শিরোনাম

সাবেক শাসকের মৃত্যু, ভালো এবং মন্দ কথা

কাকন রেজা  |  ১৫:৫৪, জুলাই ১৪, ২০১৯

প্রতিটা সময়কালেরই ভালো-মন্দ দুটো দিক থাকে। যারা সময়ের নেতৃত্বে থাকেন, অর্থাৎ যাদের নেতৃত্বে আমজনতা সময়টা অতিবাহিত করে তাদেরও ভালো-মন্দ দুটি দিকই থাকে। সুতরাং ভালোকে বিচার করতে গেলে মন্দটা এসে যায়, আর মন্দ বলতে গেলে ভালোটাও বলতে হয়। এই যে বলার ব্যাপারটা এটাই ইতিহাস, কালের প্রয়োজনীয়তা।

প্রথম আলো’তে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকে’র সাক্ষাতকার পড়ছিলাম। তিনিও শুরুটা করেছেন এভাবেই। ‘দেশটা কিভাবে চলছে’, এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘ভালোমন্দ মিলিয়ে’। এরপরেই তিনি বলেছেন, ‘তবে মন্দের কর্তৃত্বই বেশি’।

এরশাদ’কে নিয়ে যখন লিখতে বলা হলো, তখন ওনার এ কথাগুলোই মাথায় এলো। এ মুহূর্তে এটুকুই মূলত প্রাসঙ্গিক। এর বাইরে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রচুর সময় রয়েছে। সদ্যমৃত মানুষকে নিয়ে অতিদ্রুত প্রতিক্রিয়াটাও সময়োচিত ও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

তবে, আমার নিজের দিক থেকে বলতে গেলে, যৌবনের অনেকগুলো দিন আমি হারিয়েছি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে। যৌবনের সোনালি স্মৃতির অনেক জায়গাতেই রয়েছে সেই আন্দোলনের প্রাবল্য। নিজের জীবনটার মোড়ও ঘুরেছে সেই আন্দোলনেই। নিজের শিক্ষা জীবনের ক্ষতি হয়েছে, মানুষের দাবী আদায়ের কথা বলতে গিয়েই। না হলে হয়তো, এ জীবন অন্যরকম হবার কথা ছিল।

সে সময়কার কথা অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে, এরশাদ সকল প্রায়োগিক কৌশল ব্যবহার করেছিলেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। কঠোরও হয়েছিলেন তিনি, কিন্তু বাহ্যত সেই কঠোরতা অতটা অমানবিক হয়ে উঠেনি, যা গণদাবীকে অগ্রাহ্য করতে পারে।

আজ দেশে দেশে গণদাবী পদদলিত হচ্ছে। চূড়ান্ত অমানবিক হচ্ছে দমন কৌশল। সঙ্গত কারণেই চারিদিকে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে। মানুষ ক্রমেই অসামাজিক পরিবেশের অনিশ্চিত কালে প্রবেশ করছে। এমন সময়কেই হয়তো ইতিহাস আখ্যায়িত করে কালো অধ্যায় হিসাবে।

আমাদের দেশও বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, নিখোঁজ এসব আজকালের নিত্যকার ঘটনা।

আবুল কাসেম ফজলুল হক যাকে বলেছেন, সভ্যতার সংকট হিসাবে। তিনি বলছেন, ‘সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টি দিলে বলতে হয়, বাংলাদেশে সভ্যতার সংকট চলছে।’ এমন অবস্থায় এরশাদের সময়কালকে যদি তুলনায় আনা যায়, তাহলে কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক চিন্তাটাই একটা সংকটের মধ্যে পড়ে যাবে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র ব্যর্থ। যে প্রশ্নের জবাব দেয়া প্রাসঙ্গিক কারণেই কঠিন। এ প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে নিজের সাথে নিজেরই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে। যে দ্বন্দ্বের প্রকাশও খুব একটা সহজ নয়।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকে’র ভাষায়, ‘--- প্রকাশ করা যায়, কিন্তু কার্যকরভাবে প্রকাশ করা যায় না। ---- রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীন চিন্তাশীলতা অনুমোদন করে না।’ এই যে অনুমোদন না করা, এটা কিন্তু পরিস্থিতিকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে।

দেশের সমস্যাগুলো যদি চিহ্নিত না হয়, আলোচিত না হয়, বিশেষ করে সমালোচিত না হয়, তাহলে সঠিক সমাধানের আশা বৃথা। চিন্তার দ্বন্দ্ব সবসময় সত্যটাকে সামনে নিয়ে আসে। দ্বন্দ্বের কাজটাই সত্যকে প্রকাশ করা। এখন যদি চিন্তার স্বাধীনতা না থাকে, স্বাধীন আলোচনার সুযোগ কমে যায়, তবে দ্বন্দ্বের প্রকাশের ক্ষেত্রটাও সংকুচিত হয়। যার কারণে সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়, সমস্যাটাও রয়ে যায়।

চিন্তার স্বাধীনতা না থাকলে যা হয়, তা হলো সমস্যাটাকে ঢেকে-ঢুকে রাখার প্রচেষ্টা। সমাধানের পথ রুদ্ধ হলে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মুশকিলটা হলো, ঢেকে রাখা আড়ালে সমস্যাটা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং একটা পর্যায়ে তা সমাধানহীন হয়ে পড়ে। আর এতে সরাসরি আক্রান্ত হয় সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।

এক কথায় বিত্ত-বৈভব-প্রতিপত্তিহীন আমজনতা। সমাজ তখন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, শোষক আর শোষিত। আর এই বিভক্তি ক্রমেই বাড়তে থাকে। আর এই বিভক্তির ধারাবাহিকতায়ই শোষক শ্রেণির পতন ঘটে, যেমন ঘটেছিল নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত