শিরোনাম

করপোরেট ট্যাক্স না কমানোর মূল্য কত?

আবু আহমেদ  |  ১২:০৩, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

বাংলাদেশের ট্যাক্সহার নিয়ে অতি সামান্যই কথা হয়। ইদানীং অর্থনীতিবিদরা খেলাপি ঋণ নিয়ে অনেক সোচ্চার হয়েছেন। দারিদ্র্য নিয়েও অনেক গবেষণা হয়েছে। অর্থনীতি বড় হচ্ছে, তার ফল হিসেবে দারিদ্র্য কমছে। তবে এখনো অনেক লোক দারিদ্র্য-দারিদ্র্যমুক্ত প্রান্তসীমায় আছে। চালের মূল্য বাড়লে কয়েক লাখ আবার দারিদ্র্যসীমায় প্রবেশ করে। গবেষণা সংস্থা সানেম বলেছে, চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন করে পাঁচ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। এ সংখ্যা কমবেশি হবে। তবে চালের মূল্যের সঙ্গে যে দরিদ্র হওয়া না-হওয়ার একটা সম্পর্ক আছে, সেটা তো সত্যি। দেশের অর্থনীতি বড় হয়ে এখন ২৫০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ৭ শতাংশ হারে যদি এ অর্থনীতি বাড়ে, তাহলে বছর বছর ২০০ মিলিয়ন ডলার যোগ হবে। অংকের হিসাবে আমাদের গড় অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। তবে সত্য হলো, যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ওপরের ১০ শতাংশ লোক তার ৫০ শতাংশের মালিক হচ্ছে। অতি ধনী হওয়া দোষের কিছু নয়। বরং বাজার অর্থনীতিতে ধনী হওয়ার দৌড়ে সফল যারা, তাদেরকে বাহবা দেয়া হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধনী হওয়ার দৌড়টা পরিষ্কার নয়, অনেকটা ত্রুটি বা কলুষিত। ট্যাক্স না দিয়ে, ব্যাংকের অর্থ লুট করে, ইচ্ছে করে ঋণখেলাপি হয়ে অনেকেই শীর্ষ ১০ শতাংশে জায়গা করে নিয়েছেন। শীর্ষ ১০ শতাংশের লোকেরা আবার অর্থ পাচারও করছেন। অর্থ পাচারের বিষয়টিকে আমরা যতটা ঘৃণা করি, তার থেকে কম ভাবি কেন অর্থ পাচার হচ্ছে সেটার কারণ নিয়ে। ছোট ও অস্থির অর্থনীতি থেকেই অর্থ পাচার হয় বেশি। এটাই সব গবেষকের গবেষণার ফল। অন্য যে কারণে অর্থ পাচার হয়, সেটা ট্যাক্সহার বেশি থাকলে এবং বিনিয়োগ করার জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্রের অভাব হলে। উপযুক্ত ক্ষেত্র সরকারকেই তৈরি করতে হবে। শুধু তৈরি পোশাক রফতানি করে আমরা যে পর্যন্ত যাওয়ার কথা, ওই পর্যন্ত প্রায় চলে গেছি। ট্যাক্সহারের বিষয় নিয়ে ব্যবসায়ীরাও তেমন মাথা ঘামান না। এজন্যই যে, তাদের মধ্যে অনেকেই ট্যাক্সই দেন না। দিলেও ব্যাপক ফাঁকি দিয়ে অল্প ট্যাক্স দেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন বড় বাধা হলো অর্থনীতির বিচ্ছিন্নতা। যতদিন বহুজাতিক ট্রেড নেগোসিয়েশনের এজেন্ডাটা সবার সামনে ছিল, ততদিন বাংলাদেশ মনে করেছিল, দোহা রাউন্ডের ওই গ্লোবাল ট্রেড নেগোসিয়েশনের মাধ্যমেই আমরা অন্য অর্থনীতিগুলোয় শূন্য শুল্কের কোটাবিহীন অবস্থায় আমাদের তৈরি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে পারব। এখন স্বপ্নের সেই দোহা রাউন্ড মৃত। এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গন মুক্তবাণিজ্য ও বিনিয়োগের ফ্রি প্রবেশের বিরুদ্ধে মূল এজেন্ডা থেকেই সরে গেছে। এর মূল কারণ হলো, যারা দোহা রাউন্ডের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল, তারাই এখন আর গ্লোবাল ফ্রি ট্রেডের এবং ফ্রি ফ্লো অব ইনভেস্টমেন্টের পক্ষে নেই। তারা এখন লাভ দেখছে সংরক্ষণবাদ বা প্রোটেকশনিজমের মধ্যে। যারা একদিন তাদের অর্থনীতিকে খুলে দিতে ইতস্তত করেছিল, তারাই এখন চাইছে দোহা রাউন্ডের সফল সমাপ্তি। চীন এখন বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় আন্তর্জাতিক প্রবর্তক। একসময়ের লিডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মি. ট্রাম্পের অধীনে তার নিজের দেশের বেকারত্বের জন্য দায়ী করছে ফ্রি ট্রেড এবং ফ্রি ইনভেস্টমেন্টকে। পৃথিবী কত দ্রুত বদলে গেছে! আমরা যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপকদের বই পড়তে পড়তে একটা ধারণা লাভ করেছিলাম যে, গ্লোবাল ফ্রি ট্রেড হলে সবার জন্য মঙ্গল হবে। বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বের সব দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। অধ্যাপকদের সেই যুক্তিগুলো এখনো সত্য। তবে পার্থক্য হলো, তাদের দেশের নির্বাচিত নেতা, যিনি নিজেও একজন ব্যবসায়ী। তিনি এবং তার রিপাবলিকান সমর্থকরা বুঝলেন মুক্তবাণিজ্য হলে তাদের আর সুবিধা হবে না। বরং মুক্তবাণিজ্যের সুবিধা নিয়ে আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক ছোট অর্থনীতি উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে চলে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো কিছু নয়। দোহা রাউন্ডের মাধ্যমে যারা একদিন আমাদেরকে লেকচার দিতেন তোমরা মুক্তবাণিজ্যের পথে হাঁটো, আমরা দেরিতে হলেও বুঝলাম ওই হাঁটার মধ্যে লাভ আছে, কিন্তু আমরা যখন বুঝলাম ওই হাঁটার মধ্যে লাভ আছে, তখন যারা আগে লেকচার দিত, তারা আজ উল্টো পথে হাঁটছে। দোহা রাউন্ডকে মৃত ভেবেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে। বাংলাদেশের ব্যর্থতা হলো, অনেক বেশি সময় ধরে দোহা রাউন্ডের পথ চেয়ে বসে থাকা। দ্বিপক্ষীয়-আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য এবং বিনিয়োগ যুক্তি নিয়ে মোটেই এগোতে পারেনি। ভুটানের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট করে বাংলাদেশের লাভ নেই। এমনকি নেপালের সঙ্গেও। ভুটানের জিডিপির আকার হলো ২ বিলিয়ন ডলার আর নেপালের ২০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ভুটানে ও নেপালে কী বেচতে পারে এবং কত টাকায়? ফ্রি ট্রেডের পক্ষে চীনের প্রস্তাবকে বাংলাদেশের বিবেচনায় নেয়া উচিত। আমি জানি না, কোন বাস্তবতা বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছে। ভারত যদি এমন একটা প্রস্তাব দেয়, তাহলে সেটাও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। চীন আমাদের অর্থনীতিকে যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারবে, অন্যান্যের সেই ইচ্ছে ও সক্ষমতা নেই। বাংলাদেশকে হতে হবে বড় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন থাকলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা যেমন থাকবে, তেমনি অর্থনীতি থেকে পুঁজিও পাচার হবে। অন্য ইস্যুটি হলো ট্যাক্সহার। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দেখতে হবে প্রাচ্যের অন্য দেশগুলো কী করছে। একসময় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ট্রেড ওয়ার বা বাণিজ্যযুদ্ধ হতো। আর এখন শুরু হয়েছে ট্যাক্স ওয়ার বা ট্যাক্সযুদ্ধ। ট্যাক্স ওয়ারটা আবার পিছে পড়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন সেই দেশের কোম্পানিগুলোর আয়ের ওপর যা করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স হিসেবে পরিচিত ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২১ শতাংশে নিয়ে এলেন, তাদের আইনসভা কংগ্রেসের মাধ্যমে এটি সমর্থিত হয়ে ৩১ বছরের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ট্যাক্স-কাট বিল এখন আইনে পরিণত হয়েছে। কেউ কি ধারণা করতে পেরেছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ব্যবসায়িক লাভকে এত বড় ছাড় দেবে? এখন তাদের শেয়ারবাজার ওয়াল স্ট্রিট তুঙ্গে। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত, ধনীরা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টি বোর্ড সবাই খুশি। মার্কিনিদের এ ট্যাক্স কাটের পক্ষে আইন প্রণয়ন দেখে সারা ইউরোপ নড়েচড়ে বসেছে। তারা বলতে চাইছে, এটা আরেকটা অর্থনৈতিক যুদ্ধ। এরইমধ্যে ইউরোপিয় ইউনিয়নও কম ট্যাক্স রেটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ব্রিটেন ইইউ থেকে বের হয়ে অনেক চাপের মধ্যে আছে। তাদের অর্থনীতিকে আকর্ষণীয় করার জন্য ব্রিটিশ সরকার করপোরেট ট্যাক্সহার ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের পাশের দেশ ভারত এ হারকে ২৪ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। মিয়ানমারের করপোরেট ট্যাক্সহার ২০ শতাংশ। আর এশিয়ান অ্যাভারেজ হলো ২০ শতাংশের নিচে। এর বিপরীতে বাংলাদেশে করপোরেট আয়কর হলো ৪৫ শতাংশ, ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ, ৪০ শতাংশ, ৩৫ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ। এসব হার কোম্পানি ও সেক্টরভেদে। ধরে নিলাম বাংলাদেশের ব্যবসায়িক মুনাফার ওপর করহার গড়ে ৩৫ শতাংশ, তাহলেও কি এ ট্যাক্সহার বেশি নয়? যেখানে বিশ্বের অর্থনীতিগুলো প্রতিযোগিতা করে ট্যাক্সহার কমাচ্ছে, আমাদের কী যুক্তি আছে এখনো এ হারকে ৩৫ শতাংশে রাখার? ট্যাক্সহার বেশি হলে বণ্টনযোগ্য মুনাফা কমে যাবে এবং বণ্টনযোগ্য মুনাফা কমে গেলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কম হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন বিনিয়োগের ৭০ শতাংশই আসে অবণ্টনকৃত মুনাফা থেকে। অবণ্টনকৃত মুনাফাকে আন্তর্জাতিক ভাষায় বলা হয় রিটেইন্ড আর্নিংস। আমরা বেশি ট্যাক্সহার আরোপ করে কি বেশি রাজস্ব আহরণ করতে পারছি? এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। বিশ্বের কম দেশই বেশি ট্যাক্সহার ধার্য করে বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে পেরেছে। বরং উল্টোটা সত্য হয়েছে। যেটা সত্য সেটা হলো, যত কম ট্যাক্সহার হবে, তত বেশি রাজস্ব আহরণ হবে। ট্যাক্সহার বেশি থাকলে ব্যবসায়ীরা আয়কে লুকান। পুঁজিও অন্য দেশে পলায়ন করে, নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারেন না ব্যবসায়ীরা। ট্যাক্সহারের ক্ষেত্রে গ্লোবাল কম্পিটিশন এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা আশা করি গ্লোবাল ট্যাক্স রেটকে হিসাবে নেবেন। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আয় আহরণ এবং আয়কে কোথায় দেখাবে, তা নিয়ে একবার চিন্তা করুন। তারা যখন দেখে তাদের মূল দেশগুলোয় ট্যাক্সহার অনেক কমে গেছে, তখন তারা বিভিন্ন কৌশলে আয় করবে বাংলাদেশে; কিন্তু নিট আয়কে বর্ধিত করে দেখাবে অন্য দেশে, যেখানে ট্যাক্সহার কম। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মালিক বা শেয়ারহোল্ডাররা একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, তাই তারা ব্যবসাটা বাংলাদেশে করুক বা শ্রীলংকা, ভারত অথবা পাকিস্তানে করুক; তাদের মূল লক্ষ্য হলো, গ্লোবাল শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বেশি করে আয় করা। এই বেশি করে আয় করতে গিয়ে তারা উচ্চ ট্যাক্স হারের দেশ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন কৌশলে আয়কে সরিয়ে যেসব দেশে ট্যাক্সহার কম, সেসব দেশে নিট মুনাফাকে বেশি করে দেখায়, যাতে করে তাদের গ্লোবাল শেয়ারহোল্ডাররা বেশি মুনাফা পায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোন দেশ? বাংলাদেশের মতো উচ্চ ট্যাক্সের অর্থনীতিগুলো। বাংলাদেশ সরকার তাদের থেকে কম ট্যাক্স পাবে এবং সরকার যদি এগুলোর শেয়ারহোল্ডার থাকে, তাহলে কম মুনাফা দেখানোর কারণে কম ডিভিডেন্ড পাবে। তাহলে যারা বলেন, ট্যাক্সহার বেশি থাকলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে, তারা কীভাবে সত্য বলেন। ট্যাক্সহার বেশি হলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নতুন বিনিয়োগ পাবে না। যতটা তারা এ অর্থনীতিতে আয় করবে, ততটা তারা স্থিতিপত্রে শো করবে না। বাংলাদেশের এমন কী দক্ষতা আছে যে, কেনাকাটার মাধ্যমে যে অর্থ পাচার হয় তা ঠেকানোর? বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রতিযোগী হিসেবে থাকতে চাইলে তাকে অবশ্যই করপোরেট আয়কর কমাতে হবে। উচ্চ ট্যাক্সহার বজায় রেখে বাংলাদেশ শুধুই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ধরে নেয়া হোক বাংলাদেশের ৭০ লাখ লোক বিদেশে নেই, ধরে নেয়া হোক তৈরি পোশাক থেকে রফতানি আয় বন্ধ হয়ে গেছে, তখন অর্থনীতির অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? আমরা কি ওই অবস্থাকে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত?

লেখক: অর্থনীতিবিদ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত