শিরোনাম

বাংলা চলচ্চিত্র : সহি বড় যৌথনামা

১১:৩২, জুন ১৮, ২০১৭

কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ? এমন একটি প্রশ্ন দিয়ে আলোচনা আরম্ভ করা যেতে পারে। যেহেতু আমার এই লেখাটি বর্তমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কিত সেহেতু আমি লেখার পুরোটা জুড়ে প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো। সেই সাথে আরো বেশকিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে ধরবো। কয়েক বছর ধরে ঢাকাই চলচ্চিত্রের দূরাবস্থা চলার কথা এখন আর কারো অজানা নয়। ভালো ছবি নির্মাণ হচ্ছে না। দর্শক ছবি দেখছে না। প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব বিষয় ছাড়াও আরো বেশকিছু কারনকে এই অবস্থার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। তবে প্রধান যে কারন এখানে দায়ী সে বিষয়ে কাউকে তেমন কথা বলতে দেখা যায় না। আলোচনার গভীরে যাওয়ার আগে সে বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সব থেকে অন্ধকার যুগ বলা যেতে পারে ২০০০ সালের পরবর্তী সময়টাকে। এসময় অশ্লীলতার কালোমেঘ ঢেকে ফেলেছিলো পুরো ঢাকাই চলচ্চিত্রকে। তখনকার চলচ্চিত্র মানেই ছিলো কাটপিস আর যৌনতাকে উসকে দেয়া দৃশ্যের ছড়াছড়ি। সে সব ছবি কম বাজেটে নির্মিত হলেও এক শ্রেণির দর্শকদের কাছে এই ধরনের ছবির বেশ চাহিদা বেড়ে যায়। এর বিপরীতে বিপুল সংখ্যক দর্শক পুরোপুরি প্রেক্ষাগৃহ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে থিতু হন ড্রয়িং রুমে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রতি প্রচন্ড রকমের ঘৃণা আর অবিশ^াস তৈরি হতে থাকে। পরবর্তীতে অনেক আন্দোলন আর সংগ্রাম করে অশ্লীলতার হাত থেকে রেহাই পেলেও দর্শকদের আর প্রেক্ষাগৃহমুখী করা যায় নি। দেশে যে ভালো ছবি নির্মিত হতে পারে এমন বিশ্বাস আর দর্শক পুনরায় স্থাপন করার সাহস পায়নি। মূলত সেখান থেকেই এই দূরাবস্থার শুরু। এখানে একটি মজার ব্যাপার হলো, যারা এক সময় অশ্লীলতার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছিলেন তাদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এটা ইতিবাচক দিক। দেরীতে হলেও তাদের বোধদয় হয়েছে। অশ্লীলতার অন্ধকার যুগ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে যখন ঠিক তখনই বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিলো যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র। আগে যেখানে মাঝে মাঝে দুই একটি যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মিত হতো, এখন সেটির সংখ্যা বেড়ে চলেছে। শুধু তাই নয়, মানা হচ্ছে না যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা। এমন অভিযোগ এফডিসি পাড়ায় কান পাতলেই শোনা যায়। আন্দোলন চলছে। প্রতিবাদ হচ্ছে। মিটিং হচ্ছে। একে অন্যকে উদ্দেশ্য করে আক্রমনাত্মক বিবৃতি দিচ্ছেন। যৌথ প্রযোজনা খারাপ কিছু নয়। এতে দুই দেশের মধ্যে চলচ্চিত্র সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা বিনিময় হয়। জানা শোনার পরিধি বাড়ে। তবে প্রত্যেক দেশের যৌথ প্রযোজনার কিছু নীতিমালা রয়েছে। এই নীতিমালাকে অনুসরণ করে ছবি নির্মাণ করলে অভিযোগ করার সুযোগ থাকে না। ইদানিংকালে যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে সেগুলো আদৌ নীতিমালা অনুসরণ করছে কী না সে বিষয়ে যাওয়ার আগে একবার এদেশের যৌথ প্রযোজনার অতীত ইতিহাস থেকে ঘুরে আসা যাক। চলচ্চিত্র গবেষক মোঃ আরিফুর রহমান খানের ‘বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র-অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ গবেষণা পত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম যৌথ প্রযোজনার ছবি মুক্তি পায় ১৯৮৩ সালে। যেটি যৌথভাবে প্রযোজনা করে বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান। এরপর মিঠুন চক্রবর্তী, রোজিনা অভিনীত ‘অবিচার’ ছবি মুক্তি পায়। সৈয়দ হাসান ইমাম এবং ভারতের শক্তি সামন্ত যৌথভাবে প্রযোজনা করেন। এই যে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণের ধারা তৈরি হয় তা মোটামুটিভাবে নিয়ম নীতি মেনে এগোতে থাকে। এদিকে যৌথ প্রযোজনার নিয়ম ভাঙা প্রথম চলচ্চিত্র ‘সাত সেহেলি’ নির্মিত হয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্কের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি ১৯৮৬ সালে প্রণয়ন করা যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা ভঙ্গ করে। যার কারনে ছবিটি বাংলাদেশে মুক্তি পায় নি। তাহলে এখানে দেখা যাচ্ছে একটা সময় যৌথ প্রযোজনার নিয়ম নীতি না মানলে সেটা মুক্তি দেয়া হতো না বা মুক্তি পেতো না। তখন যারা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন তারা জানতেন কিভাবে অধিকার আদায় করতে হয়! অতীতে পারলে এখন কেন নীতি বিরোধী ছবি আটকে দেয়া যাচ্ছে না? এমন একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত ২০১২ সালের সংশোধিত নীতিমালার ৬ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে, ‘চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নিয়োজিত মূখ্যশিল্পী এবং কলাকুশলীর সংখ্যা যৌথ প্রযোজকগণই যৌথ প্রযোজনার চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন। এক্ষেত্রে প্রতি দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীর সংখ্যানুপাত সাধারণভাবে সমান রাখতে হবে। একইভাবে চিত্রায়নের লোকেশন সমানুপাতিক হারে নির্ধারণ করতে হবে।’ এটি হলো যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মাণের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদটিকে কতোখানি মানছেন সেটাই দেখার বিষয়। সাদা চোখে যদি দেখি তাহলে যৌথ প্রযোজনার ক্ষেত্রে এসব নিয়মের কোন তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। তৈরি হয়েছে পক্ষ বিপক্ষ দল। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে নিয়ম মানা হচ্ছে আর চলচ্চিত্র বিষয়ক ১৪টি জোট বলছে কোনরকম নিয়ম মানা হচ্ছেনা। যে করেই হোক এর মুক্তি আটকাতে হবে। এর আগে কয়েকবার যৌথ প্রযোজনার নিয়ম ভেঙে ছবি প্রযোজনা করার পর ব্যবসায়ীক ক্ষতি হবে এমন মানবিক বিবেচনায় ছাড়পত্র দেয়া হয়। অপ্রিয় হলেও সত্য, তথ্য মন্ত্রণালয়কে সব সময় এমন নীতি বিরোধী ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে নমনীয় দেখা গিয়েছে। তাই বারবার নিয়ম লঙ্ঘন করে পার পেয়ে যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে কলকাতার শিল্প সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘চলচ্চিত্রের যৌথ প্রযোজনার মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো দৃঢ় করা যেতে পারে।’ তথ্যমন্ত্রীর কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করার উপায় নেই। প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে যদি চলচ্চিত্র ভূমিকা রাখতে পারে তাহলে ক্ষতি কি? তাই বলে অসমানুপাতিক ছবি নির্মাণ হবে এটা তো কাম্য নয়। এভাবে যৌথ প্রযোজনার মোড়কে ভারতীয় ছবি বাংলাদেশে মুক্তি কখনোই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে পারে না। এতে বরং চলচ্চিত্র শিল্পটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। সমানুপাতিক হারে শিল্পী-কলাকুশলী কাজ না করার কারনে সম্প্রতি কথিত যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘বস-টু’ এবং ‘নবাব’ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী-কলাকুশলী ছবি দুটিতে বেশী কাজ করেছেন। এরমধ্যে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের প্রতিবাদ এবং প্রিভিউ কমিটির আপত্তি থাকার পরও ‘বস-টু’ সেন্সরে জমা পড়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহযোগীতায়। শোনা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছবিটি মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে বিশেষ অনুরোধ করেছেন। যদি এমনটি হয় তাহলে এটি খুবই দুঃখজনক! কেন তাদের অনুরোধ রাখতে হবে? তাহলে তারা যদি দেশটা চায়, দিয়ে দেবো? পশ্চিমবঙ্গ সরকার সব সময় নিজেদের স্বার্থটাই আগে দেখবে এটাইতো স্বাভাবিক।  বাংলাদেশ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে শত অনুরোধ করেও তিস্তা চুক্তি করাতে পারে নি। শুধু তাই বছরের পর বছর চেষ্টা করেও ভারতে বাংলাদেশি কোন টেলিভিশন চ্যানেল প্রবেশ করাতে পারে নি। এদিকে ‘বস-টু’র ছাড়পত্র পেয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এর কারণ নীতিমালায় চোখ বোলালে দেখা যাবে। সেখানে ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘যৌথ প্রযোজনা সংক্রান্ত কোন বিষয়ে জটিলতা দেখা দিলে তথ্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং নীতিমালায় প্রয়োজনবোধে কোনরুপ পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন ইত্যাদি মন্ত্রণালয় করতে পারবে।’ আগেই বলেছি যৌথ প্রযোজনার কোন ক্ষতিকারক দিক নেই। যদি সেটা নিয়ম মেনে নির্মিত হয়। আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো নয়। দেশীয় শিল্পীরা কাজ পাচ্ছে না। নতুন কোন ছেলে মেয়ে যে চলচ্চিত্রে আসবে সে সাহস পাচ্ছে না অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায়। প্রতিবছর যদি এভাবে একাধিক নামমাত্র যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মিত হয় তাহলে এদেশে কলকাতায় যে একটি বড় বাজার তৈরি হবে এটা যে কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব। আর এতে বেকার হয়ে পড়বে দেশীয় শিল্পীরা। এমন অবস্থায় সরকারের উচিত আগামী কয়েক বছর পুরোপুরি যৌথ প্রযোজনার ছবি বন্ধ করে দিয়ে দেশের চলচ্চিত্র উন্নয়নে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া। ঢালিউড চলচ্চিত্র টেকনিক্যাল দিক থেকে আরম্ভ করে বৈচিত্র্যময় নির্মাণসহ বিভিন্ন দিক থেকে পিছিয়ে আছে। সবার আগে এই দিকটায় নজর দেয়া উচিত। আধুনিক বিশে^র সাথে যেনো এদেশের নির্মাতারা তাল মিলিয়ে ছবি নির্মাণ করতে পারেন সে জন্য প্রয়োজনে দেশের বাইরে থেকে গুনী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। চিত্রগ্রাহকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন। প্রোডাকশনে যারা থাকে তারা কী করে একটি শুটিং স্পটে সুন্দর ব্যবস্থাপনা করতে পারবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলে পুরো চলচ্চিত্র শিল্প উপকৃত হবে। সেই সাথে পরিচালক সমিতির উদ্যোগে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন সদস্যদের সবাইকে একসাথে নিয়ে বড় পর্দায় বিদেশি বিখ্যাত নির্মাতাদের ছবি দেখার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকে বলবেন, ছবি তো ঘরে বসে দেখতে পারে। কিন্তু ঘরে বসে ছবি দেখা আর সব নির্মাতারা একসাথে ছবি দেখা সম্পূর্ণ আলাদা। একসাথে বড় পর্দায় ছবি দেখা তাদের ভেতরে ভালো ছবি নির্মাণে স্পৃহা যোগাবে। নিজেদের দৈন্যতার বিষয়ে পরস্পরের সাথে আলোচনা করতে পারবে। যাহোক, সব কথার মূলকথা আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে হবে। যারা শুধুমাত্র ব্যবসার কথা মাথায় রেখে যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রে অর্থলগ্নি করছেন তারা ঠিকই জানেন কোনটা প্রকৃত অর্থে যৌথ প্রযোজনা। নিজের সন্তান অসুস্থ হলে তাকে তো আমরা ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারি না। চলচ্চিত্রটাও ঠিক তাই। এখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অসুস্থ। সকলের উচিত একে সারিয়ে তোলা। ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য বিভাজন তৈরি করে চলচ্চিত্রের ক্ষতি করে পরস্পর বিরোধী অবস্থান করে ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত