শিরোনাম

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চাই

ডাঃ এস. এ. মালেক  |  ০২:৪৩, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৭

রোহিঙ্গা সংকট যে দ্রুত সমাধান হবে না, তা প্রথম থেকেই অনুধাবন করা গেছে। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত যেসব রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে প্রবেশ করছে, তাদের এক চতুর্থাংশ মিয়ানমার সরকার অনেক তাল বাহানার পর ফেরৎ নিয়েছে। প্রায় ৪ লক্ষ রোহিঙ্গা বর্তমান সংকটের পূর্বেই তারা বাংলাদেশে অবস্থান করতো মোটামুটিভাবে তারা ধরে নিয়েছে আর দেশে ফিরে যেতে পারবে না। তাই বাংলাদেশে জীবন ও জীবিকার পথ তারা খুঁজে নিচ্ছে। এর পূর্বে বিভিন্ন ঘটনায় রোহিঙ্গারা দেশ ত্যাগে বাধ্য হলেও এবারের মতো প্রথম ১৫ দিনে ৩ লক্ষ আর বাকী দেড় মাসে প্রায় ৬ লক্ষ রোহিঙ্গা দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছে। এটা এক ভয়াবহ ঘটনা। একটা দেশে নিরীহ, নিরাপরাধ নাগরিকদের ওপর সেনাবাহিনীর ধ্বংসাতœক আক্রমণ, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, দেশ ত্যাগে বাধ্যকরণের মতো ঘটনা এর পূর্বে ঘটে নি। বলা হয়েছে আরাকান লিবারেশন ফোর্সের সন্ত্রাসীরা বিশটা পুলিশ ফাঁড়ি ও একাধিক সেনা ছাউনির উপর আক্রমণ চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করবার কারণে সেনাবাহিনী এই নৃশংস হত্যাকা- চালিয়েছে। শুধু প্রতিশোধ নয়, সুপরিকল্পিতভাবে তাদের ঘর-বাড়ি দখল করে তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এই জঘন্য বর্বর হত্যাকা- চালিয়েছে। তাদের জায়গা, জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনভাবে দখল করে নিয়েছে, যেন আর কোনো দিন তারা নিজস্ব ভিটা মাটিতে যেতে না পারে। একটা বিশেষ সম্প্রদায় ও ধর্মের অনুসারীদের এভাবে দেশ থেকে বিতাড়িত করাইতো এথনিক ক্লিনজিং, যা একটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। একটা দেশের একটা সুনির্দিষ্ট জনসমষ্টিকে সুদীর্ঘ দিন নাগরিক ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করে এভাবে আরেকটা দেশে তাড়িয়ে দেওয়া বর্তমান বিশ্বে এক নিদারুণ সহিংস ঘটনা। বিশ্ব বিবেক তাই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যাকে মানবতাবাদী বিশ্বাস করবার কোনো কারণ নেই, তিনিও যেভাবে রোহিঙ্গাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং যেভাবে মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তার করবার চেষ্টা করছেন, যাতে করে মিয়ানমার সরকার স্ব-সম্মানে যেন অধিকার প্রদান করে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়। অনেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মুসলিম বিদ্বেষী বলে মনে করেন। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত সদস্যরা যে ধরণের আলাপ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা যেসব দেশ নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে বিপ্লবের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসেছেন, সেই সব দেশের কর্মকর্তাদের চাইতেও ট্রাম্পের সত্য ন্যায়ের প্রতি নিষ্ঠা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আমেরিকার মতো সম্পদশালী দেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুঃখ কষ্ট লাঘবে যে সাহায্য সামগ্রী পাঠিয়েছেন, তার পরিমান যথেষ্ট না হলেও নীতিগতভাবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের যে সার্বিক বার্তা দিয়ে চলেছেন, তা বিশ্ব বিবেকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ আমেরিকা যে প্রয়োজনবোধে গণতান্ত্রিক রীতি নীতি অবস্থান নিতে পারে, তা আমেরিকার সিনেটররা ও ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন। একইভাবে গ্রেট ব্রিটেনরাও পিছিয়ে নেই। তারাও এই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের নিন্দা জানিয়েছেন ও মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নেবার দাবি জানানো হয়েছে। ফ্রান্স ও জার্মানিও এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। ইউরোপিয় ইউনিয়নের প্রায় সব দেশসমূহ মিয়ানমার সরকারের এই বিধ্বংসী ক্রিয়াকলাপ সমর্থন করে নি। সে দেশের গণতান্ত্রিক নেতা যিনি গণতন্ত্র ও মানবতার সাথে যুদ্ধ করে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপারে নীরবতার কারণে ব্রিটিশ ও আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রদত্ত সম্মাননা প্রত্যাহার করেছেন এমন কি দাবি উঠেছে তার নোবেল পুরস্কার বাতিলের জন্য। এই গেল পাশ্চাত্য রাষ্ট্রসমূহের অবস্থান, অপরদিকে মহাচীন বিশ্ব আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় যার অবস্থান অত্যান্ত সুদৃঢ় ও বিশ্ব সমাজের প্রতি যার অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে, সেই দেশটি নিজের দেশের স্বার্থের বিবেচনায় এমন একটা অবস্থান নিয়েছে, যা বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কথা সত্য বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমেরিকা ও চীন সম্মিলিতভাবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ ওটা মনে রেখেও চীনের সাথে সম্পর্ক থেকে পিছিয়ে নেই। বরং চীনকে সহযোগী শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে দু’দেশের ভিতর ব্যবসা বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেনের এমন একটা বৃহৎ বাস্তব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যে, দু’দেশকে বর্তমানে বন্ধু প্রতিম বলে বিবেচনা করার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। মিয়ানমার ও চীনের উন্নয়ন সহযোগী হয়তো মিয়ানমারের ক্ষেত্রে চীনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটা সুদূর প্রভাব বাংলাদেশের যেসব মেগা প্রজেক্টে চীন প্রায় একচ্ছত্রভাবে অংশীদার হয়ে কাজ করেছে, তাতে চীন অবশ্যই লাভবান হচ্ছে। তাই মিয়ানমারের চীনের স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে বাংলাদেশের ওপর মিয়ানমার যে মহা সংকটের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। ১০ লক্ষ রোহিঙ্গাদের ভরণ পোষণ ও জীবিকা সংরক্ষণের দায়িত্ব এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতাবিরোধী আচরণ করেছে, তাতে করে চীনের মতো একটা মহাশক্তি দেশের নেতৃত্ব এক পেশে সিদ্ধান্ত নেবেন, এটা অবশ্যই বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে বিক্ষুব্ধ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার গভীর বিবেচনায় নিয়ে শান্তি ও সহযোগিতার পথে এগোচ্ছে। এখনো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের প্রতি বাংলাদেশ আশা করে চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রের উন্নয়নের পার্টনার হিসেবে তার ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ এটা বলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চীন অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশকেই সমর্থন করুক। বরং বাংলাদেশের জনগণ আশা করে এশিয়ার বৃহত্তম দেশ চীন এতদঅঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার সাথে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করুক। বিশ্বের আর একটা মহাশক্তি রাশিয়া রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপারে যে অবস্থান নিয়েছে, তা বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। রাশিয়ার জনগণের কাছে বাংলাদেশের জনগণ অবশ্যই কৃতজ্ঞ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন র[শিয়া ভেটো প্রয়োগ করে যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিল, তা বাংলাদেশের জনগণ ভুলে নি। আণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছে, তা বাংলাদেশের জনগণকে অবশ্যই উৎসাহিত করে। মিয়ানমার ও রাশিয়ার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটা দেশ রাশিয়া। সে দেশের প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে সহযোগিতার অন্যান্য ক্ষেত্রে সুদৃঢ়। বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে আমাদের উন্নয়নে সহযোগী বন্ধু রাষ্ট্র হিসাবে মিয়ানমারকে মানবতাবিরোধী বিবেচনাহীন ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত হয়ে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিক। রাশিয়া ও চীন যদি ন্যায় নীতির সমর্থনে সত্য ও বাস্তবতার জন্য সঠিকভাবে সচেষ্ট হয়, তাহলে তারাই পারে এই রোহিঙ্গা সংকটের যুক্তিপূর্ণ সমাধান করতে। বাংলাদেশের এখন নাভিশ্বাস এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষত-বিক্ষত বাংলাদেশের অর্থনীতি যে আগামীতে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বেশ কিছু বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে, তা বাংলাদেশে দ্রুত উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে। বিশ্বের সকলকে বিবেকবান বিশেষ করে অর্থনীতিবিদরা বলতে শুরু করেছেন যে, একটা দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে আরেকটা দেশ কেন এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে? বাংলাদেশের মানবতাবাদী প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা বিশ্ব মানবতার প্রতি তাঁর দায়িত্ব বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করবার শুধু অধিকারই দেন নি, তারা যাতে সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণভাবে মানবিক মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে, তার সকল আয়োজন করেছেন এবং এটা করতে যেয়ে তাঁর নিজের দেশের জনগণ বেশকিছু ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ও ভবিষ্যতেও মারাতœক অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে। তাই বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে প্রাচ্য পাশ্চাত্যের শক্তিসমূহ বিশ্ব শান্তি সংরক্ষণের প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে এই সংকটের দ্রুত সমাধান করতে।
লেখক:- বিশিষ্ট রাজনীতিক ও কলামিস্ট এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্ঠা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত