শিরোনাম

যৌন হয়রানি রোধে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আইন

মোহাম্মদ অংকন  |  ১০:১৭, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি এখন নারী। তাদের এই সংখ্যা গরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও তারা জনপরিসরে (পাবলিক প্লেস বা জনসমাগম স্থান) প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। পুরুষের হিংস্র হাতের থাবা মুখ বুঝে সহ্য করে যাচ্ছে। যৌন হয়রানি সহ্য না করতে পেরে অনেক নারী আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। এমন আপত্তিকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে অর্থাৎ নারীদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। বিদ্যমান আইনে কিছু বিধান থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সচেতনতারও বিরাট অভাব রয়েছে। ফলে জনপরিসরে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হলে আইনিভাবে তার প্রতিকার আদৌ ভুক্তভোগি নারীরা পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে পেলেও তা খুবই কম পরিমাণ। বিড়ম্বনার মাত্রাও অনেক বেশি রয়েছে। অনেক প্রসাশন আবার রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে। পরিণামে যা হবার তাই হয়। নারীরা একূল ওকূল দু’কূল হারিয়ে হতাশ হয়ে যায়। দেশজুড়ে আইনের এমন অপপ্রয়োগ যৌন হয়রানিকে উস্কে দিচ্ছে। সম্প্রতি একশন এইড বাংলাদেশের গবেষণায় যৌন হয়রানির কলঙ্কজনক পরিস্থিতি ও চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে স্পষ্টত বলা হয়েছে, নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যরা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে সচেতন নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিক দায়িত্ব পালন করেন না। প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার পাশা-পাশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও পুরুষতান্ত্রিকতার মতো সমস্যাগুলো যৌন হয়রানি ও সহিংসতাকে উস্কে দিচ্ছে।
আমরা জানি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ২৮, ২৯, ৩২, ৩৬ নং ধারায় নারীর চিন্তা, কাজ, চলাফেরায় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও এটা সত্য যে, আমাদের দেশের আইনগুলো সেই সুরক্ষা নারীদেরকে দেয়নি, দিতে পারে নি। যার ফলশ্রুতিতে জন-উন্মুক্ত জায়গায়, হাটে বাজারে, বাসে ট্রেনে নারীরা সব সময় যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নারীর যৌন হয়রানি প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান গঠন করা হলেও সংশ্লিষ্ট সেসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নারীরা তেমন কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না। নারীরা প্রতিবোধ বিমুখ হয়ে প্রতিকার চাওয়া ভুলতে বসেছে। এখন আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছে। ইদানিং নারীরা সন্ত্রাসীর ভয়ে বাইরে যেতে অনিহা প্রকাশ করছেন। তারা স্কুল, কলেজ ও অফিসে গিয়েও নিরাপত্তা বোধ করছে না। আগাছা যেন বেড়া টপকিয়ে নারীর ইজ্জ্বত হনন করতে উদ্যত হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। এটি আমাদের পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার খারাপ ও ভয়াবহ পরিস্থিতি। একমাত্র সুনির্দিষ্ট আইন প্রতিষ্ঠাই পারে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে। আমাদের দেশের ভৌগলিক পরিবেশের দিক হতে বিবেচনা করলে দেখা যায়, আমাদের দেশের নারীদের সহিষ্ণুতার মাত্রা অনেক বেশি। তারা যে কোনো প্রতিকূলতাকে সহজে কাটিয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু যৌন হয়রানিকে কাটিয়ে উঠতে পারাটা এক ভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে, যা নারীরা সুনির্দিষ্ট আইন ছাড়া ট্যাগেল দিতে পারছে না। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, যুগোপযোগী আইন না থাকায় নারীরা যৌন হয়রানির মত খারাপ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জনপরিসরে সহিংসতা ঠেকাতে আসলেই সুনির্দিষ্ট আইনের বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। নচেৎ উদ্যমী ও মেধাবী নারীরা নিজেদের হার মানিয়ে ঘরে বসে থাকতে শুরু করবে। এমনটা হলে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হবে বলে আগাম আভাস দিয়ে গেলাম। এখন ২০১৭ সাল শেষ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকী। এ অবস্থায় দেশ নতুন নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখতে শুরু করে দিয়েছে। প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ঘটছে। আইন আদালত ডিজিটালাইজেন হচ্ছে। কিন্তু আমরা ব্রিটিশ আমলের সেই পুরনো আইন এখনও মেনে চলছি। বড়ই দুঃখ জনক কথা! ঔপনিবেশিক আমলে, একজন ভুক্তভোগি যখন ধর্ষণের অভিযোগ করতো, তখন তার চরিত্রকে যাচাই বাছাই করে দেখা হতো। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এখনও তাই করা হচ্ছে।
কিন্তু কেন এমনটা ঘটবে? নারীর চরিত্র কখন খারাপ হয়? যখন নারীর তার সম্ভম হারিয়ে বিচার না পায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে আইনগুলোর পরিবর্তন করেও সহিংসতার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। যেটা খুবই হতাশাজনক বলে আমি মনে করছি। ভাল করে খতিয়ে দেখলে পাওয়া যাবে, আজকাল আইনি প্রক্রিয়ার হয়রানি মূলক বৈশিষ্ট্যের কারণে সুবিচার সর্বত্র প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এ কারণে বেশিরভাগ নারীই আইনি সহযোগিতা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে না। প্রয়োজনে তারা নীরবে ঢুকরে কাঁদে, আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু এভাবে আর কত কাল নারীরা সুবিচার থেকে বঞ্চিত হবে? পুরুষ কর্তৃক লাঞ্ছিত হবে? সেদিন একটি গবেষণা পত্র পাঠ করে জানলাম, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা যৌন সহিংসতার বিষয়ে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে সচেতন নন। সংস্থার মধ্যে জবাবদিহিতা উপেক্ষা করার প্রবণতা রয়েছে। দোষীদের গ্রেপ্তার ও তদন্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবে গ্রেপ্তারের প্রতি অনীহা দেখা যায়। অপরাধীদের থেকে উৎকোচ গ্রহণের প্রবণতা সীমাহীন। আবার পুলিশের দায়বদ্ধতার অভাবে তদন্ত প্রক্রিয়ায় অনেক সময় লাগে।
এছাড়া, পাবলিক প্রসিকিউটর, আইনজীবী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা জন-উন্মুক্ত স্থানগুলোতে সংঘটিত যৌন হয়রানি এবং অন্যান্য সহিংসতা থেকে নারীদের সুরক্ষা সম্পর্কে সংবেদনশীল নয়। বেশিরভাগ সরকারি হাসপাতাল ধর্ষণের চিকিৎসা ও পরীক্ষার জন্য যথোপযুক্ত নয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ এর ধারা ৩২ অনুসারে, সঠিক সময়ে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ধর্ষিত ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য পুলিশ ও ডাক্তাররা সম্পূর্ণ রূপে সচেতন নন। গবেষণার তথ্য হতে এটা উপলব্ধি করা যাচ্ছে যে অসচেতনতার বেড়াজালে কর্তৃপক্ষ বন্দি! আর মূলত এই ধরনের অসংবেদনশীলতা ও অসচেতনতা পরিহারের লক্ষে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা সময়োপযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশেষে আইন প্রয়োগের প্রসঙ্গে আসি। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে ব্যক্তিগত ও সার্বজনীন উভয় স্তরে যৌন হয়রানিকে একটি সামাজিক অপরাধ হিসেবে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। যাতে নারীরা তাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করতে পারেন। এছাড়া উচ্চ আদালত থেকে প্রাপ্ত নির্দেশাবলীর মধ্যে উল্লেখিত ‘যৌন হয়রানি’র সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সরকারের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত এবং সাক্ষীদের রক্ষা করার জন্য আইন প্রণয়ন করা। পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যেন তাতে বিচারিক কার্যক্রম দ্রুতগতিতে চলে। অপরাধী কর্তৃক উৎকোচ গ্রহণের কোনো প্রকার প্রমাণ মিললেই সঙ্গে সঙ্গে চাকরিচ্যুতসহ কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। ডাক্তার ও তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার জন্য কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। কর্তব্যরত অবস্থায় পুলিশকে বাইরের হস্তক্ষেপ, প্রভাব বা রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করার জন্য সরকারের পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করতে মাসিক সভা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আসুন আমরা সবাই সচেতন হই, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশিল হই এবং নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করি। নারী হয় আমার মা, নয় আমার বোন। এ কথা মাথায় রেখে নারীদেরকে অবাধ বিচরণ করতে দেওয়া হোক। সমাজ ও দেশের উন্নয়নে নারীর কার্যকরী অংশগ্রহণ সাফল্যম-িত হোক।
লেখক : কথা সাহিত্যিক ও কলাম লেখক
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত