শিরোনাম

বাজারে ভেজাল খাদ্যপণ্য দায়ীদের কঠোর শাস্তি কাম্য

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০২:১৯, জুন ২৮, ২০১৯

মানুষের বাঁচার জন্য অতি প্রয়োজনীয় তেল, দুধ, ওষুধ, লবণ, চিনি, আটা, ময়দা, মসলা, পানিতেও যদি ভেজাল থাকে, তাহলে মানুষ খাবে কী? বাঁচবে কী করে? মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে এ রকম ভয়ানক তামাশা পৃথিবীর কোথাও আছে কি? এতদিন যেগুলো মানুষ খেয়েছে তার কী হবে? বিএসটিআই কি ঘুমিয়ে কাটায়?

অসহায় জনগণকে ভেজাল কারবারীদের হাত থেকে কে রক্ষা করবে? এসব অপরাধের শাস্তি শুধুই বাজার থেকে পণ্য জব্দ, প্রত্যাহার, জরিমানা? ধর্ষক, মাদক কারবারী, খাদ্যে ভেজালকারী, অসাধু দায়িত্বহীন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাবজ্জীবন ও ফাঁসির বিধান কেন করা হয় না?

ইতোপূর্বে মানহীন ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার ও জব্দে হাইকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন না করায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের প্রতি আদালত অবমাননার রুল দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘ঘরে গিয়ে রান্না বান্নার কাজ শুরু করে দেন। নতুবা ব্যাংকে গিয়ে কেরানির চাকরি করতে বসেন। বসে বসে টাকা গুনবেন, টাকার হিসাব রাখবেন।’ আদালত এও বলেছেন, ‘হাইকোর্টকে কি হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন?

আমরা এগুলো বুঝি। বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সোজা না বলে বাঁকাভাবে বলছেন।’ খেটে খাওয়া কর্মব্যস্ত মানুষের কয়জনের এসব দেখে, শুনে, জেনে, খাবার সুযোগ রয়েছে? ওরা কী দুনিয়াটাকে রঙ্গমঞ্চ মনে করছে?

সর্বসাধারণের রক্তঝরা পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত টাকা দিয়ে ভেজাল খাবে, আর সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অভিনেতা সেজে থাকবে? অভিযান, পণ্য প্রত্যাহার বা জব্দ কে করবে? জনগণ না সরকার? অভিযান যারা চালাবে তাদের মধ্যে যদি ভেজাল থাকে তাহলে?

ফলাফল—‘কারও পকেট খালি কারও পকেট ভারী’। সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশ ব্যতীত ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিপণন কোনভাবেই সম্ভব কি? দুঃখজনক যে, এমন কতিপয় ব্রান্ডেড কোম্পানি যাদের পণ্যে বাজার সয়লাব। যে সব খাদ্য পণ্যের ওপর শিশু, অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত নির্ভরশীল। যারা পণ্য বিক্রি করে প্রচুর লাভও করছেন।

সেসব কোম্পানির পণ্যেও যখন ভেজাল, তখন হতাশ না হয়ে পারা যায় কি? গত ২৫ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি লেকচার থিয়েটারে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়, তেল, দুধ, মসলাসহ আট ধরনের ভোগ্যপণ্যের ৭১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ঢাবির পরীক্ষাগারে। পরীক্ষায় ৬৯টি পণ্যই মানোত্তীর্ণ হতে পারেনি।

পণ্যগুলোর বেশ কয়েকটিতে অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া গেছে; যা দীর্ঘ মেয়াদে নানা ধরনের জটিল রোগের কারণ হতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, খাদ্যের গুণগত মান নিয়ে সরকার ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মাসি অনুষদের বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পণ্যগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে লিখিত বক্তব্য পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এবং বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক আ ব ম ফারুক।

লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এমন ঘির ৮টি, ফ্রুট ড্রিংকসের ১১টি, শুকনা মরিচের গুঁড়ার ৮টি, হলুদের গুঁড়ার ৮টি, পাম তেলের ১০টি, সরিষার তেলের ৮টি, সয়াবিন তেলের ৮টি, পাস্তুরিত তরল দুধের ৭টি এবং অপাস্তুরিত তরল দুধের ৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের নির্ধারিত বিভিন্ন মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্যগুলো পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় হলুদের দুটি নমুনা ছাড়া বাকি সব পণ্যেই ভেজাল অথবা ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যায়। এর মধ্যে পাস্তুরিত তরল দুধের ৭টি নমুনাতেই মানবদেহে ব্যবহার করা হয় এমন অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায়।

পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঢাবির ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ বলেন, হলুদের গুঁড়ায় কাপড়ের রং পাওয়া গেছে, যা লিভার, কিডনিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, দীর্ঘ মেয়াদে ক্যান্সার হতে পারে। এমন রংযুক্ত হলুদ খেলে শিশুদের হাঁপানি হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাবির ফার্মাসি অনুষদের ডিন এস এম আবদুর রহমান বলেন, ‘পরীক্ষায় খাবারে বিষাক্ত রাসায়নিকও পাওয়া যাচ্ছে। নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।’

দেশে আইনের শাসন যে একটা নড়বড়ে অবস্থায় আছে, তার একটি নজির তৈরি হলো ঢাবির পরীক্ষাগারের দেয়া ফলাফলে। এমন নয় যে দেশে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও কেনাবেচা বন্ধ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার অভাব রয়েছে।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারই ভোক্তা অধিকার আইন প্রণয়ন এবং আলাদাভাবে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছে। আমরা আশা করব, ভেজাল খাদ্যপণ্য কার্যকরভাবে প্রত্যাহার করে এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে সরকার একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত