শিরোনাম

আকাশ-সড়ক-নৌ ও রেলপথ নিরাপদ হবে যেভাবে...

প্রিন্ট সংস্করণ॥মোমিন মেহেদী  |  ১০:৪০, জুন ২৭, ২০১৯

মনে আছে- দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ‘ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই’য়ের কথা? আমি পড়েছি, আর মনে মনে ট্রেনে চড়ে মনের সুখে ঘুরেছি। সেই ট্রেনে এখন দুর্ঘটনা, কান্না, মৃত্যু, অঙ্গহানি। আহারে দেশ, শেষ হয়ে গেলো একে একে যেন সকল সম্ভাবনা...।

যখনই আকাশ-সড়ক- রেল বা নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কি আশানুরুপ কোনো কাজ হয়েছে? হয়নি। কারণ একটাই, তদন্ত কমিটি যাদেরকে নিয়ে করা হয়েছে, তাদের তদন্ত করারই কোনো যোগ্যতা নেই।

আর এই অযোগ্য-অথর্বদের তদন্ত নামক সাইন বোর্ডধারীতার আড়ালে দালালির কারণে উত্তরার শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর এত বড় আন্দোলন সত্ত্বেও থামেনি বেপরোয়া পরিবহন চলাচল। বরং আরো বেপরোয়া হয়ে রাজিবের হাত-প্রাণ, আবরারের খুশি জীবনসহ অসংখ্য মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে অদক্ষ-মূর্খ চালকরা।

তার ওপর তো নৌ- রেল আর আকাশপথ সমস্যা আছেই। আমাদের দেশে এখন বিমান চালকেরও পাসপোর্ট থাকে না। তিনি চালান- প্রধানমন্ত্রী যে বিমানের যাত্রী, সেই বিমান।

হাজারো অসঙ্গতির এই দেশে সর্বশেষ সিলেট-আখাউড়া সেকশনের বরমচালে দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে ‘উপবন এক্সপ্রেস’ দুর্ঘটনার কবলে পড়লে ৪ জন যাত্রীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।

এদের মধ্যে তিনজন নারী এবং একজন পুরুষ। অবশ্য দুর্ঘটনার পর পরই ৭ যাত্রী নিহতের কথা বলা হয়েছিলো। শতাধিক আহত যাত্রীকে মৌলভীবাজার, সিলেটসহ আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুর্ঘটনার পরই উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।

এত লাশ, এত আহত হওয়ার ঘটনা কেবলমাত্র যখন রেল-এর উদাসীনতায় হয়েছে বলে তথ্য প্রকশিত হয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমে। তখন অথর্বের মত উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে রেলমন্ত্রী বললেন, ‘মানুষ হুমড়ি খেয়ে রেলে ওঠে। তাই এ দুর্ঘটনা।

রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ঢাকা থেকে সামগ্রিক যোগাযোগ রাখা হয়। আহতদের চিকিৎসাও দেয়া হয়।’ তখন প্রধানমন্ত্রী রেলের নাজুক ও দুর্বল সেতুগুলো শনাক্ত করে নতুন করে নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন।

এর দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, রেলের উদাসীনতায় এই ট্রাজেডির জন্ম। তার ওপর আবার পোড়া ঘায়ে লবণের ছিটা দিয়ে ব্রিটিশ নাগরিকদের ট্রেন ভ্রমণে সতর্কতার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মৌলভীবাজারে ট্রেন দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের সতর্ক করেছে দেশটির ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েথ অফিস।

ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই সতর্কবার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশে অনেক পুরনো রেল নেটওয়ার্ক রয়েছে। বাংলাদেশে রেলভ্রমণ অত্যন্ত ধীরগতির। দেশটিতে মাঝে মাধ্যেই ট্রেন লাইনচ্যুতি এবং অন্যান্য দুর্ঘটনা ঘটে।

যেখানে অনেকে আহত হন, মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। রেলের এই পরিস্থিতির ওপর আছে আবার ভয়াবহ সড়কপথ দুর্ঘটনা। গত ৫৪ দিনে সড়কে ঝরেছে ৬১০০ প্রাণ। যার শেষ ট্র্যাজেডিক ঘটনা হলো- সড়কপথে বাবা-ছেলেসহ ১৪ জনের প্রাণহানি।

পার্বতীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া পাথর খনি বাজারে বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেছে মোটরসাইকেল আরোহী বাবা-ছেলের। ফুলবাড়ী-রংপুর মহাসড়কে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহতরা হলেন- দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার মাদারপুরের মোস্তাফিজুর রহমান ও তার ছেলে শাবনুর রহমান।

রেলমন্ত্রীর হাস্যকর বক্তব্যের বিপরিতে তথ্যের আলোকে বলতে পারি- বাংলাদেশ রেলওয়ের অধিকাংশ সেতুই নির্মিত হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। এসব সেতুর বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ-জরাজীর্ণ। জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা এসব সেতুর উপর দিয়েই চলছে ট্রেন।

ফলে একটু উনিশ-বিশ হলেই ঘটছে দুর্ঘটনা। সর্বশেষ ঢাকা-সিলেট লাইনে কুলাউড়ার মনছড়া (৯নং রেলসেতু) রেলসেতুতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে উপবন এক্সপ্রেস। এতে ৪ জন নিহত ও শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন।

রেলসেতু ভেঙে যাওয়া বা দেবে যাওয়ার এমন ঘটনা নতুন নয়। ৩ হাজার ৩৩৬ কিলোমিটার রেলপথে লাইনচ্যুতির ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। কিন্তু ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে রেলসেতু কেন্দ্রিক।

ঢাকা-সিলেট, সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে গত দেড় বছরে ৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে; যার মধ্যে গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ-কুশিয়ারার মধ্যস্থলের রেলসেতু ভেঙে দুই দিন ওই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিলো।

একই পথে ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ মাধবপুরের ইটাখলা রেলব্রিজ ভেঙে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রেন। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ পাঁচ দিন বন্ধ ছিলো। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি- বাংলাদেশের রেলপথে অধিকাংশ সেতু ও লাইনই ৭০ থেকে ১০০ বছরের কিংবা তারও বেশি পুরনো সেতুগুলো শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, চরম আতঙ্কেরও বটে।

এছাড়া স্টিল কিংবা লোহার ব্রিজগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ। দুই অঞ্চলে (পূর্ব-পশ্চিম) কেপিআইভুক্ত সেতু রয়েছে প্রায় ৪৫টি। সেতুগুলোর মধ্যে ৯০ শতাংশেরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সাধারণত নির্মাণের ৫০-৫৫ বছর পর সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

হাজারো ডিজিটাল বুলি আওড়ালেও বাস্তবতা হলো- রেলওয়েতে যেসব ‘রেলসেতু’ রয়েছে তার অধিকাংশই ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। একশ’ থেকে দেড়শ’ বছরের পুরনো। ঝুঁকিপূর্ণ এসব সেতু পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে সচল রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে তারা স্বীকার করেছেন, ব্রিটিশ আমলের এসব সেতু একেবারেই অনুপযোগী। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং ঘটছেও।

এমতাবস্থায় সেতুগুলো সময়োপযোগী করে পুনর্নিমাণের কোনো বিকল্প নেই। তবুও বিকল্প ভাবেনি কেউ; বরং জীবনগুলো ঝরে যাওয়ার পর রেলপথের খলনায়ক রেলের মহপরিচালক বলেছেন- যখন উন্নয়নের ধারা বইছে তখন এ ধরনের দুর্ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক।

বর্তমান সরকার রেলওয়েতে ব্যাপক উন্নয়ন করছে। কিন্তু সারা দেশে রেলের যেসব ব্রিজ রয়েছে তার বেশিরভাগই ব্রিটিশ আমলের। এসব ব্লিজের স্থলে আধুনিক ও সময়োপযোগী রেলসেতু নির্মাণের বিকল্প নেই। আমার নিজের কৌতূহল থেকেই দেখেছি, জরাজীর্ণ এসব ব্রিজে কী করে কাজ করা হয়।

কোন পদ্ধতিতে এসব ব্রিজ মেরামত করা হয়। প্রকৌশলী তথা শ্রমিকদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি দেখতে পাইনি। তারা পুরনো এসব ব্রিজে ‘জ্যাকেট সিস্টেম’ পদ্ধতির মাধ্যমে পিলারগুলোকে মেরামত করেন।’ হাজারটা পক্ষের সাফাই গাইলেই কালো সাদা হবে না কখনো।

সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার পাশাপাশি সড়ক- রেল- নৌ ও আকাশপথ নিরাপদের জন্য নিবেদিত সংগঠন সেভ দ্য রোড-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমি বলতে চাই, রেলে যেভাবে ঝুঁকি বাড়ছে, তাতে ব্রিটিশ, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা জরাজীর্ণ এমন কোনো রেলসেতুই রাখা ঠিক হবে না।

আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি, এসব ব্রিজের কোনোটাই রাখা হবে না। পর্যায়ক্রমে সব ব্রিজ নতুন করে নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় রেলপথে যাওয়ার সুবাদে রেলের যে অবস্থা দেখেছি; তাতে মনে হয়েছে- নামে মাত্র ব্রিজগুলো মেরামত করা হয়। কোনোমতে রং-চুন লাগিয়ে কাজ শেষ করা হয়; যার ফলে উনিশ থেকে বিশ হলেই এসব ব্রিজে দুর্ঘটনা ঘটছে।

লাইন কিংবা ব্রিজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল, প্রতিদিনই এর দেখভাল করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর চলে গেলেও ব্রিজগুলোর যথাযথ উন্নয়ন করা হয়নি।

একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে যে, পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে ১ হাজার ৬৩৯টি ব্রিজ রয়েছে; যার প্রায় ৮৫ শতাংশই ব্রিটিশ আমলের। এসব ব্রিজের কোনোটাই রড-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি নয়। পাথর দিয়ে তৈরি এসব ব্রিজ বছরের পর বছর ধরে মেরামত করতে হয়। এত পুরনো ব্রিজ মেরামত করেও যথাযথ করা সম্ভব হয় না।

তাই নির্দেশনা থাকে এসব ব্রিজের উপর দিয়ে ট্রেন যেন গতি কমিয়ে চালানো হয়। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, ঢাকা বিভাগেই মোট ৫৫০টি রেলওয়ে ব্রিজ রয়েছে। এ বিভাগেরও অধিকাংশ ব্রিজ ব্রিটিশ আমলের।

তার পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতেও ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেলসেতু রয়েছে। এসব সেতু নিয়ে শঙ্কার শেষ নেই। পুরনো এসব সেতু মেরামত করে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করতে হয়।

এসব ব্রিজ নতুন করে করতে হবে। পশ্চিমাঞ্চল রেলে মোট ১ হাজার ৩৬৭টি ব্রিজ রয়েছে; যার মধ্যে পাকশি ও লালমনিরহাট বিভাগে কিছু নতুন ব্রিজ করা হয়েছে। এ অঞ্চলের পাকশি বিভাগে ৫৯৫, লালমনিরহাট বিভাগে ৪০৮ ও খুলনা বিভাগে ৩৬৪টি রেলসেতু রয়েছে।

এসব ব্রিজ মেরামত করতে হলে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের প্রয়োজন। যে বরাদ্দের জন্য নিবেদিত থেকে কাজ করছে না সরকার; আর করলেও খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার মত রেল ঠিকাদাররা ভাগ করে খেয়ে নেয় কাজের টাকা।

কাজ থেকে যায় শূন্যেই। অবশ্য সত্য হলেও কেউ বলে না, কোনো কলামিস্ট লেখেন না, কোনো পত্রিকায় যা ছাপা হয় না, তা হলো- যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, সে সরকারের দলীয় ঠিকাদারদের কাছেও জিম্মি হয়ে থাকে আমাদের রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ কালভার্ট।

যে কারণে ৪৮ বছরে পরিমাণ বাড়তে বাড়তে এখন দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। তাই ঝুঁকি এড়াতে অনেকে রেলে ভ্রমণ করে থাকেন।

দেখা যাচ্ছে, রেল ভ্রমণও ঝুঁকিহীন নয়। ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য নিবেদিত হতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। পরপর ৪ বারের সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা আর তার দলের নেতাকর্মীদেরকে।

দেশের উন্নয়ন মুখে মুখে নয়; কাজে চায় জনতা। তাদের চাওয়া নিরাপদ দেশ-সম্ভাবনার রাস্তায় অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা সবসময়।

কিন্তু তা না করে দলীয় ঠিকাদারদের ১০ টাকার কাজ আট আনায় করানো, জনগণকে কীটপতঙ্গ মনে করে রাজনীতির নামে অপরাজনীতি, সেবার নাামে দুর্নীতি যারা করছেন, তাদের মনে রাখা প্রয়োজন নতুন প্রজন্ম জেগে উঠলে সব ধ্বংস হয়ে যাবে।

বায়ান্ন যেমন কাঁপিয়েছে বাংলা ভাাষার অধিকার আদায়ের মাধ্যমে, একাত্তর যেমন কাঁপিয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে, নব্বই যেমন কাঁপিয়েছে স্বৈরাচার নিপাত করে; তেমনি নতুন প্রজন্ম কিন্তু তাদের নিরাপদ পথ, জীবনের নিরাপত্তা আর ভোট ও ভাতের অধিকার রক্ষার জন্য নাড়বে-ঘুড়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশকে সাজাতে-বাংলাদেশকে বাঁচতে...।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত