শিরোনাম

রোহিঙ্গা সমস্যা ও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা

মাহমুদুল বাসার  |  ১১:৩৭, অক্টোবর ১১, ২০১৭

গত শনিবার ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছেন। বিপুল সংবর্ধনা দিয়েছে দেশবাসী। বিদেশ থেকেও পেয়েছেন সম্মান ও অভিনন্দন। ব্রিটিশ মিডিয়া তাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি দিয়েছে। অসংখ্য পুরস্কারের মধ্যে এটাই তাঁর যোগ্য পুরস্কার বলে বিবেচিত হয়েছে জনগণের কাছে। তাই তাকে সংবর্ধনা দেয়ার সময় প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন ও ব্যানারে লেখা ছিলো ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’। কাতার ভিত্তিক পত্রিকা খালিজ টাইমস শেখ হাসিনাকে বলেছে, ‘প্রাচ্যের নতুন তারকা’ আর মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা নিউজ উইক বলেছে, ‘সত্যিকার বীর নারী’। খালিজ টাইমস এবং নিউজ উইক দুটো প্রভাবশালী পত্রিকা শেখ হাসিনার ওপর শুধু প্রশংসামূলক নয়, বিশ্লেষণমূলক মন্তব্যও করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক সাহসেরই পরিচয় দিয়েছেন। তবে রোহিঙ্গা উৎপীড়িত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে তিনি বিশ্বের গণমাধ্যমে সমধিক গুরুত্ব পেয়েছেন। ১৯৭৮ সাল থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে ও আছে। বার বার মিয়ানমার সরকার ওয়াদা ভঙ্গ করেছে, বার বার চুক্তি ভঙ্গ করেছে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবার ব্যাপারে। যেমন পাকিস্তান সরকার আজো পর্যন্ত বিহারিদের ফেরত নেয় নি, বাংলাদেশ তার দায় বহন করে বেড়াচ্ছে। শেষ পর্যন্ত থেকেই গেলো বিহারিরা বাংলাদেশে। গত ৪০ বছর ধরে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছে। বাংলাদেশ এর দায় বহন করছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে মাত্র দু‘মাসের মধ্যে আরো ৫ লাখ রোহিঙ্গা এসে পড়েছে বাংলাদেশে। শখ করে আসেনি। বেড়াতেও আসেনি। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে এসেছে তারা। জঘন্য অমানবিক অত্যাচারের মুখে আসতে বাধ্য হয়েছে। মানবতা লংঘন করেছিলো পাকিস্তান ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা ১৯৭১ সালে। ২০১৭ সালে মানবতা লংঘনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। পাকিস্তানি হামলার মুখে এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো। এর দায় গ্রহণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। আর মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সর্বগ্রাসী হামলার মুখে ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হয়েছে। এর দায় নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৭১ সালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সামনে সব সময় একটা বিজয়ের সম্ভাবনা ছিলো, বাঙালিরা তাদের দেশ স্বাধীন করতে পারবে এবং শরণার্থীরা দেশে ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ১৯৭১-র চেয়ে জটিল ও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। এই সমস্যা কবে নিরসন হবে তার সামান্যতম নিশ্চয়তা নেই। ৫ লাখ রোহিঙ্গা আগেই ছিলো, এখন এসেছে আরো ৫ লাখ। রোহিঙ্গা আসা অব্যাহত আছে। কলামটি লেখার সময় একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ‘সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন, বাড়িঘর জ¦ালাও পোড়াও এবং দেশান্তরি হতে বাধ্য করার নেপথ্যে শুধু যে সে দেশের জান্তা সমর্থিত সরকার জড়িত তা নয়, এর নেপথ্যে যে আন্তঃদেশীয় চক্রান্ত ষড়যন্ত রয়েছে তা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। নেপথ্যের বহুমুখী শক্তির ইন্ধনেই মিয়ানমার সরকার বেপরোয়া গতিতে রোহিঙ্গাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে তাতে টলানো যাচ্ছে না মিয়ানমার সরকারকে।’ স্বয়ং জাতিসংঘ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ফের রোহিঙ্গা ঢলের মুখে পড়বে। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি মাথায় নিয়ে শেখ হাসিনা- ছোট বোন শেখ রেহানার পরামর্শে, রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের দুর্গতির কথা ভেবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের দ্বার খুলে দিয়েছেন। যদি না দিতেন, যদি পুশব্যাক অব্যাহত রাখতেন, যদি বাংলাদেশের সীমান্ত সিলগালা করে দিতেন, তাহলে নাফ নদীতে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, সন্তান সম্ভবা নারীর লাশ জায়গা হতো না। গত ২৫ আগস্টের আগে প্রধানমন্ত্রী সীমান্ত অবারিত করে দেন নি। রোহিঙ্গাদের পুশব্যাকও করেছিলেন। কিন্তু ২৫ আগস্টের পর তিনি মানবতার দাবি উপেক্ষা করতে পারেন নি। সীমান্ত খুলে দিয়েছেন। স্বশরীরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। তাদের দুর্দশার সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন। গণমাধ্যমের সামনে সুদৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে।’ তারপর রোহিঙ্গাদের বরাভয় দিয়ে বলেছেন, ‘১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে ৭ লাখ রোহিঙ্গাও খাওয়াতে পারবো।‘ বিশ্ব মিডিয়া শেখ হাসিনার এই কথাটার বেশি মূল্য দিয়েছে। এই একটি আশ্বাসের পর তিনি ব্রিটিশ মিডিয়ার সম্মান টি পেয়েছেন। মূল্যায়ন করেছে খালিজ টাইমস ও মার্কিন নিউজ উইক। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ভাষণে তিনি রোহিঙ্গাদের হয়ে তাদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন। রোহিঙ্গা জাতিগত নির্মূলের বিরোধিতা করেছেন। সহিংসতা বন্ধের আহবান জানিয়েছেন। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য সেফজোন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। আনান কমিশনের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়নের আহবান জানিয়েছেন। জাতিসংঘে তাঁর বক্তব্যে মাথা উঁচু করে মানবতার বাণী তুলে ধরেছেন। চীন-রাশিয়া, ভারতের মতো শক্তিশালী বন্ধু রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের অনুকূলে নেই, তাতেও ভয় পান নি, বিচলিত হন নি। বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতি অসহিষ্ণু হন নি। তাদের সহযোগিতা আমরা পেয়েছি। বিপদে ধৈর্য ধরতে হয়, শেখ হাসিনা তা জানেন। তাঁর আত্মবিশ্বাসের অভাব কোনো কালে ছিলো না। মার্কিন সুপার পাওয়ারের হুমকি মোকাবেলা করেছেন তিনি। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কারো করুণার পাত্রী হন নি। সাহায্যের জন্য হাত পাতেন নি। বরং বলেছেন, ‘আমরা এক বেলা খেয়ে রোহিঙ্গাদের খাওয়াবো।’ মাথা উঁচু করে রাখা তাঁর পক্ষেই শোভন। কিন্তু সাহায্য আমরা পাচ্ছি। বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সহানুভূতি আমরা হারাই নি। বিশাল সংবর্ধনা সভায় তিনি বলেছেন, ‘বিপন্ন মানবতাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব উদার বাংলাদেশকে দেখলো। জাতিসংঘে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা ছিলো আমার লক্ষ্য। সেটা আমরা পেরেছি। যারা বাংলাদেশকে দারিদ্র্য ও দুর্যোগের দেশ বলে জানতো তারা আজ ভিন্ন বাংলাদেশকে দেখছে। বাংলাদেশ আজ বিপন্ন মানবতাকে আশ্রয় দিচ্ছে। মানুষ মানুষের জন্য, আমরা সেটা প্রমাণ করেছি। আমরা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের মাত্রা দেখে তাদের জন্য বাংলাদেশের দরোজা খুলে দিয়েছি। মিয়ানমার এখন আন্তর্জাতিক চাপে আলোচনায় এসেছে। আমরা আশা করছি রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে পারবো।’
অন্যদিকে ইইউ প্রেসিডেন্ট ডোনাল টাস্ক বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতেই হবে।’ বাংলাদেশের পক্ষে আছে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স। চীন-ভারতের সহানুভূতি থেকে আমরা বঞ্চিত হই নি। বিশ্ববিবেক ১৯৭১ সালের মতো আমাদের পক্ষে আছে। জাতিসংঘও আমাদের পক্ষে আছে। ১৯৭১ সালে আমরা কূটনৈতিকভাবেই আগে জিতেছিলাম তারপর যুদ্ধে জিতেছি। এবারও আমরা শেখ হাসিনার বিচক্ষণ, ধৈর্যশীল পদক্ষেপের বদৌলতে কূটনৈতিকভাবে জয়ী হবো। ধীরে ধীরে মিয়ানমার কোণঠাসা হতে থাকবে। আর বাংলাদেশ ক্রমাগত সক্রিয় হবে। এর মধ্যে একটি সুখবর হলো, দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মাসেতু। পদ্মাসেতু সম্পর্কে সংবর্ধনা সভায় শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘অনেক অপমানের জবাব দেয়া হবে পদ্মাসেতু নির্মাণ করে।’ বিদেশে এই সফলতার খবর পেয়ে আমরা দুবোনই কেঁদেছি।’ আমাদের মনে আছে, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের কিছু এলিটের খপ্পরে পড়ে, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ১৯০ কোটি ডলার ঋণ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলো। এটা ছিলো শেখ হাসিনাকে বিপদগ্রস্ত করার চক্রান্ত। তাঁর ইমেজ ধ্বংস করার পরিকল্পনা। এতে শেখ হাসিনা দমে যান নি। প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মাসেতু হবে। যে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে একটা দেশ স্বাধীন করতে পারে, তারা একটা সেতু নির্মাণ করতে পারবে না কেন?’ শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণে, কঠিন সাধনার বদৌলতে, অসীম মনোবলের বিনিময়ে পদ্মাসেতুর মতো স্বপ্নের সেতু বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। কানাডার আন্তর্জাতিক আদালত ঘোষণা দিয়েছে, পদ্মাসেতুতে কোনো দুর্নীতি হয় নি। এটা শেখ হাসিনার বিজয়। অনেকে উল্লাস করেছেন পদ্মাসেতুর প্রসঙ্গ ধরে শেখ হাসিনাকে বিপদগ্রস্ত করার আশায়। বিএনপি ভেবেছিলো, এই সুযোগে শেখ হাসিনার কূপোকাত করে ফেলবে। তাঁর উঁচু মুখে কোনো ভাবেই চুনকালি মাখাতে পারে নি বিএনপি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাফল্য সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন। বিপুল সংবর্ধনা পেয়েছেন। মাথা উঁচু করে সম্মান নিয়ে এসেছেন। অনেক ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছেন। রোহিঙ্গা জঙ্গিরা বলেছে তারা অস্ত্রবাজি রেখে আলোচনায় বসতে রাজি। ওদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ একমত হয়েছে যে, আরসাকে এক সঙ্গে মোকাবেলা করবে উভয় দেশ। মিয়ানমারের শুভবুদ্ধি উদয়ের পথ খুলে রেখেছেন শেখ হাসিনা, বাংলার মাটিতে জঙ্গি চর্চা হতে দেবেন না এই ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহসা মিয়ানমার সফরে যাবেন। এতে সমস্যা সহজ হয়ে আসবে বলে আমরা আশা করি।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত