শব্দটির অন্তর্র্ভুক্তি এটাই নির্দেশ করে যে, নারী বুঝে গেছে “ক্ষমতা” ছাড়া তার স্বাধীনতার মূল্য খুব অল্পই। ক্ষমতায়নের মূল প্রবণতা হল : যেসব মৌলিক বিষয়াদি নারীর জীবনকে প্রভাবিত করে সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারই শুধু নয় বরং নারীর নিজের জন্য যেসব বিষয় থেকে নির্বাচনের ধরনটিকেও তার অধিকারের আওতাভুক্ত করা। নারীর আইনি অধিকার থাকাই যথেষ্ট নয় ; সেসব অধিকার চর্চা করার ক্ষেত্রে তার ক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রেক্ষিতে আইনী শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের এক দরকারি মাধ্যম হয়ে ওঠে।

আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেত্রী, স্পিকার, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে রয়েছেন নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ সরকারি সচিব, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন নারী। নারীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বিভিন্ন সংগঠনে। নারী কেবল শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী অথবা চিত্র শিল্পী নন। নারীরা পাইলট হিসেবে উড়োজাহাজ চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশ রেলওয়েতে ট্রেন চালক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। আজ বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসা, বাণিজ্যে সুনাম অর্জন করেছে। মিল কারখানা স্থাপন করে দুস্থ মহিলাদের চাকরি দিয়ে তাদের সংসার চালাচ্ছে। রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। বিদেশে বাংলাদেশের পণ্যের সুনাম ও চাহিদা বৃদ্ধি করেছে। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য তারা প্রাণপণ পরিশ্রমের দ্বারা আদায় করছে।

যদি ফিরে যাই সেই ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ এর ঘটনায়, যেদিন যুক্তরাষ্ট্রের সুঁচ কারখানার নারীরা প্রতিবাদ করেছিলেন অধিকারহীন কর্মজীবনের। সেই প্রতিবাদ তিলে তিলে নারীর শ্রমের চেতনায় ও মূল্যায়নে এমন প্রভাব ফেলেছিল যে ১৯৯০ সালে ৮ মার্চকে আমরা পাই আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে। আমরা জানি যে, যদিও অর্ধশতকেরও বেশী সময় লেগেছে তবুও গর্ব করি যে নারীর প্রতিবাদী ও সংগ্রামী শক্তির প্রতীক হিসাবে একটি দিন চিহ্নিত হয়েছে ইতিহাসে, গবের্র উজ্জ্বল, সুদৃঢ় স্থান করে নিতে। শুধু নারী শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার চিহ্ন হিসেবে নয়, ৮ মার্চ নানা পরিক্রমায় আজ বরং বিশ্বব্যাপী নারী মুক্তির, নারী স্বাধীনতার, নারীর সাধিকারের স্বীকৃতির পরিচয় ধারণ করে থাকে।

দশকের পর দশক আজ প্রাণপণ সাধনায় আরও কত নারী সংগ্রাম করে চলেছেন মানব সমাজে তার পাপ্য স্থানটুকু পাওয়ার জন্য। কাজ করে চলেছেন গ্রামে-গঞ্জে শহরে-নগরে পাওয়ার জন্য একটু কাজ, একটি নিশ্চিত বাসস্থান, কিছু উপার্জন আর সেই উপাজর্নের ওপর নিজের অধিকার। আর একান্ত নিজের শরীরের উপর তার নিয়ন্ত্রণ, নিজের জীবন সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য।

বাংলাদেশে বর্তমান সময়ের উল্লেখ্যযোগ্য ও চমকপ্রদ উন্নয়নের মধ্যে, যেখানে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে রূপান্তরিত হচ্ছে এই দেশ; যেখানে নারীদের প্রতিনিয়ত “কিছুই না পারার” অনুযোগ থেকে মুক্তি, এত তার প্রতিদিনের সংগ্রাম। তারা অন্তর্নিহিত শক্তির জোরে এগিয়ে যায় অনেক খানিই আবার চতুস্পর্শ্বের বৈরিতা তাকে ঠেলে দেয় পিছনে। বাধ্য করে হাল ছেড়ে দিতে। দুর্বৃত্তের দাপটে ফতোয়ার নৃশংসতার ক্ষতবিক্ষত হতে হয় অথবা হওয়ার আশঙ্কা বুকে চেপে বাঁচতে হয়। এর মাঝেও শপথ থাকে একটি মানব জীবনের পূর্বসূরিদের নিরন্তন আহক্ষান, প্রণোদনা আর উদাহরণ - বাঁচিয়ে রাখে তার সামনে চলার প্রতিজ্ঞা।

‘‘ক্ষমতা” ব্যতীত নারী স্বাধীনতা মূল্যহীন হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতার বা ক্ষমতায়নের যে ব্যাখ্যা তাতে বোঝা যায় যে, প্রতিদিনকার জীবন-যাপনে শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারই নয় বরং কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তার ধরন নির্বাচনেও নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। নারীর আইনি অধিকার থাকাই যথেষ্ট নয় বরং সেসব অধিকারের চর্চা করার ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ ক্ষমতার স্বীকৃতি ও অধিকার চর্চার সক্ষমতা নিশ্চিত করাও নারীর ক্ষমতায়নের মধ্যে পড়ে।

সামগ্রিকভাবে নানা নির্দেশিকায়- বিশেষত অর্থনৈতিক, সামজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রাধীন বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বের সব প্রশংসা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এর অনেকটাই নিঃসন্দেহে সম্ভব হয়েছে শ্রম, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অধিকার সচেতনতার সমন্বয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অগ্রসরমানতায় নারীর অবদানের কারণে। অথচ আজও বাংলাদেশে অধিকাংশ নারীকে শঙ্কা ও অভাবের মধ্যে, অশিক্ষা, অবঙ্গা ও নির্যাতনের মধ্যে জীবন কাটাতে হয়।

প্রশ্ন তুলতে হবে নারীর শ্রম, অংশগ্রহণ আর অর্থ উপার্জন তাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, তার অধিকার ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করছে কিনা, নাকি শুধুমাত্র নারীর শক্তি ও উপস্থিতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে ভিন্ন স্বার্থে। নারীর এক বিশেষ সংজ্ঞা পুরুষশাসিত সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যা তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষের পরিচয়ে সমানাধিকারে বা সমান মর্যাদায় দাঁড়াতে দেয় না। নারীকে তার মানুষের পরিচয়ে বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কত কিছুই না করতে হয়েছে। আইন অমান্য, অনশন, ধরণা, হরতাল থেকে শুরু করে আন্দোলন সব পথেই তাকে হাঁটতে হয়েছে।

বাংলাদেশের নারীদের সংগ্রামও বন্ধুর পথ বেয়েই অগ্রসর হয়েছে। সেই ১৯৭২ সাল থেকে এদেশের নারীরা ব্যক্তিগত জীবনে সমান অধিকারের আইনের জন্য আন্দোলন করে আসছেন। বাংলাদেশের সংবিধান জনজীবনে নারীর সমঅধিকারের অঙ্গীকার করলেও ব্যক্তিগত জীবনে নারীরা আইনগতভাবেই বৈষম্যের মধ্যে বাস করতে বাধ্য হন। উল্লেখ করা যেতে পারে, জাতিসংঘের নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের যে সনদ, যা আমরা সহজেই ‘সিডো’ নামে বুঝতে পারি। বাংলাদেশ তা স্বাক্ষর করার পরেও তার ধারা ২ এবং ১৬(১)গ এখনও সংরক্ষণ করে রেখেছে। এসবের ফলশ্রুতিতে নারীর জীবন আজও পুরুষনির্ভর এবং অবমূল্যায়িত। নারীর প্রতি এ ধরনের আইনগত বা সামাজিক বৈষম্য তার বেঁচে থাকার সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলে।

বলা হয় নারীদের উপর পারিবারিক নির্যাতনের হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে এখনও সর্বোচ্চ। বিশেষ করে বলা যায় যৌতুক এর কারণে নারীদের অত্যাচার বেশী করা হয়। বিয়ের সময়, যৌতুক না পেলে, পরবর্তি অবস্থায়, শাশুরী, স্বামী, ননদ সকলে মিলে বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে নববধূর উপর অত্যাচার চালায়, নির্যাতন করে। সরকারের নারী ও শিশু অধিদপ্তর এই সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি করেছেন “এমএসপিভিএডাব্লিউ” প্রতিষ্ঠানটিতে বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা। কোনো খানে যদি কোনো নারী নির্যাতনের স্বীকার হয়, তা হলে এখানে ফোন করলেই অ্যাম্বুুলেন্স এসে নিয়ে যাবে নির্যাতিত নারীকে। দেশের ৭টি সরকারি হাসপাতালে এই বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। নারী নির্যাতন চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে আলাদা চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। যৌতুক না দেওয়ার কারণে নারীদের স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়, অত্যাচার করা হয়, নির্যাতনের স্বীকার হিসেবে অনেক নারী মৃত্যুবরণ করেছে। এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি বালাদেশে এখনও।

আজকাল সকল স্তরের নারীরা চাকরি করছে। কেউ সংসার বাঁচাতে, কেউ নিজের খরচ মেটাতে, অথবা বৃদ্ধ পিতা মাতার সেবাকার্য করতে। চাকরিতে যাওয়ার পথে অহরহ নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। কখনো ধর্ষণ, কখনও শারীরিক নির্যাতন, কখনও অশ্লীল ভাষায় নারীদের অপমান করা হচ্ছে। পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের প্রায় নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়। টাংগাইল এর জাকিয়া সুলতানা রূপাকে বাস এর মধ্যে পাঁচজন মিলে যে গণধর্ষণ করেছিল সেই বিচার এখনও হয়নি। পত্রিকায় প্রতিদিন অনেক নারীদের উপর নির্যাতনের খবর ছাপা হয়, তবে কয়টা ঘটনার বিচার হয়? ইদানিং অল্পবয়স্ক নারীরা পুরষের দ্বারা আমন্ত্রিত হাটেলে গিয়ে বিপদে পড়ছ। প্রায় শোনা যায় তরুণীরা রাতভর পালাক্রমে ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছে। কে যে আসল বন্ধু বোঝা মুসকিল তাই তরুণীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। অনেক সময় এক বান্ধবী অন্য বান্ধবীকে এভাবে বিপদে ফেলে টাকা অর্জনের জন্য।

অবস্থাপূর্ণ পরিবারের ছেলে মেয়েরা বন্ধুত্ব পাতিয়ে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পরে। কেউ বিয়ে না করে একসঙ্গে বসবাস করে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র মফস্বল থেকে আসা ছাত্রীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং “লিভ টুগেদার” খেলায় বান্ধবীকে নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতে শুর করে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর ক্ষমতায়ন দেখিয়ে এক নারী অপর নারীর বন্ধুর সঙ্গে স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক গড়ে তুলছে আজকাল। এক্ষেত্রে পিতামাতারা অনেক বিপদে পড়তে হয় এবং তাদের বিয়ে দিতে অসুবিধা হয়ে যায়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা শিক্ষার কারণে ঢাকায় আসে, পরবর্তিতে তারা যৌনকর্মী হিসেবে পরিচিত হয়ে বিভিন্ন হোটেলর অতিথিদের সঙ্গে যৌনসঙ্গমে জড়িত হয়। এমন এক সময় আসে যখন এইসব মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। মানুষ যখন জেনে যায় তাদের কর্মকা- তখন তাদের চলাফেরায় বিপদ ঘটে।

আজকাল ক্ষমতায়ন এর দৃষ্টান্তে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নবযুগের বাসিন্দা হিসেবে নিরাপত্তাহীনতার অবস্থার কথা ভূলে, ফ্যাশন করে আধুনিক সাজ পোশাক ও মদ্যপানে আসক্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যৌন মেলামেশার ফলে বিপদ ও ঘটে যখন মহিলার যৌন সম্পর্কিত ছবি ইন্টারনেটে দিয়ে দেয় তার ছেলে বন্ধু।
মেয়েদের অল্প বয়সে বেশী স্বাধীনতা দিয়ে ফেললে পিতামাতাকে পরবর্তিতে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয় যখন অবাদ যৌন মেলামেশার ফলে মেয়েরা সন্তান সম্ভাবা হয়। বর্তমান সমাজে অবাদ মেলামেশার ফলে মেয়েরা নিষিদ্ধ অনেক কর্মকা-ে জড়িয়ে পরে এবং পরে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে যখন সমাজে তাদের বদনাম ছড়ায়।

ক্ষমতায়ন মানে এই নয় যে কেউ ইচ্ছা মত জীবন যাপন করতে পারবে। বাবা- মায়েদের অজান্তে, মফস্বল থেকে কলেজে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা
নারীর ক্ষমতায়ন এবং মাদকাসক্ত হচ্ছে, ইচ্ছামত চলাফেরা করছে, অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলছে অথবা অভিশপ্ত জীবন গড়ে তুলছে। মেয়েদের সঠিক পথে নির্দেশনা দিতে হবে বাবা- মা, আত্মীয়-সজন, শুভাকাক্সক্ষী এবং শিক্ষকদের। আধুনিকায়নের সাথে রাখতে হবে বাঙ্গালী ও ধর্মীয় সংস্কৃতি, ভুল পথে কেউ গেলে কি করতে হবে সেই শিক্ষাও দিতে হবে। মোবাইল ফোনে পরিচয়ের সূত্র ধরে পায় প্রতিদিন প্রেমে পড়ার ঘটনা ঘটছে। ছেলেরা এই সকল কিশোরীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে এর ফলে কিশোরীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

অপরদিকে রয়েছে যে সকল নারী যারা নির্যাতিত হয়ে আজ বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছে। একটি অফিসে অসহায় প্রায় শিশু বয়সের মেয়ে দেখলাম মামলা করেছে তার নিয়োগ কর্তার বিরুদ্ধে। কারণ লোকটা তাকে ধর্ষণ করেছে। দরিদ্র সংসারে বাবা সকল খরচ সামলাতে পারে না, তাই এই ছোটো মেয়েটি চাকরি নিতে এসে একজন অফিসার তাকে ধর্ষণ করেছে। কত লাখ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে সমাজে আমরা কয়টার খবর জানতে পারি?

পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকরা, তাদের কর্মকর্তা এবং পুরুষ শ্রমিকদের দ্বারা নিরিবিলিতে ধর্ষিত হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা বা পুরুষ শ্রমিকের কি চাকরি চাল যাচ্ছে এই ঘটনায়? অপর দিকে কর্মজীবী নারীদের কুৎসিত ভাষায় গালিগালাজ করেন ধর্মের লেবাসদারী জঙ্গি- মৌলবাদীরা। অপরদিকে আধুনিকায়নের যুগে নারীর ক্ষমতায়ন কাজে লাগাতে বিদেশে চাকরি করতে যাচ্ছে বহু নারী। এমন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে যে দেশ সম্পর্ক হয়তো তারা কিছুই জানে না। অনেক মহিলা নিজের পরিবার পরিজন ছেড়ে সম্পূর্ণ একা হাজার হাজার মাইল চলে যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। পরিবারকে, স্বামী সন্তানকে দারিদ্রের হাত থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।

কিন্তু কত যে দুর্ঘটনা ঘটেছে এসব মেয়েদের নিয়ে বিদেশে থাকাকালীন, তারা কিছুই দেশে ফিরে জানায় না, বিদেশে অত্যাচারিত হয়ে তার পুরো তথ্য হয়তো সরকারের নাই জানা নাই। আজ আধুনিকায়নের যুগে দেশে তাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে লাখ লাখ নারী যারা নির্যাতিত হয়েছেন এবং এই অত্যাচার অপমান তারা তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী হিসাবে মেনে নিয়েছে এবং তার বিরদ্ধে প্রতিকার চাইছে। এরা শুধুমাত্র একটি শ্রেণি নয়। রয়েছে তৃণমূল নারী, শহরের উচ্চপদস্থ আমলা, সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রীরা, রয়েছে যৌনকর্মী, দলিত, উভয়লিঙ্গ বা হিজরা সম্প্রদায়ের মানুষ, রয়েছে কিশোরী, আদিবাসী গোষ্ঠী, বস্তিবাসী, তৈরি পোশাক শিল্পের অথবা অভিবাসী শ্রমিকরা। দেশে নারী নীতিমালা প্রণীত হয়েছে।

পারিবারিক জীবনে নারীর উপর যে নির্যাতন এতদিন অপরাধ বলেই স্বীকৃত হত না। আজকে সেই অপরাধের বিরদ্ধে নারীদের পক্ষে সুরক্ষা আইন তৈরি হয়েছে। অর্মত সেন বলেছেন, বহু সাক্ষাৎ প্রমাণ রয়েছে যে বাংলাদেশের মান গুণাগুণের পরিমাপক ও বসবাসের অবস্থা এত উন্নত হয়েছে নারীদের দ্বারা। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, জনগণের সেবা এবং বিশেষ করে শিল্পকারখানার শ্রমিকরা যারা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রগতিশীল, অগ্রসরমান, অসম্প্রদায়িক পরিবেশ সুস্থ্য রাখতে হবে। বাংলাদেশের অভিযাত্রা হবে গণতন্ত্র, আর সাম্যের লক্ষ্যে। তখনই বাংলাদেশ বাচবে মুক্তিযুদ্ধের শর্তে। মনে রাখতে হবে যে যখন ক্রমবর্ধমানভাবে নিরাপত্তাহীনতা লোপ পাবে নারীর ক্ষমতায়ন তখনই সহজে এগিয়ে যাবে। লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত