শিরোনাম

আশার কথা, প্রোপাগান্ডা এবং অনিবার্যতা

কাকন রেজা  |  ১২:৪৭, জুলাই ১২, ২০১৯

একজন বললেন, ‘গাজীপুরের মেয়র তার প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজদের চাকরিচ্যুৎ করেছেন।’ আরেকজন শোনালেন, ‘দেখছেন পুলিশের ডিআইজি মিজানকেও জেলে যেতে হয়েছে।’ অন্যজন রীতিমত উত্তেজিত, ‘নুসরাতের খুনিদের ছাড়া হয়নি, ছাড়া হবে না।’

এতসব আশা জাগানিয়া কথা শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু যখন সামাজিক ও গণমাধ্যমে পরের খতিয়ানগুলো দেখি, তখন এই ভালো কথাগুলো বিশ্বাস করতে মন চায় না।

বালিশ প্রকল্পের কাহিনিতো সবারই জানা। সেদিন দেখলাম, ‘এতিমদের টাকাও ছাড়ছেন না সরকারি কর্মকর্তারা’, এমন শিরোনাম। সোনাগাজী প্রবীণ নিবাস ও এতিমখানার জিনিসপত্র ক্রয়ের একটা তালিকা দিয়েছে গণমাধ্যম। যেখানে সাড়ে সাত হাজারের হুইল চেয়ার কেনা হয়েছে পঁচিশ হাজারে। দুই হাজারের ম্যাট্রেস পাঁচ হাজারে।

এমন ঘটনারতো অভাব নেই। খুঁজতে গেলে এত বেরুবে যে, খুঁজতে যাওয়াটাই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র মতন অবস্থা হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং গাজীপুরের মেয়রের শুদ্ধি অভিযান শুধু মনে করিয়ে দেয়, ‘সাগরে পেতেছি শয্যা শিশিরে কী ভয়’।

ডিআইজি মিজান নিয়ে কথা বলতে চাই না, তাহলে অবস্থা দাঁড়াবে সেই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচিতে’ই। এসব নিয়ে কথা বেশি বলতেও নেই। বলতে গেলে শেষে গিয়ে জপতে হবে, ‘ভিক্ষা চাই না কুত্তা সামলাও’, এমন কথা। অনেকেই বলেছেন। আবার কেউ মাঝপথে চুপ হয়ে গেছেন।

নুসরাত নিয়ে অনেকের উৎসাহ আকাশচুম্বি। মনে হচ্ছে নুসরাত হত্যার বিচার মানেই সব সমস্যার সমাধান। আর কোন নুসরাতের শ্লীলতাহানি ঘটবে না, মারা যাবে না অন্য নুসরাতেরা। কিন্তু জান্নাতি, সর্বশেষ দোলন কিন্তু পুড়ে মারা গেছে, তাদের মারা হয়েছে।

সামিয়ার মতন বাচ্চা একটা মেয়েকে ধর্ষিতা হতে হয়েছে, তাকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ কিন্তু থামেনি। আজ যখন লিখছি তখনও গণমাধ্যমে রয়েছে ধর্ষণের খবর বাচ্চা থেকে বুড়ো কেউ বাদ যাচ্ছে না।

এক নয়ন বন্ডের ক্রসফায়ারে থেমে থাকেনি হত্যা। খবরে দেখলাম নিহত অটোচালকের মাটিচাপা লাশ উদ্ধার করছে পুলিশ। ডোবাতে পাওয়া গেছে যুবকের মৃতদেহ। কই বন্ধ হয়নিতো। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো, সম্ভাবনাময় মুখগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে বাবা-মা’র অবলম্বন। একেকটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই।

এক শ্রেণির অপগন্ড আছেন, দু’একটা উদাহরণেই লাফিয়ে উঠছেন। যেন এসব ‘সব মুশকিল আসানে’র খবর। আর ‘মুশকিল আসান দরবেশ’রা সব বসে আছেন আসান করতে।

আশাবাদী হওয়া ভালো, মানুষ আশা নিয়েই বাঁচে। তবে যারা আশা ছড়ানোর চেয়ে প্রোপাগান্ডা বেশি ভালোবাসেন, তাদের নিয়েই সমস্যাটা। প্রোপাগান্ডা’র খারাপ দিকটা হলো সমস্যাটাকে ঢেকে দেয়া। গূরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যাকে প্রায় গুরুত্বহীন একটি বিষয় দিয়ে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা হয়, তখন কিন্তু ক্ষতির মাত্রাটা আরো বৃদ্ধি পায়। প্রোপাগান্ডার ছায়াতলে সমস্যাটা আরো ছড়িয়ে পড়ে। অনেকটা ক্যান্সারের মতন। শেষ সময়ে করার আর কিছু থাকে না। তখন মৃত্যুটা হয়ে উঠে অনিবার্যতা।

আমাদের প্রোপাগান্ডিস্টরা সেই কাজটিই করে যাচ্ছেন। সামাজিক ব্যাধিগুলোকে প্রোপাগান্ডার ছায়াতলে বেড়ে উঠতে দিচ্ছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। প্রোপাগান্ডার ছায়া যখন উঠে গেলো, তখন কিন্তু সাম্রাজ্যটা ভেঙে খানখান। যতই শক্তিশালী হোক না কেনো, সমস্যাকে প্রশ্রয় দিলে, সেই শক্তিমানও আক্রান্ত হবেন। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। থাকার কথাও নয়। ইতিহাস তারই স্বাক্ষ্য দেয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত