শিরোনাম

লিবিয়ায় অভিবাসী কেন্দ্রে হামলা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০২:০০, জুলাই ০৫, ২০১৯

লিবিয়ায় একটি অভিবাসী আটককেন্দ্রে বিমান হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছে শতাধিক। গত বুধবার ভোররাতে রাজধানী ত্রিপোলির পূর্বাঞ্চলের শহর তাজৌরাতে এই হামলা চালানো হয়।

নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই আফ্রিকান অভিবাসনপ্রত্যাশী বলে বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে জানা যায়। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত জাতীয় ঐকমত্যের সরকার (জিএনএ) এ হামলার জন্য সাবেক জেনারেল খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন স্বঘোষিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মিকে (এলএনএ) দায়ী করছে। এক বিবৃতিতে জিএনএ জানায়, এই হামলা পূর্বনির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট।

এটিকে জঘন্য অপরাধ অভিহিত করে নিন্দা জানিয়েছে জিএনএ। রাজধানী ত্রিপলি নিয়ন্ত্রণ করছে যে সরকার সেটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার (জিএনএ) নামে পরিচিত। জাতিসংঘ এই সরকারকে লিবিয়ার বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফায়েজ সারাজ নামে একজন প্রকৌশলী এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে তেলসমৃদ্ধ লিবিয়া একসময় আফ্রিকার শীর্ষে ছিলো। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ছিলো পুরোপুরি সরকারের দায়িত্বে।

কিন্তু যে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ওই ঐশ্বর্য নিশ্চিত করেছিলো, সেটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় ২০১১ সালে, যখন পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে দেশটির নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়। তারপর থেকে লিবিয়ায় চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য ও অরাজকতা।

সম্প্রতি রাজধানী ত্রিপোলির নিয়ন্ত্রণ নেয়াকে কেন্দ্র করে অশান্ত হয়ে উঠছে লিবিয়া। এরই মধ্যে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে সেদেশের পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী সেনা কমান্ডার খালিফা হাফতার।

আর পূর্বাঞ্চলকে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন লিবিয়ার জাতিসংঘ স্বীকৃত প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ সিরাজী। গত বুধবারের হামলার সময় তাজৌরা এলাকায় জিএনএর অনুগত বাহিনীগুলোর সঙ্গে এলএনএর লড়াই চলছিলো।

গত ১ জুলাই এলএনএ জিএনএ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হবে বলে ঘোষণা দেয়। তবে অভিবাসী আটককেন্দ্রে বিমান হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এলএনএ। সামপ্রতিক বছরগুলোয় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে যাওয়ার প্রধান পথ হয়েছে লিবিয়া।

ইউরোপে যেতে ইচ্ছুক হাজারো অভিবাসনপ্রত্যাশীকে আটক করে লিবিয়ার বিভিন্ন অভিবাসী আটককেন্দ্রে রাখা হয়। এদিকে হাফতার বাহিনীকে রুখে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ সমর্থিত লিবিয়া সরকার।

এছাড়া, সবধরনের হুমকি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে প্রতিহত করার জন্য সরকারপন্থী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ সিরাজী।লিবিয়ায় এখন নানা মত ও পথের অসংখ্য সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী তৎপর।

দেশের পূর্বে ও পশ্চিমে রয়েছে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক শাসন কেন্দ্র। কিছু মিলিশিয়া দল পূর্বের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুগত, কিছু আবার সমর্থন করে পশ্চিমের অর্থাৎ ত্রিপলি নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনকে। লিবিয়াতে এখন যার হাতে যত বেশি অস্ত্র, তার শক্তি এবং প্রভাবও তত বেশি। লিবিয়া এখন অস্ত্রের বাজারে পরিণত হয়েছে। গাদ্দাফি সরকারের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রে ছেয়ে গেছে লিবিয়া।

আশপাশের একেকটি দেশ একেকটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে, অস্ত্র জোগাচ্ছে। এসব মিলিশিয়া নিজেদের সুবিধামতো সময়ে সময়ে আনুগত্য পরিবর্তন করছে। গত ৮ বছরে গণতন্ত্রের মুখ দেখেনি লিবিয়া।

গাদ্দাফিকে হঠানোর লড়াইও কোনো একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে হয়নি। একেকটি শহরে ছিলো একেক মিলিশিয়া বাহিনী। তারা তাদের নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় লড়াই করছে। সব মিলিয়ে জটিল এক জালে জড়িয়ে গেছে লিবিয়া।

নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ে লিবিয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ওষুধপত্রের অভাব প্রকট। মানুষ সর্বক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায়। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ।

জাতিসংঘের হিসাবে এখনও লিবিয়ায় কমপক্ষে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করতে হচ্ছে। বর্তমানে ত্রিপলিতে যে লড়াই শুরু হয়েছে তাতে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার লোক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।

অক্টোবর ২০১১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর অভিযানে চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকেই টালমাটাল লিবিয়া। ক্ষমতার লড়াইয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায় সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সশস্ত্র বিভিন্ন সংগঠন।

লিবিয়ার নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপনেও বর্তমানে কোনো নিরাপত্তা নেই। লিবিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধের পাশাপাশি সামরিক সেনাবাহিনী ও সরকার উভয়কে শান্ত থাকতে হবে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত