শিরোনাম

রিকশা প্রসঙ্গ : প্রশিক্ষণ-নিরাপত্তা ও ভাড়া

প্রিন্ট সংস্করণ॥মোমিন মেহেদী  |  ০১:০৩, জুলাই ১১, ২০১৯

মাঝে মাঝে জীবনজুড়ে যে বাহনটি বড় আপন মনে হয়, সেটির নাম রিকশা! ত্রিচক্রের এক রঙ বেরঙের যান। ব্যস্ত নাগরিক জীবনের এক অপরিহার্য বাহন। রিকশা ছাড়া নাগরিক জীবনের কথা যেনো বাংলাদেশে কল্পনাও করা যায় না।

নিম্নবিত্ত বহু মানুষের ঘামে ভেজা ভরসার স্থল এ রিকশা। হয়তবা আয়ের একমাত্র উৎস। মধ্যবিত্তদের সাধ ও সাধ্যের এক অপূর্ব সমন্বয়। আমাদের রাজনীতিকদের প্রায় সবাই এই বাহনের যাত্রী থাকেন জীবনের শুরুতে। পরে এসে সেই রাজনীতিকদের অনেকেই আর পছন্দ করেন না।

বাংলাদেশের রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলি সবখানেই এই বাহনটি পাওয়া যায়। যদিও এদের মধ্যে কেউ কেউ একটু বেশিই ভাড়া চান তবুও রিকশা বাংলাদেশের এক জনপ্রিয় বাহন। শহুরে জীবনের রাস্তা-ঘাটের অধিকাংশই এর দখলে থাকে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা কিন্তু রিকশার রাজধানী” হিসেবেও বেশ পরিচিত! রিকশার ইতিহাস অনেক পুরোনো এক ইতিহাস। বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর ক্লান্ত চলাচল চোখে পড়ে। চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই এর মন্থর চাকা অবিরাম ঘুরতে দেখা যায়।

বাংলা ভাষায় আমরা যে রিকশা বলি, এই রিকশা শব্দটি এসেছে জাপানি জিনরিকশা শব্দটি থেকে। চীনা ভাষায় জিন শব্দের অর্থ করলে দাঁড়ায় মানুষ, রিকি শব্দটির অর্থ হল শক্তি আর শা শব্দটির মানে বাহন। শব্দগুলোকে যদি আমরা একে একে যোগ করি তাহলে পাই মানুষের শক্তিতে চলা বাহন।

দেশ ভেদে রিকশা আকার, গঠন প্রকৃতি বিভিন্ন হয়। আবার বিভিন্ন দেশে একে বিভিন্ন নামেও ডাকা হয়ে থাকে। চীনে সানলুঞ্চে, কম্বোডিয়ায় সীক্লো, মালয়েশিয়ায় বেকা, ফ্রান্সে স্লাইকো নামে পরিচিত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি পেডিক্যাব নামেও পরিচিত।

সুপ্রাচীনকাল থেকে জাপানেই রিকশার অস্তিত্ব জানা যায়। সেইগুলো অবশ্য তিন চাকার ছিল না। দুই দিকে ছিল দুই চাকা আর সামনের চাকার বদলে একজন মানুষ ঠেলে নিয়ে যেত। এ ধরণের রিকশাকে বলা হয় হাতেটানা রিকশা। রিকশার ইতিহাস সবার আগে জানা প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের।

কেননা, এই রিকশাওয়ালাদের বিভিন্ন ধরণের ব্যবহারের মুখোমুখি হতে হয় তাদেরকে। যতদূর জেনেছি- রিকশার শুরু ১৮৬৫ থেক ১৮৬৯ সালের মাঝে। পালকির বিকল্প হিসেবে এর উত্থান। প্রথম কে এই বাহনের প্রচলন করেছিলেন তা নিয়ে নানা জনের নানা মত রয়েছে।

সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি হলো জোনাথন স্কোবি নামের একজন মার্কিন নাগরিক যিনি মিশনারি হিসেবে কাজ করতেন তিনিই ১৮৬৯ সালে রিকশা উদ্ভাবন করেন। তিনি থাকতেন জাপানের সিমলায়।

১৯০০ সাল থেকে কলকাতায়ও এর ব্যবহার শুরু হয়। প্রথমদিকে এতে শুধু মালপত্রই আনা নেয়া করা হত। ১৯১৪ সাল থেকে কলকাতা পৌরসভা এতে যাত্রী পরিবহনেরও অনুমতি দেয়। এরই মাঝে বার্মা বা, বর্তমান মিয়ানমারের রেঙ্গুনেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে রিকশা।

ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৯১৯ বা, ১৯২০ সালের দিকে মিয়ানমার হয়েই রিকশার আগমন ঘটে। তবে ঢাকায় রিকশা কিন্তু রেঙ্গুন থেকে আসেনি। এসেছিল কলকাতা থেকে, নারায়ণগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের পাট ব্যবসায়ীদের কল্যাণে।

তারা তাদের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য কলকাতা থেকে ঢাকায় রিকশা নিয়ে আসেন। কোন কোন সূত্রমতে ঢাকাতে প্রথম রিকশা লাইসেন্স দেয়া হয় ১৯৪৪ সালের দিকে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকটের কারণে জাপানে রিকশার প্রচলন ব্যাপক বেড়ে যায়।

যদিও এখন আর জাপানে রিকশা দেখা যায় না, জাদুঘর ছাড়া। আগেকার মানুষ টানা রিকশার প্রচলন এখন আর তেমন নেই বললেই চলে। সেগুলোর দুই পাশে দুইটি লম্বা রড থাকত যা চালকরা টেনে নিয়ে যেতেন। রিকশাতে মূলত দুইজনের জন্য বসার সিট থাকে।

তবে মাঝে মাঝে ৩-৪ জনকেও কায়দা করে উঠতে দেখা যায়। এ প্রবণতা তরুণদের মাঝেই বেশি। বর্তমানের রিকশাগুলো হয় প্যাডেল চালিত। ফলে চালকদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। বর্তমানে যন্ত্রচালিত রিকশার প্রচলনও অতি দ্রুততার সাথে বাড়ছে।

২০০৫ সালের দিকে ভারতের পচিমবঙ্গ সরকার হাতে টানাকে অমানবিক বলে তা নিষিদ্ধের প্রস্তাব আনেন। বিলটি পাশ হলেও বিলটির বিরুদ্ধে পিটিশন হওয়াই তা এখনও কার্যকর হয়নি। বর্তমানে এই বিলটি সংশোধনের কাজ চলছে। ভারতের অন্যান্য কিছু শহরেও যানজটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রিকশাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

হয়তো বাংলাদেশে রিকশার জনপ্রিয়তার কারণে রাপা প্লাজার কাছে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের শুরুতেই স্থাপিত হয়েছে সম্পূর্ণ শিকল দিয়ে তৈরি একটি রিকশা, এর চালক এবং এর যাত্রীদের নিয়ে সুন্দর এক ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি মৃণাল হকের তৈরি। ভাস্কর্যটির নাম ইস্পাতের কান্না।

সেই কান্নাই যেন নিরন্তর সাথী হতে চলেছে এখন রিকশাওয়ালাদের। কেননা, তাদের আয় বেশি হলেও নেই নিরাপত্তা বা ভালো আবাসন ব্যবস্থা। বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবী পথ বিষয়ক একমাত্র সংগঠন সেভ দ্য রোড বলছে- ঢাকা শহরে একজন রিকশাচালক মাসে গড়ে ১২ হাজার ৭০০ টাকা আয় করেন।

রিকশা ভাড়া, গ্যারেজের খরচ- এসব বাদ দিয়েই এ অর্থ আসে। রিকশাচালকদের প্রায় অর্ধেকই তাদের এ আয় দিয়ে চলতে পারেন। এক-চতুর্থাংশ চালকের এ আয় থেকে জমানোর জন্য অর্থ থাকে। বাকি চালকদের এ আয়ে চলে না।

আয়ের দিকটা এমনটা হলেও ৯৪ শতাংশ রিকশাচালক অসুখে পড়লে হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন। বেশিরভাগ রিকশাচালক পুলিশের কাছে নিগ্রহের শিকার হন। শুধু এখানেই শেষ নয়; আমার দেখা ও জানা মতে, দুর্ব্যবহার ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হন যাত্রীদের কাছ থেকেও।

প্রায় চালকই শ্রমিক হিসেবে তাদের অধিকার সম্পর্কে জানেন না। তাদের কল্যাণে কোনো সংগঠনও কাজ করে না। তবে সবচেয়ে আশার কথা হলো- আমাদের নগর দারিদ্র্যের একটা বৈশিষ্ট্য হলো এসব নিম্নআয়ের মানুষ নগরে এসে অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে।

কিন্তু তাদের সামাজিক সমস্যা আছে যথেষ্ট। নাগরিক সম্মানের দিকটা অনেক দুর্বল। তাদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত হচ্ছে না। এমন আয়ের মানুষের গড় আয়ু ও স্বাস্থ্যসুবিধা কেমন- এসব দিক বিবেচনা করলে খুব সুখকর চিত্র পাওয়া যায় না।

তাছাড়া রিকশাচালকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, তাদের অধিকার, নিরাপত্তা, নাগরিক সুবিধা, বাসস্থানের অবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের অবস্থা বুঝতেই এই গবেষণা। নগরের এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি রিকশাচালকরা। তাদের অবস্থার উন্নয়নের দিকে নীতিনির্ধারক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণও আমাদের গবেষণার উদ্দেশ্য।

গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ৬০ শতাংশ বাসিন্দা তাদের প্রয়োজনে রিকশায় চড়ে। ঢাকা সিটি করপোরেশন রিকশার লাইসেন্স দেয়ার একমাত্র কর্তৃপক্ষ। ১৯৮৬ সালে সিটি করপোরেশন সর্বশেষ ৭৯ হাজার ৫৫৪ রিকশার লাইসেন্স দিয়েছিল।

এরপর থেকে লাইসেন্স দেয়া বন্ধ আছে। ঢাকা শহরে এখন আনুমানিক ১১ লাখ রিকশা আছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশাল সংখ্যায় অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয় রিকশা পরিবহন খাতে। এখানে বিনিয়োগ অল্প, এ পেশায় ঢোকা-বের হওয়া সহজ, নগদ আয় হয়।

আবার এটি চালাতে কোনো বিশেষ দক্ষতারও দরকার পড়ে না। রিকশার আরেকটি দিক, এটা সহজেই পাওয়া যায়। এটি চালাতে নিয়ম-নীতির এত কড়াকড়ি নেই।

গ্রামাঞ্চল থেকে নগরে আসা অদক্ষ শ্রমিকের ভরসা এটি। রিকশাচালকদের মধ্যে ৮০ শতাংশ এ পেশায় আসার আগে বেশিরভাগ দিনমজুরের কাজ করতেন।

এছাড়া আগে ব্যবসা কৃষি কাজেও নিয়োজিত ছিলেন অনেক রিকশাচালক। রিকশা চালনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ চালকের অন্য কোনো কাজ না পাওয়া এবং পুঁজি ও দক্ষতার অভাব বলে আমি মনে করি।

শহরের রিকশাচালকরা গড়ে প্রতি পাঁচ মাসে একবার করে তাদের গ্রামের বাড়ি যান। তবে তারা প্রায় পুরো বছরই রিকশা চালান। ঢাকায় ৬২ শতাংশ চালক সপ্তাহে সাত দিনই রিকশা চালান। ২৮ শতাংশ রিকশাচালক সপ্তাহে ছয় দিন চালান। দিনে একটি শিফটে রিকশা চালান। মোট নয় ঘণ্টা রিকশা চালান তারা।

ঘুম বা অন্যান্য কাজে মোট ১৫ ঘণ্টা সময় পান। পুলিশ-প্রশাসনের ব্যাপারে রিকশাওয়ালাদের বিরুপ প্রতিক্রিয়া আমাকে করেছে খুবই ব্যথিত। গ্রামের চেয়ে শহরে আয়-উন্নতি ভালো। যা পাই চলে যায়। তবে অনেক রাস্তা আছে, যেখানে যেতে পুলিশ অকারণে বাধার সৃষ্টি করে।

কেউ টাকা দিলে যেতে দেয়, না দিলে দেয় না। অনেক সময় কারণে-অকারণে সিট কেড়ে নেয় পুলিশ। রাস্তায় উঠি, টাকা না দিলে মারে। আয় ভালো হলেও দিন দিন বাড়তে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম, যা শঙ্কার বিষয়। ঢাকার ৯৬ শতাংশ রিকশাচালকের নিজস্ব রিকশা নেই।

প্রতিদিন গড়ে ১২৭ টাকা ভাড়া দিয়ে রিকশাচালান তারা। রিকশা চালানোর ক্ষেত্রে কোনো লিখিত চুক্তি থাকে না। রিকশা রক্ষণাবেক্ষণের সব খরচ চালকের। দুর্ঘটনায় পড়লে এর খরচ চালককেই দিতে হয়। একই সাথে ৫৪ শতাংশ চালক কোনো না কোনা দুর্ঘটনার শিকার হন। প্রায় ৪৪ শতাংশ চালক বাসের সঙ্গে ধাক্কায় আহত হন।

এক রিকশার সঙ্গে আরেক রিকশার সংঘর্ষই বেশি হয়। এ দুর্ঘটনায় খুব বেশি ক্ষতি হয় না। তবে বাসের সঙ্গে দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয় অনেক বেশি। দুর্ঘটনায় পড়লে ৩৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই পথচারীদের সহায়তাই পান চালকরা।

৩২ শতাংশের ক্ষেত্রে অন্য রিকশাচালকরা সহায়তার হাত বাড়ান তাদের প্রতি। তার ওপর রিকশা চালনার জন্য এক বা একাধিক রোগে ভোগেন তারা। জ্বরের পাশাপাশি সর্দি, ব্যথা, দুর্বলতা, জন্ডিস ও ডায়রিয়ার শিকার হন।

তবে তারা যেমন আরোহীদের কাছে থেকে দুর্ব্যবহার পান, আরোহীরা রিকশাচালকদের মারধর, গালিগালাজ এবং ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করেন; তেমন এই রিকশাওয়ালারাও ‘ ঝোপ বুঝে কোপ মারা’র মত বৃষ্টি, রোদ, অফিস আওয়ারসহ বিভিন্ন অসুবিধাগুলো মার্ক করে ৩ গুণ, ৪ গুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করে থাকে। কেননা, কোন মনিটরিং টিম নেই, নেই কোন শহরেই ভাড়ার নির্দিষ্ট তালিকা। নির্ধারিত কোন স্ট্যান্ডও নেই এই রিকশার জন্য।

এ কথাও সত্য যে, যেসব মালিকদের কাছ থেকে রিকশা নেন, সেই মালিকদের মাধ্যমে নিগ্রহের শিকার কম হন না চালকরা। ৬০ শতাংশ মালিকরা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন, ধমক, তাচ্ছিল্য ও শারীরিক নিগ্রহর শিকার হতে হয়। প্রায় রিকশাচালকই শ্রমিক হিসেবে তাদের অধিকার সম্পর্কে জানেন না।

তবে রিকশাচালকরা অর্ধেকেরও বেশি শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেন; যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এসব সংগঠনের নাম জানেন না। আবার এসব সংগঠন শ্রমিকদের কল্যাণে কোনো কাজ করে না। রিকশাশ্রমিকদের অনেকেই তাদের অধিকার সম্পর্কে সজাগ নন।

রিকশাচালকদের অধিকারের বিষয়টি নিয়ে কমই আলোচনা হয়। তাদের আয় হয়তো এখন বেড়েছে। কিন্তু তারা অধিকারহীন।

এত কিছুর পরও বলবো- বাংলাদেশে সড়কপথের এই বাহনটির জন্য নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ও নীতিমালা বাস্তবায়ন হলেই এগিয়ে যাবে বিনম্রতায় আরো হাজার বছর কালের তিন চাকা। কষ্ট-আনন্দ ভাগাভাগি গরিবে-বড়লোকে চলতেই থাকবে। যতদূর জেনেছি- ১৯৮০ সালে সারা বিশ্ব প্রায় ৪০ লাখের মত রিকশা ছিল।

১৯৪১ সালেও ঢাকায় রিকশা সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭ টি। ১৯৪৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮১ টিতে। বর্তমানে ঢাকাতেই শুধু ৮ লাখ রিকশা রয়েছে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুসারে, ঢাকায় কমপক্ষে ৫ লক্ষাধিক রিকশা চলাচল করে এবং ঢাকার ৪০ শতাংশ মানুষই রিকশায় চলাচল করে।

২০১৫ সালে এটিকে বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে তাদের বইয়ে স্থান দেয়। আরো একটি বিষয় আছে রিকশাকে কেন্দ্র করে; আর তা হলো- পেছনের চিত্রশিল্প। আমাদের অনেক রিকশার পেছনেই এক ধরণের পেইন্টিং বা, চিত্র আঁকানো থাকে। এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।

এই চিত্রগুলো আমাদের গর্বের বিষয়। এটিকে আমাদের চিত্রকলার সম্পূর্ণ আলাদা একটি ধারাও বলা চলে। রিকশাচিত্র বলতে উজ্জ্বল রঙে আঁঁকা কিছু চিত্রকে বোঝানো হয়। সাধারণত বাংলাদেশ এবং ভারতেই রিকশার পেছনে এ ধরণের চিত্রকলা লক্ষ্য করা যায়।

বিশেষজ্ঞরা একে ফোক আর্ট, পপ আর্ট বা, ক্র্যাফটের মর্যাদাও দিয়ে থাকেন। ১৯৫০ এর দশকে বাংলাদেশে রিকশাচিত্রের যখন প্রচলন হয়। চিত্রে ফুল-ফল, পশু-পাখি, নদী-নালা, প্রকৃতি এমনকি জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের ছবিও আঁকানো হয়ে থাকে।

কখনও কখনও চিত্রে রিকশাচালকের ধর্মীয় বিশ্বাস বা, সামাজিক কোন বক্তব্য প্রতিফলিত হত। তবে বর্তমানে কম্পিউটারের সাহায্যে ছবি তৈরি করে, টিনের ধাতব প্লেটে ছাপ দিয়ে খুব সহজেই চিত্র তৈরি করা হয়। ফলে দেশের ঐতিহ্য বা, প্রকৃতি আর সেভাবে সেখানে ফুটে ওঠেনা।

ফলে রিকশা চিত্রশিল্পীরা তাদের কর্মক্ষেত্র হারাচ্ছেন, পাশাপাশি এই শিল্পও তার অতীত গৌরব হারাতে বসেছে। আরো আনন্দ, আরো গর্বময় বিষয়- ২০১১ সালে বাংলাদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনের সময়ও বাংলাদেশের রিকশার ঐতিহ্য বেশ ভালভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়।

সেখানে প্রতিটি দলের অধিনায়করা রিকশায় করে মাঠে উপস্থিত হন। বিষয়টি বেশ প্রশংসিত হয়। এখন কথা হলো- যেহেতু রিকশা একটি পরিবেশ বান্ধব বাহন।

কোনরকম বায়ু দূষণ ঘটায় না। এছাড়াও বহু মানুষ রিকশা চালিয়ে বা, তৈরি ও মেরামত করে তাদের জীবন, জীবিকা চালিয়ে থাকে।

এ প্রাচীন বাহনটি বর্তমানে বাংলাদেশের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এর আবেদন কমার বদলে দিনকে দিন মানুষের মাঝে বেড়েই চলেছে। যানবাহনগুলোর মাঝে রিকশাকে বেশ নিরাপদ হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।

সেহেতু তৈরি হোক নীতিমালা, দেয়া হোক নিরাপত্তা-প্রশিক্ষণ এবং ভাড়ার তালিকা। দেখবেন নিরন্তর রাজপথে থাকা কষ্ট-আনন্দ আর ভালোবাসার বাহনটি পাবে বরাবরের চেয়ে আরো আন্তরিক পরিবেশ। যা ধনি-গরিব-মানিবক সবার কাম্য, কাম্য আমারও।

লেখক : কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত