শিরোনাম

রাজনীতি হোক মানুষের সেবা

রায়হান আহমেদ তপাদার  |  ১০:৪২, অক্টোবর ১২, ২০১৭

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান হামলার ১৬ বছর পরও যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটি ইসলামপন্থিদের সন্ত্রাসের কবল থেকে রেহাই পায়নি। কূটনৈতিক এলাকায় সাম্প্রতিক হামলাই বলে দিচ্ছে, জঙ্গিরা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক বিশ্বে যেমন পরাশক্তিগুলো ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তেমনি তাদের অধস্তনরা নিজ নিজ দেশে ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছে। একদল মানবতার মুক্তির নামে স্বাধীনতার বিপক্ষে লৌহপ্রাচীর নির্মাণ করেছে। সমাজতন্ত্রের নামে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সর্বহারার রাজত্বের পরিবর্তে সর্বভুকের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। মানুষের সততা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কৃত্রিম ভীতিতন্ত্র যে স্থায়ী হতে পারে না, তাসের ঘরের মতো সোভিয়েত ইউনিয়নের উবে যাওয়া তার বড় প্রমাণ। আরেক দল গণতন্ত্রের নামে ভীতিতন্ত্র কায়েম করেছে। পৃথিবীর সব স্বৈরাচার গণতন্ত্রের লেবাস গায়ে দেয়। মুখরোচক শব্দের আড়ালে তাদের সর্বাত্মক শাসন কায়েম করে। তা হয় কথিত মৌলিক গণতন্ত্র, সর্বহারার গণতন্ত্র, নির্দেশিত গণতন্ত্র, নয়া গণতন্ত্র অথবা শোষিতের গণতন্ত্র। আসলে শাসকদল এই ভীতি ও শঙ্কার মাঝে তাদের মসনদের চিরস্থায়ী করণের পথ খোঁজে। এই অবস্থা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ততটাই তাদের গদির নিশ্চয়তা বিধান করা হবে। বিজ্ঞজনেরা বলেন, ‘ভীতি আরো ভীতির সৃষ্টি করে। অবশেষে তা অনির্দিষ্টকালের অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়’। তবে প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী ভীতির অবসানও ঘটে। হতে পারে তা কোনো ছোট্ট ঘটনার মাধ্যমে, একজন ব্যক্তির নেতৃত্বের কারণে অথবা বিশেষ ঘটনার মাধ্যমে। আমাদের আধুনিককালে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচার ধ্বংস হয়েছে আরব বসন্তে। পাকিস্তানে সামরিক স্বৈরাচার পারভেজ মোশাররফের পতন ঘটেছে এক দশক পরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট মোটাদাগে স্বাধীনতাকে দু’ভাবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রথমত, মানুষের মৌলিক চাহিদা থেকে স্বাধীনতা; দ্বিতীয়ত, ভীতি থেকে স্বাধীনতা। ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালে কংগ্রেসে প্রদত্ত বক্তৃৃতায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানুষ শুধু খাদ্য গ্রহণ করে বাঁচে না, তার স্বাচ্ছন্দ্যকর বাঁচার জন্য নিরাপদ পৃথিবী প্রয়োজন। মানুষের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যায়, যদি সে নিজের ইচ্ছে, নিজের বিবেক ও নিজের খুশিমতো আনন্দ উপভোগ করতে না পারে। যুদ্ধের ভীতি থেকে রুজভেল্ট পৃথিবীর সব মানুষকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি জয়ী হয়েছিল। কিন্তু পৃথিবীর সাধারণ মানুষ কি সেই ভীতিমুক্ত পৃথিবী পেয়েছে? স্বাধীনতার নামে পরে বিজয়ী মিত্রশক্তি গোটা পৃথিবীকে অধীন করে ফেলেছিল। স্নায়ু যুদ্ধের সময় পৃথিবীর মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়, নাইন-ইলেভেনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিভীষিকার বেড়াজাল সৃষ্টি করা হয়েছে। আরেক দল আছেন, তারা গণতন্ত্রের লেবাসেরও ধার ধারেন না। তারা এই একবিংশ শতাব্দীতেও নিজেদের রাজা- বাদশাহ, আমির- ওমরাহ ও সুলতান- সম্রাট বলে পরিচয় দিতে দ্বিধাবোধ করেন না। তারা ফ্রান্সের চতুর্দশ লুইয়ের মতো মনে করেন- আমিই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সব সহায়-স¤পত্তিকে তারা ব্যক্তিগত স¤পত্তি মনে করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাদের একটি বিশেষণ আছে। আর তা হলো- মহৎ স্বৈরতন্ত্র। এ ক্ষেত্রে সামরিক খেতাবধারী স্বৈরতন্ত্র অনেক দূর এগিয়ে আছে। প্রতিবেশী ‘মগের মুল্লুক’ এর কথা বলা যেতে পারে। সেখানে অং সান সু চিরা নামে মাত্র রাজা রানী, আসলে তা নয়। দূরবর্তী সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসকেরা ‘শিশি বোতল’ তো আছেই। এই মহৎ শব্দগুলোর আড়ালে তারা একান্ত ব্যক্তিতন্ত্র কায়েম করে। আর একান্ত ব্যক্তিতন্ত্র যদি হয় বিকারগ্রস্ত, তাহলে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। যেমন এই মুহূর্তে উত্তর কোরিয়ার মানুষ ভীতির রাজত্বে বসবাস করছে। পৃথিবীর সর্বশক্তিধর রাষ্ট্রটির কর্তৃত্বেও নাকি এখন বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিতন্ত্র আরোপিত হয়েছে। লোকেরা ‘পাগল’ ও ‘আধাপাগল’ বলে উপহাস করে। তাছাড়া তৃণমূলের নিতান্তই একজন গরিব মানুষ দল না করার অপরাধে রিলিফ পায় না। এ দেশের পুলিশ হাঁটুর নিচে গুলি করে। ছাত্রের চোখে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে; ঘুষ না দিলে পঙ্গু করে দেয়। রাজনীতির অপরাধে চোখ তুলে নেয়া হয়। কথায় কথায় হামলা- মামলার শিকার হতে হয়। বিরোধীদলের মিছিল- মিটিং তো দূরের কথা, মানববন্ধনেও বাধা দেয়া হয়। জাতীয় স্বার্থে তেল, গ্যাস রক্ষা অথবা সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনের মতো শান্তিপূর্ণ অবস্থানকেও ক্ষমতাসীনেরা সহ্য করে না। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সাধারণ ছাত্রদের মিছিলকেও তাদের সহযোগীরা প- করে দেয়। তবে সম্ভবত ভীতির কার্যকারিতা শেষ হয়ে আসছে। দেশের স্বার্থেই এখন জনগণের জেগে ওঠার পালা। সুকান্তের ভাষায়, ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত। এই ভীতির মাধ্যমেই তারা নিজেদের রাজত্ব কায়েম রাখেন। তন্ত্রমন্ত্র জাহির করেন।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করেন। মোটকথা, ভীতিই তাদের বাহন। এবং তারা একটি ভীতির আবহাওয়া তৈরি করেন যাতে মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে না পারে। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদের সামনে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রীয় আশ্রয়- প্রশ্রয়ে মৌলবাদের লালন পালন, নিজস্ব খনিজ সম্পদ বিদেশি বেনিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া এবং সাম্প্রতিকতম সময়ে জনগণের প্রবল মতামত উপেক্ষা করে সুন্দরবন- বিধ্বংসী রামপাল চুক্তিতে সরকারের অযৌক্তিক অনমনীয় অবস্থান আমাদের বার বার ভাবতে বাধ্য করেছে দেশটা কি আমাদের আছে নাকি নৈতিকতা বিবর্জিত জনাকয়েক রাজনীতিবিদের হাতে জিম্মি হয়ে গেছে। এই শাসকেরা আজন্ম বিরুদ্ধাচরণ করেছে সাধারণের। যারা ফুলবাড়ি আন্দোলনের সময় গিয়ে ওয়াদা দিয়েছিলেন ক্ষমতায় গেলে দেশের স্বার্থবিরোধী সমস্ত চুক্তি বাতিল করবেন, তারাই আজ রামপাল রূপপুরের মতো আত্মঘাতী চুক্তি করেছেন দেশের হয়ে।
যে ভদ্রমহিলা রক্তাক্ত হুমায়ুন আজাদকে অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে দেখতে গিয়েছিলেন তৎকালীন সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, আজকাল তিনি ও তার চ্যালাচামুন্ডারা ব্লগার- একটিভিস্ট হত্যা ইস্যুতে লেখকের দোষ খুঁজে বেড়ান, বিচারের দাবি মুখ থুবড়ে কেঁদে মরে। রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হলে সমাজ কোনোভাবেই ধর্মহীন হয় না। কারণ, আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনজীবনে রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকে ক্ষুদ্র পরিসরে, বৃহত্তর অংশে সমাজই দাপটের সঙ্গে ভূমিকা পালন করে। মুশকিল হলো, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠন করে সমাজকেও রাষ্ট্রের অধীন করে সব ক্ষমতা হস্তগত করতে চায়। সর্বাত্মক ক্ষমতার ভোগ- দখল ঠিক রাখার জন্য জবাবদিহির পথ বন্ধ করতে হয় এবং তাতে খুলে যায় দুর্নীতির হাজারো পথ। তাই এ দেশে গণতান্ত্রিক সরকার দ্রুত দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং সরকার প্রধানের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে ক্ষমতাবান ও ক্ষমতার প্রসাদভুক্তদের নিরাপত্তা কোনো ব্যবস্থার সাফল্য কি গৌরব, কোনোটাই প্রকাশ করে না। কারণ, কেবল সেই ব্যবস্থাই কাম্য, যেখানে ক্ষমতাহীনও নিরাপদ। সরকার বা কোনো পক্ষই আপাতত সেই ব্যবস্থার কথা ভাবছে না। নয়তো সবাইকে নিরাপত্তা প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করত না সরকার। আদতে ভীতির রাজনীতি নিজস্ব তাগিদেই দলে একক ক্ষমতাধর ব্যক্তি তৈরি করে। এখানে সব ধরনের স্বাধীন মতামতের প্রতি ভীতি ও সন্দেহ কাজ করে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের নির্বাহী ব্যবস্থা, যাবতীয় চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সব সুযোগ-সুবিধাকে দলীয়করণের মাধ্যমে তারা কার্যত একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করেন। যাতে অন্যেরা বোঝে যে, চৌকিদার থেকে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত তাদের লোক হতে হবে। তৃতীয়ত, তাদের আরেকটি রণকৌশল হচ্ছে- ভীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করা। এর মাধ্যমে তারা গণমাধ্যম, সুশীলসমাজ এমনকি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে স্তাবকে পরিণত করেন। চতুর্থত, এই তিনটি কাজের মাধ্যমে সমাজে এক ধরনের নির্লিপ্ততা, নিস্পৃহতা ও নীরবতা কায়েম করা হয়। মানুষ তার নৈতিক সাহস হারিয়ে ফেলে। এই ভীতির অবস্থা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত প্রলম্বিত হতে পারে। পঞ্চমত, তারা অনাদর্শকে আদর্শে পরিণত করেন। তারা এর সপক্ষে একদল বুদ্ধিজীবী ক্রয় করেন। তারা সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংলাপ এবং টকশোর মতো বিষয়কে প্রশস্তিতে পরিণত করেন। এই পঞ্চবিধ কার্যক্রমের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাগরিক সাধারণ অব্যাহত ভীতিপ্রবণতায় ভুগতে থাকে। কোনো কোনো রাষ্ট্রে দলের পক্ষ থেকে গুপ্তচর লেলিয়ে দেয়া হয়। দেশব্যাপী একটি ভীতি ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে রাজনীতিবিদ-দের এসব থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত